

বডি আর্টের রকমফের_ট্যাটু ও তিলক কাটা। ছবি - AI
৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
বডি আর্টের এই বিশ্ব ভ্রমণের চৌকাঠে দাঁড়িয়ে ভারতীয় উপমহাদেশের ঘরের মধ্যে উঁকি মারলে, পশ্চিমা দুনিয়ার ইতিহাস প্রেমিক মানুষজন কিছুটা হতাশ হতে পারেন। কারণ ভারতীয় উপমহাদেশে বডি আর্টের এক ধরনের বিবর্তন সেই সুপ্রাচীনকালেই ঘটে গিয়েছে। এখানে বডি আর্ট ব্যাপকভাবে প্রচলিত হলেও তার ধরন ও রকমফের অন্যান্য জায়গার থেকে অনেকটাই ভিন্ন। তা নিয়ে বিতর্ক আছে। কেউ কেউ উপমহাদেশের কিছু বিষয়কে বডি আর্ট বলে স্বীকৃতি দিতে চান না। সেটা একরকম গাজোয়ারি বলেই মনে হয়।
এক্ষেত্রে একটা বিষয় বলাটা খুব জরুরি, ভারতীয় উপমহাদেশের মধ্যে আজকের রাজনৈতিক বিভাজনের নিরিখে পাকিস্তান বা বাংলাদেশে বডি আর্ট প্রচলিত, কিন্তু ততটা মাত্রাতেও নয়। ভুটানে অবশ্যই এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে ট্যাটু ব্যাপকভাবে প্রচলিত মূলত ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষার অংশ হিসেবে। নেপালে বিষয়টা ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষার অংশের পাশাপাশি হাল ফ্যাশনের বিষয়টাও ব্যাপকভাবে ঢুকে গিয়েছে। ফলে একটা বিষয় বোঝাই যাচ্ছে, আজকের ভারতবর্ষে মূলত এই উপমহাদেশের বডি আর্টের রকমফের, তার ভিন্নতা বিস্তৃত।
ভারতে চিরাচরিত বডি আর্টের হিসেবে উল্কি বা ট্যাটুর পাশাপাশি মেহেন্দি ব্যাপকভাবে প্রচলিত। সেইসঙ্গে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মতো আরও বিভিন্ন ধর্মীয় কারণে উদ্বুদ্ধ জনগোষ্ঠী যে তিলক কাটে, মাটি দিয়ে দেহকে রাঙিয়ে তোলে সেগুলোও এই বডি আর্টের অংশ। এই বিষয়টি পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের অনেকের স্বীকৃতি দিতে চান না, কিন্তু সেটা দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছু নয়। আজকের দিনের বডি পেইন্ট, নিউড বডি পেইন্ট বা প্রাচীনকালে রেড ইন্ডিয়ান সহ পশ্চিমা দুনিয়ার বিভিন্ন জনজাতির নানান ধরনের ভেষজ রঙ দিয়ে নিজেদের দেহকে রাঙিয়ে রাখাটা যদি বডি আর্টের অংশ হয়, তাহলে ভারতের তিলক কাটাও বডি আর্ট।
মধ্যপ্রদেশের গোন্ড নামক আদিম জনজাতি গোষ্ঠীর কথা অনেকেই জানেন। এরা এই দেশের উল্কি মূলক বডি আর্টের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। গোন্ড সম্প্রদায়ের মহিলাদের যোনি-তে সতীত্বের চিহ্ন হিসেবে এক বিশেষ ধরনের ট্যাটু সেই সুপ্রাচীনকাল থেকে করা হয়ে আসছে। একে গোন্ডানি বলে। আবার সাঁওতাল, মুণ্ডা সহ বহু আদিম জনগোষ্ঠী আজও নিজেদের বংশপরিচয় হিসেবে ট্যাটু করে। তবে অন্য অনেক জায়গার থেকে ভারতের এই ঐতিহ্যগত ট্যাটুর নকশার কিছু ভিন্নতা আছে। এখানে সেগুলো সাধারণত ছোট ছোট চিহ্ন বা পূর্বপুরুষের নাম লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ। আজকের হাল ফ্যাশানে অনেকেই দেহ জুড়ে বড় বড় ট্যাটু আঁখেন। কিন্তু জাতিগত, বংশগত কারণে যে ঐতিহ্যবাহী ট্যাটু এখানে প্রচলিত সেখানে খুব বড় ট্যাটুর অবস্থান সেভাবে লক্ষ্য করা যায় না।
ভারতের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য হল মুলতানি মাটি সহ বিভিন্ন রঙিন মাটি, ভেষজ উদ্ভিদ ও ফুলের রস এবং চন্দন দিয়ে দেহকে রাঙিয়ে তোলা। বহু ঐতিহাসিক লেখা ও নিদর্শনে পাওয়া গিয়েছে, একসময় বিবাহের আগে ভারতীয় নারীরা এই সমস্ত মাটি ও ভেষজ রঙ দিয়ে নিজেদের দেহ রাঙিয়ে তুলত। এই ঐতিহ্য রাজ পরিবারগুলোতে যেমন প্রচলিত ছিল, তেমনই সাধারণ প্রজাদের মধ্যেও দেখা যেত।
তাছাড়া আজও বিয়ের সময় মুখে যে কল্কা, বিন্দিয়া আঁকা হয় সেগুলো তো বডি আর্ট'ই। তবে এই প্রথার অন্যতম উজ্জ্বল নিদর্শন হল- বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মানুষজন। তারা মুলতানি মাটি ও চন্দন সহযোগে নিয়মিত তাদের মুখমণ্ডলের পাশাপাশি হাত, গলা ও দেহের একাংশ রাঙিয়ে থাকেন। এটা অবশ্যই যেমন ধর্মীয় পরিচয় জানান দেয়, তেমনই এক সুদীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।
তাছাড়া বিয়ে উপলক্ষে ধর্ম, বর্ণ, সম্প্রদায় নির্বিশেষে ভারতীয় নারীদের মেহেন্দি করা বিশ্বজুড়ে স্বীকৃত এক সমৃদ্ধ বডি আর্টের নিদর্শন। তিলক কাটাই বলুন বা মেহেন্দি, এগুলো এক দিন থেকে সপ্তাহ দুই পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তবে তিলক যেহেতু প্রতিদিনই কাটেন, তাই বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের মানুষের শরীরে এই বিশেষ ধরনের বডি আর্টের চিন সবসময়ই দেখা যায়।
পিয়ার্সিং বা সেই সংক্রান্ত বডি আর্টের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ক্ষেত্র নিঃসন্দেহে আফ্রিকা। তবে ভারত এক্ষেত্রে খুব পিছিয়ে নেই। আজকের হাল ফ্যাশনের পিয়ার্সিং বাদ দিয়েও এই দেশের আদিম জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে কানে, নাকে পিয়ার্সিংয়ের মাধ্যমে বডি আর্ট করার সুপ্রাচীন ঐতিহ্য প্রচলিত আছে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, যারা আদিম জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত নন, তথাকথিত মূল স্রোতের ভারতীয়দের মধ্যেও পিয়ার্সিং ব্যাপক মাত্রায় প্রচলিত। বিশেষ করে পূর্ব ভারতে কানে ও নাকে ফুটো করে না এমন নারী খুব কম দেখা যায়। এটা পিয়ার্সিং বই আর তো কিছু নয়! খুব ছোটবেলায় পরিবারের উদ্যোগে বিশেষ করে পূর্ব ভারতের কন্যা সন্তানদের নাক ও কানে ফুটো করে দেওয়া হয়। অথচ এই বিষয়টা আমরা কেউ সেভাবে খেয়াল করি না। এটাও বডি আর্টের এক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। তাছাড়া আজকের দিনে হাল ফ্যাশনের নেইল আর্টের যে ব্যাপক রমরমা দেখা যায়, সেটা কিন্তু সেই প্রাচীনকালেও ভারতবর্ষে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় ছিল।
সবমিলিয়ে একটা বিষয় বলাই যায়, ভারতের বডি আর্টের ঐতিহ্যগত ধারাবাহিকতা অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী। কিন্তু তা নিয়ে সাধারণ জনগণের অনেকেই হয়ত ততটা সচেতন নন।
(চলবে)
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
