

দাদা রামগুপ্তকে হত্যা করে বৌদিকে বিয়ে করেছিলেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য। ছবি - AI
১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
চাঁদের গায়েই লেগে থাকে কলঙ্ক। ঠিক তেমনই সমৃদ্ধশালী ও প্রবল পরাক্রম গুপ্ত সাম্রাজ্যের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দাদার স্ত্রীকে নিয়ে ভাইয়ের টানাপোড়েন ও ভ্রাতৃহত্যা করে সিংহাসনে বসার এক প্রবল বিতর্কিত অধ্যায়। এই ঘটনার কাছে আধুনিক থ্রিলার বা ক্রাইম ফিকশনও হার মানবে।
গুপ্ত যুগকে ভারতের সমগ্র ইতিহাসের এক অন্যতম সুবর্ণ যুগ বলে মনে করা হয়। কিন্তু এই সুবর্ণ যুগের চাকচিক্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এই অন্ধকার অধ্যায়। সেখানে মিশে আছে কাপুরুষতা, প্রেমের কূটকচালি, গুপ্তহত্যা এবং সবশেষে আপন দাদাকে খুন করে বৌদিকে বিয়ের মতো চরম বিতর্কিত ঘটনা।
মহারাজাধিরাজ সমুদ্রগুপ্তকে ঐতিহাসিকদের একাংশ প্রাচীন ভারতের 'নেপোলিয়ন'বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। তাঁর পরাক্রমে গোটা ভারতবর্ষ কেঁপে উঠত। আনুমানিক ৩৭৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর সিংহাসনে বসেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রামগুপ্ত।
রামগুপ্তের মধ্যে বাবার শৌর্যবীর্যের ছিটেফোঁটাও ছিল না। তিনি ছিলেন অত্যন্ত দুর্বল এবং ভীরু প্রকৃতির একজন শাসক। তাঁর এই দুর্বলতার সুযোগ নিতে দেরি করেনি পশ্চিম ভারতের দুর্ধর্ষ শকরা। তাদের শক্তিশালী রাজা রুদ্রসেন অতর্কিত আক্রমণ করেন গুপ্ত সাম্রাজ্য। সেই যুদ্ধে রামগুপ্ত শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। শকরা তাঁকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। নিজের প্রাণ এবং সিংহাসন বাঁচাতে রামগুপ্ত শত্রুর কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু শক রাজা সন্ধির জন্য যে শর্ত চাপিয়ে দেন, তা ছিল গুপ্ত বংশের সম্মানে এক চরম কুঠারাঘাত।
শক রাজার সন্ধির শর্ত ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। রামগুপ্তকে তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ গুপ্ত সম্রাজ্ঞী ধ্রুবদেবীকে উপঢৌকন হিসেবে শক শিবিরে পাঠিয়ে দিতে হবে। অবাক করা বিষয় হল, রামগুপ্ত নিজের প্রাণ বাঁচাতে এই অপমানজনক শর্তে দিব্যি রাজি হয়ে যান। নিজের স্ত্রীকে শত্রু রাজার হাতে তুলে দেওয়ার এই কাপুরুষোচিত সিদ্ধান্ত রাজপরিবারের অন্দরমহলে এক তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।
আর ঠিক এখানেই গোটা ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দেন রামগুপ্তের ছোট ভাই দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। কুলবধূর এই চরম অপমান তিনি কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি। দাদার সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি নিজেই এক দুঃসাহসিক এবং বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত নেন।
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বুঝতে পেরেছিলেন সরাসরি যুদ্ধে শকদের হারানো কঠিন। তাই তিনি ছলাকলার আশ্রয় নেন। ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি নিজেই সম্রাজ্ঞী ধ্রুবদেবীর ছদ্মবেশ ধারণ করে পালকিতে চড়ে বসেন। তাঁর সাথে বেশ কয়েকজন বিশ্বস্ত এবং দুর্ধর্ষ গুপ্ত সেনাকে গুপ্ত সম্রাজ্ঞীর সখীদের বেশে সাজানো হয়। এরপর মহিলাদের পালকিতে করে তাঁরা সোজা শকদের শিবিরে গিয়ে পৌঁছান।
শক রাজা জানতেন যে গুপ্ত সম্রাজ্ঞী আসছেন। তাই তিনি কামার্ত হয়ে পালকির কাছে ছুটে যান। আর তখনই ধ্রুবদেবীর বেশে থাকা চন্দ্রগুপ্ত তাঁর লুকিয়ে রাখা ধারালো অস্ত্র বের করে নিমেষের মধ্যে শক রাজাকে হত্যা করেন। এরপর ছদ্মবেশী গুপ্ত সেনারা শক শিবিরে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সেই সময় রাজার শিবিরে উপস্থিত শকদের সমস্ত উচ্চপদস্থ রাজ কর্তাদের ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
সাম্রাজ্যের সম্মান উদ্ধার করে চন্দ্রগুপ্ত যখন ধ্রুবদেবীকে নিয়ে রাজধানীতে ফিরে আসেন তখন, তাঁকে ঘিরে উল্লাস ফেটে পড়ে সাধারণ প্রজা থেকে শুরু করে সৈন্য, রাজ পরিবারের সদস্যরা সকলে। সবাই তাঁকে ত্রাতা হিসেবে মেনে নেয়। অন্যদিকে রামগুপ্ত সকলের চোখে চরম ঘৃণার পাত্রে পরিণত হন।
জনসমর্থন পুরোপুরি নিজের দিকে বুঝতে পেরে চন্দ্রগুপ্ত এক চরম পদক্ষেপ নেন। তিনি দাদা রামগুপ্তকে হত্যা করেন। এরপর নিজেই গুপ্ত সাম্রাজ্যের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং পরবর্তীতে 'বিক্রমাদিত্য' উপাধি গ্রহণ করেন। ইতিহাসের পাতায় তিনি দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্য নামে বিখ্যাত হয়ে আছেন।
গুপ্ত সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসার পর দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত তাঁর সদ্য বিধবা বৌদি ধ্রুবদেবীকে বিবাহ করে সাম্রাজ্যের প্রধান মহিষীর মর্যাদা দেন।
বহুদিন পর্যন্ত ঐতিহাসিকরা এই ঘটনাকে নিছক গল্প বা নাটক বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ভি. এ. স্মিথ মনে করতেন, রামগুপ্ত বলে বাস্তবে কেউ ছিলেনই না। কিন্তু সময় গড়িয়ে যাওয়ার সাথে সাথে গুপ্ত সাম্রাজ্যের এই পর্ব নিয়ে একের পর এক অকাট্য প্রমাণ সামনে আসতে থাকে।
বিশাখদত্ত রচিত 'দেবীচন্দ্রগুপ্তম' নাটকে এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। মূল নাটকটি হারিয়ে গেলেও রামচন্দ্র ও গুণচন্দ্রের 'নাট্যদর্পণ' গ্রন্থে এর খণ্ডাংশ পাওয়া যায়। সপ্তম শতাব্দীতে বাণভট্ট তাঁর 'হর্ষচরিত' গ্রন্থে স্পষ্ট লিখেছেন, চন্দ্রগুপ্ত স্ত্রীর ছদ্মবেশ ধারণ করে এক পরস্ত্রীকামী শকপতিকে হত্যা করেছিলেন।
রাষ্ট্রকূট রাজা প্রথম অমোঘবর্ষের ৮৭১ খ্রিস্টাব্দের 'সঞ্জন তাম্রশাসন' থেকে এই ঘটনার সরাসরি প্রমাণ মেলে। সেখানে পরিষ্কার বলা হয়েছে, একজন গুপ্ত রাজা তাঁর দাদাকে হত্যা করে রাজ্য এবং স্ত্রীকে অধিকার করেছিলেন।
রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ডি. আর. ভাণ্ডারকরের মতো প্রখ্যাত ঐতিহাসিকরা এই বিষয়টি নিয়ে ধন্দে ছিলেন। তবে মধ্যপ্রদেশের বিদিশা থেকে তিনটি জৈন তীর্থঙ্কর মূর্তি উদ্ধার হয়। এর পাদদেশে প্রাকৃত ভাষায় 'মহারাজাধিরাজ রামগুপ্ত' নামটি খোদাই করা ছিল। এরপর ঐতিহাসিক এ. এস. আলতেকার এবং কে. ডি. বাজপেয়ী মালব ও এরন অঞ্চল থেকে রামগুপ্তের নামাঙ্কিত প্রচুর তাম্র মুদ্রা আবিষ্কার করেন।
এইসব মুদ্রা ও শিলালিপি আবিষ্কারের পর রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতো ঐতিহাসিকরাও মেনে নিতে বাধ্য হন যে এই ঘটনা পুরোপুরি সত্যি।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
