

চার স্ত্রীর সঙ্গে ভুটানের চতুর্থ রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক। ছবি - Google
৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১৯৭৯ সাল। পুনাখা জং-এর প্রাচীন ও পবিত্র প্রাঙ্গণ সেজে উঠেছে দুর্দান্ত সাজে। তবে সবটাই যেন গোপনে।মণ্ডপে বসে আছেন ভুটানের দোর্দণ্ডপ্রতাপ চতুর্থ রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক। আর তাঁর সামনে বধূবেশে বসে চার তরুণী। তাঁরা একে অপরের সৎবোন নন, নন কোনও দূরসম্পর্কের আত্মীয়া। আপন চার বোন!
অর্থাৎ ভুটানের চতুর্থ রাজা একসঙ্গে আপন চার বোন- আশি দর্জি ওয়াংমো, আশি শেরিং পেম, আশি শেরিং ইয়াংডন এবং আশি সাংগে চোয়েদোন-কে বিয়ে করেছিলেন! তাঁরা সকলেই আজও জীবিত। একই দিনে, একই লগ্নে এই চার সহোদরাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেন ভুটান রাজ। এমন ঘটনা বিশ্বের ইতিহাসে অতি বিরল।
তবে বহুদিন এই বিয়ের কথা চেপে রাখা হয়েছিল। ১৯৮৮ সালে প্রথম ভুটানের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে এই বিয়ের কথা স্বীকার করা হয়। এবং চার রানিকে এই সমভাবে রানির মর্যাদা দেওয়া হয়। এই ঘটনা জানাজানি হতে সারা বিশ্বে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল।
মধ্যযুগ পরবর্তী ভুটান কোনওদিনই কেবল তরবারির জোরে শাসিত হয়নি। সপ্তদশ শতাব্দীতে আধুনিক ভুটানের রূপকার শবদ্রুং ঙ্গাওয়াং নামগিয়াল তিব্বত থেকে পালিয়ে এসে এই দুর্গম উপত্যকায় পা রেখেছিলেন। তার আগে অবশ্য ভুটান বলে কোনও নির্দিষ্ট দেশ বা জনপদ ছিল না। আলাদা আলাদাভাবে এখানকার উপত্যকাগুলো স্থানীয় সামন্ত প্রভু বা উপজাতি সর্দারদের দ্বারা শাসিত হত। আর তাদের উপর তিব্বতের বিভিন্ন বৌদ্ধ গোষ্ঠীর নিজেদের মতো করে আলাদা আলাদা প্রভাব ছিল।
শবদ্রুং ঙ্গাওয়াং নামগিয়াল আজকের ভুটানে পৌঁছে বুঝেছিলেন, শুধু সামরিক শক্তি দিয়ে এই বিক্ষিপ্ত জনপদকে এক সুতোয় গাঁথা যাবে না। প্রয়োজন ধর্মের বন্ধন। তিনি জন্ম দিলেন 'চোয়েসি' (Choesi) শাসন ব্যবস্থার। এককথায়, ধর্ম (Chhoe) এবং রাজনীতি বা প্রশাসনের (Sid) এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন। যা অনেকটা তিব্বতের দলাই লামা কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার মতো, তবে যথেষ্ট পার্থক্যও ছিল।
প্রায় আড়াইশো বছর অনেক ঘাত প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ভুটানে এই চোয়েসি শাসনব্যবস্থা চলে। এই শাসনব্যবস্থায় একজন ধর্মীয় প্রধান ও আরেকজন রাজনৈতিক প্রধান থাকতেন। তাঁরা কেউই বংশানুক্রমিক ক্ষমতায় বসতেন না। তিব্বতি বৌদ্ধ রীতি অনুসরণ করে তাঁদের নিয়োগ করা হত। তবে এই শাসন ব্যবস্থার ফলে একসময় ভুটানের ঐক্য বিপর্যয়ের মুখে পড়ে যায়। সেই পরিস্থিতিতে ১৯০৭ সালে ওয়াংচুক রাজবংশ গোটা দেশকে একতাবদ্ধ করে প্রথম পারিবারিক রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ভুটানে চালু করে।
ওয়াংচুক রাজবংশ গত প্রায় একশো কুড়ি বছর ধরে ভুটান শাসনের প্রশ্নে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রাখলেও এখানে আধ্যাত্মিক গুরুদের প্রভাব যথেষ্ট মাত্রায় আছে। আজও ভুটানের আধ্যাত্মিক শিকড়টা রয়ে গিয়েছে সেই শবদ্রুং-এর অনুগামীদের হাতেই। ধর্মীয় প্রধান বা 'জে খেনপো'-র প্রভাব ভুটানের জনমানসে এতটাই গভীর যে, রাজতন্ত্রও জানত, ধর্মের পূর্ণ সমর্থন ছাড়া সিংহাসন টিকিয়ে রাখা মুশকিল।
চতুর্থ রাজার এই বিবাহ কোনও আবেগতাড়িত সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং ছিল এক নিখুঁত 'মাস্টারস্ট্রোক'। ওই চার বোন সাধারণ কোনও পরিবারের মেয়ে ছিলেন না। তাঁদের নাড়ির টান জড়িয়ে ছিল স্বয়ং শবদ্রুং ঙ্গাওয়াং নামগিয়ালের সঙ্গে! তাঁরা ছিলেন শবদ্রুং-এর ‘মাইন্ড ইনকারনেশন’ বা মনের অবতারের সরাসরি বংশধর।
একটু তলিয়ে ভাবলেই সমীকরণটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে। ওয়াংচুক রাজবংশের হাতে রয়েছে অসীম ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক ক্ষমতা। আর এই চার বোনের পরিবারের সঙ্গে রয়েছে ভুটানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য। এই বিবাহের মাধ্যমে রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক আসলে ভুটানের রাজনীতি এবং ধর্মের মধ্যে এক অটুট সেতুবন্ধন রচনা করেছিলেন। যে প্রাচীন চোয়েসি ব্যবস্থা আড়াইশো বছর ধরে ভুটানকে শাসন করেছে, এই একটি বিবাহের মাধ্যমে রাজা সেই ব্যবস্থাকে নিজের রাজপরিবারের রক্তের সাথে মিশিয়ে দেন চিরকালের জন্য। বহির্বিশ্ব যাকে ‘কেচ্ছা’ হিসেবে দেখেছিল, ভুটানের রক্ষণশীল সমাজ তাকে গ্রহণ করল এক আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক মিলন হিসেবে। তাদের কাছে রাজ পরিবারের মর্যাদা ও গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।
সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হল, ভুটান রাজপ্রাসাদের অন্দরে এই চার বোনের বা রানির (বর্তমানে রাজমাতা) সমীকরণ। সাধারণত রাজপরিবারে একাধিক স্ত্রী থাকলে কে ‘প্রধান রানি’ হবেন, তা নিয়ে চরম অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ইতিহাস তার সাক্ষী। কিন্তু ভুটানের ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেনি। চার বোনই পান সমান মর্যাদা। তাঁদের মধ্যে নেই কোনও প্রথম বা দ্বিতীয়র বিভাজন। তাঁরা প্রত্যেকেই রাজার সমান অধিকারপ্রাপ্ত স্ত্রী এবং বর্তমানে প্রত্যেকেই ‘রানিমা’ হিসেবে সম্মানিত।
শুধু তাই নয়, রাজা জিগমে সিংয়ে ওয়াংচুক যে 'গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস' (GNH) বা মোট জাতীয় সুখের যুগান্তকারী দর্শন বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন, তাকে বাস্তবায়িত করতে এই চার রানি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন। কেউ শিক্ষার প্রসারে, কেউ পরিবেশ সংরক্ষণে, আবার কেউ ভুটানের প্রাচীন সাহিত্য ও বয়নশিল্পের পুনরুদ্ধারে নিজেদের নিয়োজিত করেছিলেন।
সময়ের চাকা ঘুরেছে। চতুর্থ রাজা স্বেচ্ছায় ক্ষমতা হস্তান্তর করেন তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র (তৃতীয় রানির সন্তান) জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুকের হাতে। তিনি যখন ২০১১ সালে সাধারণ পরিবারের মেয়ে জেৎসুন পেমা-কে বিবাহ করেন, তখন তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন বহুবিবাহের প্রথা তিনি আর এগিয়ে নিয়ে যাবেন না। জেৎসুন-ই হবেন তাঁর একমাত্র স্ত্রী।
এই সিদ্ধান্ত প্রমাণ করে যে, ওয়াংচুক রাজবংশ কতটা সময়োপযোগী। যে সময়ে রাজতন্ত্রের স্থায়িত্ব এবং ধর্মীয় ঐক্যের জন্য চার বোনকে বিবাহের প্রয়োজন ছিল, চতুর্থ রাজা ঠিক সেটাই করেছিলেন অত্যন্ত সুচারুভাবে। পরে যখন ভুটান এক আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়, তখন বর্তমান রাজা সেই প্রাচীন প্রথা ভেঙে আধুনিক একবিবাহের পথে হেঁটেছেন।
ভুটান বরাবরই এক রহস্যের মোড়কে ঢাকা দেশ। বাইরের চোখ দিয়ে দেখলে তাদের অনেক কিছুই অদ্ভুত বা রক্ষণশীল মনে হতে পারে। কিন্তু সেই অদ্ভুত প্রথাগুলোর পরতে পরতে লুকিয়ে থাকে রাষ্ট্র পরিচালনার এমন সব সূক্ষ্ম কৌশল, যা আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদেরও অবাক করে দেয়। চার বোনের এক স্বামীর ঘর করার এই আখ্যান আসলে কোনও রাজকীয় রূপকথা নয়, এটি আসলে ভুটানের ধর্ম ও রাষ্ট্রের এক সুনিপুণ রাজনৈতিক বুনন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
