

ভারতে জেন জি বিক্ষোভ। ছবি - Google.
২৮শে জুলাই, ২০২৬
একবিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো ভারতীয় গণমাধ্যমও কর্পোরেট সম্প্রসারণের অন্তর্ভুক্ত হয়ে একটি লাভজনক ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। এতদিন বইয়ের পাতায় গণতন্ত্রের 'চতুর্থ স্তম্ভ' হিসেবে স্বীকৃত যে সংবাদমাধ্যম, তার স্বকীয়তা হারিয়ে তা স্থান নেয় ব্যক্তিমালিকানায়। সেই সময় থেকেই বড় বড় মিউচুয়াল ফান্ড হাউসের সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে দেশীয় শেয়ার বাজারের 'বিপুল সম্ভাবনা' এবং ব্যক্তিবিনিয়োগের আবশ্যকতা প্রচারের এক নতুন সংস্কৃতি শুরু হয়। আর এই প্রেক্ষাপটেই আমরা প্রথম মুখোমুখি হই দুটো নতুন অর্থনৈতিক ধারণার—'ইন্ডিয়া গ্রোথ স্টোরি' এবং 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড'।
মূল যুক্তিটি ছিল যেমন আকর্ষণীয়, তেমনই প্রাতিষ্ঠানিক। কোনো দেশের ইতিহাসে এটি এমন এক বিরল অর্থনৈতিক সন্ধিক্ষণ, যখন প্রজনন হার কমে আসার কারণে মোট জনসংখ্যার তুলনায় কর্মক্ষম মানুষের (১৫-৬৪ বছর) অনুপাত দ্রুত বাড়তে থাকে। এই বিপুল তরুণ সমাজ যখন কাজের জগতে প্রবেশ করে, তারা উপার্জন করে এবং সেই উপার্জিত অর্থ বাজারে খরচ করে। এই ভোগের ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ে, যা আবার নতুন নতুন শিল্প ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। পাশাপাশি, শিশু ও প্রবীণদের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম থাকায় পরিবার ও রাষ্ট্রের ওপর চাপ কমে এবং জাতীয় সঞ্চয়ের হার বৃদ্ধি পায়। সেই সঞ্চয় পরবর্তীতে পরিকাঠামো ও শিক্ষায় পফের বিনয়োগ হয়ে একটি দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদে ত্বরান্বিত করে। সহজ ভাষায়, এটিই ছিল তৎকালীন 'ভারত বৃদ্ধির গল্প' বা 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড'।
২০০৫ সালে ভারত ছিল এক অত্যন্ত তরুণ দেশ, যার মিডিয়ান বয়স (median age) ছিল ২২ বছরের কিছু বেশি। আজকের ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও ভারত বিশ্বমঞ্চে তরুণ দেশ হিসেবে গণ্য—যদিও আগের সেই সূচক কিছুটা বদলে এখন মিডিয়ান বয়স দাঁড়িয়েছে ২৯-এর কাছাকাছি। কিন্তু গত দুই দশকে যে লভ্যাংশের আশা করা হয়েছিল, তার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে বেশ ভিন্নভাবে।
আজ সেই জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সংস্থানের মূল প্রতিনিধি—আমাদের তরুণ সমাজ বা জেন-জি (Gen Z)—নানা প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে রাজপথে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা তাদের এই ক্ষোভের তাৎক্ষণিক স্ফুলিঙ্গ হলেও, এর পেছনে রয়েছে একটি গভীর অর্থনৈতিক ও কাঠামোগত ইতিহাস।
জনসংখ্যাতাত্ত্বিক লভ্যাংশ অর্জনের একমাত্র ও অপরিহার্য শর্ত হল—অর্থনীতিকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য উপযুক্ত ও ভাল আয়ের কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। তরুণ সমাজ লেখাপড়া করবে কিন্তু কাজের সুযোগ পাবে না—এই পরিস্থিতি অর্থনীতিকে লভ্যাংশ দেওয়ার বদলে ডেমোগ্রাফিক ঝুঁকিতে ফেলে দেয়।
গত চার দশকে ভারতে তরুণদের মধ্যে শিক্ষার হার কিন্তু সার্বিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেট অফ ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬ রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৮৩-৮৪ থেকে ২০২৩-২৪ সালের মধ্যে ১৫-১৯ বছর বয়সী তরুণদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যুক্ত থাকার হার ৪৯% থেকে বেড়ে ৭৩%-এ পৌঁছেছে। তরুণীদের ক্ষেত্রে এই সূচক ৩৮% থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮%-এ। ২০১০ সালে প্রতি লাখ তরুণ জনসংখ্যার জন্য কলেজে পড়ার সুযোগ ছিল ২৯ জনের, যা ২০২১ সালে বেড়ে ৪৫-এ দাঁড়িয়েছে।
বর্তমান পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ৩৬.৭ কোটি মানুষ ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী বন্ধনীতে পড়ে। শিক্ষা গ্রহণকারীদের বাদ দিলে, প্রায় ২৬.৩ কোটি মানুষ দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ কর্মীবাহিনী। ডিজিটাল যোগাযোগের প্রসারের কারণে এই প্রজন্ম পূর্ববর্তী যেকোনো প্রজন্মের চেয়ে অধিক সচেতন ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী।
সরকারি 'পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে' (PLFS) অনুযায়ী তরুণদের বেকারত্বের হার সম্প্রতি কিছুটা কমতে দেখা গেলেও, অনুন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের শ্রমবাজারকে কেবল বেকারত্বের হার দিয়ে পরিমাপ করা কঠিন। ভারতের মতো অর্থনীতিতে বেশিরভাগ মানুষের কাছে দীর্ঘদিন সম্পূর্ণ কাজহীন বা আয়হীন অবস্থায় বসে থাকার আর্থিক সামর্থ্য থাকে না। বেঁচে থাকার তাগিদেই মানুষকে কোনো না কোনো কাজে যুক্ত হতে হয়।
ফলে, প্রথাগত মাইনেভিত্তিক চাকরি না পেয়ে অনেকেই ছোটখাটো স্ব-কর্মসংস্থান, কৃষিকাজ কিংবা অনিয়মিত কায়িক শ্রমে যুক্ত হন। অর্থনৈতিক পরিভাষায় এদের যুক্ত থাকাটা অনেক সময় 'বাধ্যতামূলক উদ্যোক্তা' (reluctant entrepreneurs) হিসেবে চিহ্নিত হয়—যা মূলত উপার্জনের কোনো বিকল্প উপায় না থাকার ফল, কোনো সমৃদ্ধশালী ব্যবসা চালুর লক্ষণ নয়।
ভারতের অর্থনীতি কেন এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে প্রথাগত কর্মসংস্থানে অন্তর্ভুক্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের কৌশলে। ঐতিহাসিকভাবে, যে দেশগুলো (যেমন পূর্ব এশিয়ার অর্থনীতিসমূহ) তাদের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুযোগের পূর্ণ ব্যবহার করেছে, তারা একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ক্রম মেনে এগিয়েছে:
(ক) প্রথমে কৃষি থেকে শ্রমবিবিড় উৎপাদন খাতে (Labor-intensive Manufacturing) যেমন—বস্ত্রশিল্প, চামড়াশিল্প বা সাধারণ ইলেকট্রনিক্স আসেম্বলিিং-এ বিশাল জনবলকে স্থানান্তরিত করা।
(খ)পরবর্তীতে ধীরে ধীরে উচ্চ দক্ষতাবিশিষ্ট সেবা ও প্রযুক্তি খাতে উন্নীত হওয়া।
ভারত এই ধাপটিকে কিছুটা বাইপাস করে সরাসরি কৃষি থেকে উচ্চ-দক্ষতাভিত্তিক সেবা খাতে উত্তরণ ঘটিয়েছে। ইনফরমেশন টেকনোলজি (IT) বা ফাইন্যান্স জাতীয় খাতগুলো দেশের জিডিপি এবং রপ্তানি বৃদ্ধিতে বিশাল অবদান রাখলেও, তারা প্রতি বছর কাজের বাজারে আসা লাখ লাখ মাঝারি বা সাধারণ দক্ষতাসম্পন্ন তরুণের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। ফলে, একটি বড় অংশ কৃষিক্ষেত্র কিংবা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতেই রয়ে গেছে।
বেসরকারি প্রথাগত খাতে স্থায়িত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাব থাকায়, ভারতের শ্রমবাজারে সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক চাকরির আকর্ষণ দীর্ঘকাল ধরেই অত্যন্ত বেশি। একটি স্থায়ী সরকারি কাজ কেবল উচ্চ সামাজিক মর্যাদাই দেয় না, বরং নির্দিষ্ট বেতন ও অবসরের নিরাপত্তাও প্রদান করে।
এর ফলে দেশের একটি বড় অংশ জুড়ে গড়ে উঠেছে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার এক সুবিশাল 'প্রস্তুতি অর্থনীতি' (Coaching Economy)। লাখ লাখ তরুণ তাদের জীবনের সেরা গঠনমূলক সময় ও পরিবারের জমানো অর্থ এই পরীক্ষার পেছনে ব্যয় করে থাকে।
যখন কয়েক হাজার পদের বিপরীতে লাখ লাখ আবেদন জমা পড়ে, তখন সেই দীর্ঘ প্রস্তুতিপর্বের সময়টি পরিসংখ্যানের খাতায় সরাসরি 'বেকার' হিসেবে না উঠে 'শিক্ষার্থী' বা 'পরীক্ষার্থী' হিসেবে নথিভুক্ত থাকে। কিন্তু বাস্তবে তা একটি দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করে।
এই পরিস্থিতিতে যখন পরীক্ষা স্থগিত হয়, নিয়োগ পিছিয়ে যায় বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটে, তখন তা কেবল একটি প্রশাসনিক গোলযোগ থাকে না; তা তরুণ সমাজের জীবন থেকে মূল্যবান বছর এবং তাদের পরিবারের মূলধনকে সংকুচিত করে ফেলে। তদুপরি, সামান্য পদের বিপরীতে প্রকৌশলী বা উচ্চ ডিগ্রিধারীদের আবেদনের যে ছবি মাঝেমধ্যেই উঠে আসে, তা দেশে উপযুক্ত ও মানসম্পন্ন কাজের সুযোগের অভাবকেই ইঙ্গিত করে।
আজ থেকে দুই দশক আগে যে 'ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড'-এর তত্ত্ব শুনেছিলাম, তা তাত্ত্বিকভাবে সম্পূর্ণ ভুল ছিল না। ভারতের যুবসমাজ শিক্ষা লাভ করেছে, ডিজিটাল মাধ্যমের সাথে যুক্ত হয়েছে এবং তাদের কর্মদক্ষতা প্রমাণেও তারা উৎসুক।
তবে আজ অর্থনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের বিশ্লেষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু হল—কেবল শিক্ষার বিস্তার ঘটালেই একটি দেশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার ডেমোগ্রাফিক লভ্যাংশ পায় না। এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি শিল্প পরিকাঠামো যা সর্বস্তরের দক্ষতার মানুষের জন্য স্থায়ী, নিরাপদ ও উৎপাদনশীল কাজের পথ তৈরি করতে পারে।
২০০৫ সালের সেই আশাবাদী আলোচনার ২১ বছর পর, ভারতের জনসংখ্যাতাত্ত্বিক সুযোগটি কিন্তু এখনও একেবারে শেষ হয়ে যায়নি—তবে সময় সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে। তরুণ সমাজকে যথাযথ উৎপাদনশীল খাতে যুক্ত করার এই প্রক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করছে আগামী দিনগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের চূড়ান্ত গতিপথ।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
