৩০শে জুলাই, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

তাররাফালের অন্ধকার এবং চে-ফিদেল-ক্যাব্রাল (পর্ব ২)

তাররাফালের অন্ধকার এবং চে-ফিদেল-ক্যাব্রাল (পর্ব ২)

আমিলকার ক্যাব্রাল ও ফিদেল কাস্ত্রো। ছবি - Google.

তাররাফালের অন্ধকার এবং চে-ফিদেল-ক্যাব্রাল (পর্ব ২)

calender icon 2 ১৩ই জুলাই, ২০২৬

অন্যান্য চ্যাপ্টার

দাসপ্রথা কাগজে-কলমে ১৮৭৬ সালে বন্ধ হলেও কাবো ভার্দের দুঃখ ঘোচেনি। পর্তুগিজ স্বৈরশাসক সালাজারের আমলে দ্বীপের উত্তর প্রান্তে তাররাফাল (Tarrafal) শহরে গড়ে তোলা হয়েছিল এক কুখ্যাত কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প। ১৯৩৬ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত চলা এই ক্যাম্পে পর্তুগালের কমিউনিস্ট নেতা এবং আফ্রিকার অন্যান্য উপনিবেশের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বন্দি করে রাখা হতো। ক্যাম্পের ডাক্তার একবার উপহাস করে বলেছিলেন, "আমি এখানে চিকিৎসা করতে আসিনি, এসেছি ডেথ সার্টিফিকেট সই করতে।" আজ সেখানে এক প্রতিরোধের মিউজিয়াম দাঁড়িয়ে আছে, যা মনে করিয়ে দেয় ঔপনিবেশিক ফ্যাসিবাদের সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা।

কিন্তু এই অন্ধকার থেকেই জন্ম নিয়েছিল এক অভূতপূর্ব প্রতিরোধ, যার সূত্র যুক্ত ছিল মূল ভূখণ্ডের গিনি-বিসাউ এবং সুদূর কিউবার হাভানার সঙ্গে। ১৯৫০-এর দশকের শেষের দিকে আমিলকার ক্যাব্রাল নামের এক অনন্য বিপ্লবী তাত্ত্বিক গড়ে তোলেন 'আফ্রিকান পার্টি ফর দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্স অফ গিনি অ্যান্ড কাবো ভার্দে' (PAIGC)। ক্যাব্রাল ছিলেন এক দূরদর্শী মানুষ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ভৌগোলিক দূরত্ব থাকলেও গিনি-বিসাউ এবং কাবো ভার্দের মানুষের শত্রু এক— পর্তুগিজ উপনিবেশবাদ। তাই দুই দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে তিনি এক সুতোয় বেঁধেছিলেন।

১৯৬৩ সালে গিনি-বিসাউতে পুরোদমে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু হলেও কাবো ভার্দেতে তা ছিল মূলত গোপন প্রতিরোধ। ঠিক এই সময়েই ইতিহাসে এন্ট্রি নেন লাতিন আমেরিকার কিংবদন্তি বিপ্লবী চে গুয়েভারা। ১৯৬৫ সালের শুরুর দিকে চে যখন আফ্রিকা সফরে আসেন, তখন রিপাবলিক অফ গিনির কোনাক্রি শহরে আমিলকার ক্যাব্রালের সঙ্গে তাঁর এক ঐতিহাসিক বৈঠক হয়। সেই বৈঠক কাবো ভার্দের মুক্তি সংগ্রামের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।

যে স্বপ্ন বুনেছিলেন চে এবং ফিদেল

ক্যাব্রালের সঙ্গে চে গুয়েভারা এবং পরবর্তীতে ফিদেল কাস্ত্রোর ঘনিষ্ঠতা এতই বৃদ্ধি পায় যে, ১৯৬৬ সালে হাভানায় আয়োজিত এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার সংহতি সম্মেলনে ক্যাব্রাল সপার্ষদ যোগ দেন। ফিদেল কাস্ত্রো ক্যাব্রালের মেধা ও রণকৌশলে এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে, কিউবা সরাসরি গিনি-বিসাউয়ের মুক্তাঞ্চলে ডাক্তার এবং সামরিক উপদেষ্টা পাঠাতে শুরু করে।

এখানেই শেষ নয়, কিউবার মাটিতে অত্যন্ত গোপনে কাবো ভার্দের প্রায় তিন ডজন তরুণ ক্যাডারকে সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়। এই দলটির নেতৃত্বে ছিলেন পেড্রো পিরেস (যিনি স্বাধীন কাবো ভার্দের প্রধানমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন)। পরিকল্পনা ছিল, কিউবায় প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এই গেরিলারা কাবো ভার্দের পার্বত্য দ্বীপ সান্টো আন্তাও বা সায়ো তিয়াগোতে নৌপথে ল্যান্ডিং করবেন এবং স্থানীয় গোপন সংগঠনের সাহায্যে দ্বীপপুঞ্জেও সশস্ত্র যুদ্ধ ছড়িয়ে দেবেন।

যদিও ১৯৬৭ সালের শেষের দিকে পর্তুগিজ ফ্যাসিবাদের চরম দমনপীড়নের কারণে ক্যাব্রাল এই ল্যান্ডিং পরিকল্পনা সাময়িকভাবে স্থগিত করেন, কিন্তু কিউবায় প্রশিক্ষণ নেওয়া সেই কাবো ভার্ডিয়ান যোদ্ধারা গিনি-বিসাউয়ের গেরিলা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক, গিনি-বিসাউ আর কাবো ভার্দের এই যৌথ লড়াই পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল, যার চূড়ান্ত পরিণতি ছিল ১৯৭৪ সালের ২৫ এপ্রিল পর্তুগালের অভ্যন্তরীণ 'কার্নেশন রেভোলিউশন' বা লবঙ্গ বিপ্লব। এই অভ্যুত্থানের পরই পর্তুগালের নতুন সরকার আফ্রিকার উপনিবেশগুলোর স্বাধীনতা স্বীকার করতে বাধ্য হয়।

অবশেষে, ১৯৭৫ সালের ৫ জুলাই Praia (প্রাইয়া) শহরে অবিলিও দুয়ার্তে নামের এক দেশপ্রেমিক কাবো ভার্দেকে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন। সেই ঘোষণাপত্রে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল— "আমরা, দ্বীপের মানুষেরা, ঔপনিবেশিক শৃঙ্খল ভেঙে মুক্ত মনে আমাদের আফ্রিকান নিয়তিকে বেছে নিলাম।"

(চলবে)

The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.

সৌরভ গোস্বামী

সৌরভ গোস্বামী

কলকাতার বেহালায় জন্ম। দক্ষিণ কলকাতার এন্ড্রিউজ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক স্কুলিং। এরপরে আশুতোষ কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমফিল করে আপাতত সাংবাদিকতার সাথে কিছু বছর যুক্ত। ভবিষ্যতে একাডেমিকসে/শিক্ষকতায় যাওয়ার ইচ্ছা। লেখালিখিতে হাতেখড়ি কলেজে পড়াকালীন সময়েই। অবসর সময়ে ভ্রমণ, ফুটবল, গিটার, পড়াশোনা, রান্না করতে ভালবাসেন।

অন্যান্য