

প্রতিবাদে মুখর হলেন জুনিয়র ডাক্তাররা। নিজস্ব ছবি - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
২৩শে জুন, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
আরজি কর-কাণ্ডের প্রতিবাদে রাজপথে সাধারণ মানুষ নেমেছিলেন। কিন্তু আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিলেন জুনিয়র ডাক্তাররা। সহকর্মীর মৃত্যুর বিচার চেয়ে শুরু হওয়া প্রতিবাদ ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিরাপত্তা, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির দাবিতে। যেখানে স্টেথোস্কোপ হাতে তরুণ চিকিৎসকেরা সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিলেন প্রশাসনকে।
৯ অগস্টের ঘটনার পর প্রথম থেকেই ক্ষোভে ফুঁসছিলেন আরজি করের জুনিয়র ডাক্তাররা। তাঁদের কাছে এটি শুধু একটি অপরাধের ঘটনা ছিল না। তাঁদের বিশ্বাস, যে পরিস্থিতিতে এক তরুণী চিকিৎসক নিজের কর্মস্থলে নিরাপত্তা হারিয়েছেন, সেই পরিস্থিতি বদলানো জরুরি। প্রথম কয়েক দিন প্রতিবাদ সীমাবদ্ধ ছিল হাসপাতাল চত্বরে। কিন্তু দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে রাজ্যের প্রায় সমস্ত সরকারি মেডিক্যাল কলেজে। জুনিয়র চিকিৎসকদের বক্তব্য ছিল, এই লড়াই শুধু এক সহকর্মীর জন্য নয়; ভবিষ্যতে কোনও চিকিৎসক যেন একই পরিণতির মুখোমুখি না হন, সেই দাবিও এর সঙ্গে জড়িত।
প্রতিবাদ ক্রমশ সংগঠিত হতে থাকলে বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তাররা কর্মবিরতির পথে হাঁটেন। জরুরি পরিষেবা চালু থাকলেও বহু ক্ষেত্রে নিয়মিত চিকিৎসা পরিষেবা ব্যাহত হতে শুরু করে। স্বাভাবিকভাবেই সাধারণ মানুষের একাংশ সমস্যার মুখে পড়েন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, বহু রোগী এবং তাঁদের পরিবারও প্রতিবাদী চিকিৎসকদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেন। কারণ, আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। এই সময় থেকেই স্পষ্ট হয়ে যায়, আন্দোলনটি আর শুধুমাত্র চিকিৎসক মহলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।
ক্রমশ আন্দোলনের প্রধান মঞ্চ হয়ে ওঠে সল্টলেকের স্বাস্থ্য ভবন। দিনের পর দিন, রাতের পর রাত, রোদ-বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে অবস্থান চালিয়ে যেতে থাকেন জুনিয়র ডাক্তাররা। কেউ প্ল্যাকার্ড হাতে বসে আছেন, কেউ বক্তৃতা দিচ্ছেন, কেউ আবার সহকর্মীর স্মৃতিতে মোমবাতি জ্বালাচ্ছেন। আন্দোলনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল তার ধারাবাহিকতা। একদিন বা দু’দিন নয়, সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চলতে থাকে।
বহু সাধারণ মানুষও সেখানে গিয়ে সংহতি জানাতে শুরু করেন। কেউ খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন, কেউ জল, কেউ আবার শুধু উপস্থিত থেকে সমর্থন জানাচ্ছেন।
আন্দোলনের তীব্রতা বাড়তে থাকলে চাপ বাড়ে রাজ্য সরকারের উপরও। তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বারবার বলেন, তিনি নির্যাতিতার পরিবারের পাশে আছেন এবং দোষীদের শাস্তি চান। কিন্তু আন্দোলনকারীদের একাংশের বক্তব্য ছিল, তদন্তের প্রথম দিকের ঘটনাগুলি নিয়েই তাঁদের সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন রয়েছে। ফলে প্রশাসন এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে দূরত্ব কমছিল না। এই পরিস্থিতিতেই সামনে আসে আলোচনার প্রস্তাব।
সরকারের তরফে জুনিয়র ডাক্তারদের নবান্নে বৈঠকের ডাক দেওয়া হয়। অনেকেই মনে করেছিলেন, সেখান থেকেই অচলাবস্থার সমাধান হতে পারে। কিন্তু বৈঠক শুরু হওয়ার আগেই তৈরি হয় নতুন বিতর্ক। আন্দোলনকারীদের দাবি ছিল, বৈঠকের সরাসরি সম্প্রচার করতে হবে, যাতে রাজ্যের মানুষ নিজের চোখে পুরো আলোচনা দেখতে পারেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য এটি জরুরি। প্রশাসন সেই দাবি মানতে রাজি হয়নি। ফলে প্রথম বৈঠক কার্যত ভেস্তে যায় এবং আন্দোলন আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই স্বাস্থ্য ভবনের সামনে গিয়ে আন্দোলনরত ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেন। পরে কালীঘাটের বাড়িতেও আলোচনার ডাক দেওয়া হয়। কিন্তু সেখানেও সরাসরি সম্প্রচার নিয়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়। বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন দৃশ্য বিরল, যেখানে সরকার এবং আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলোচনার পদ্ধতিই প্রধান বিতর্কের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এই ঘটনাগুলি আন্দোলনকে আরও বেশি জনসমর্থন এনে দেয়।
দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত সামনে আসে। কলকাতা পুলিশের তৎকালীন কমিশনার বিনীত গোয়েলকে সরানোর সিদ্ধান্ত বিশেষভাবে আলোচিত হয়। পাশাপাশি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিরাপত্তা সংক্রান্ত কিছু আশ্বাসও দেওয়া হয়। যদিও আন্দোলনকারীদের একাংশ মনে করতেন, এগুলি যথেষ্ট নয়। তবু এটিই ছিল প্রথম বড় প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া।
আরজি কর আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রভাবগুলির একটি ছিল নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের আত্মপ্রকাশ। তাঁরা দেখিয়ে দিয়েছিলেন, চিকিৎসক পরিচয়ের পাশাপাশি নাগরিক হিসেবেও তাঁরা প্রশ্ন তুলতে পারেন, প্রতিবাদ করতে পারেন এবং সংগঠিত হতে পারেন। এই আন্দোলন শুধুমাত্র ন্যায়বিচারের দাবিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও নতুন আলোচনা শুরু করে।
ধারাবাহিক গণ আন্দোলন, চিকিৎসকদের বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক চাপ— সব মিলিয়ে তদন্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হতে থাকে। অনেকের মনে তখন একটাই প্রশ্ন, কলকাতা পুলিশের তদন্ত কি যথেষ্ট? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই কলকাতা হাইকোর্টে একের পর এক আবেদন জমা পড়তে শুরু করে।
(চলবে)
হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ, সিবিআইয়ের প্রবেশ এবং রহস্যের নতুন গোলকধাঁধা
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
