

কাবো ভার্দের সাংস্কৃতিক স্পন্দন। ছবি - Google.
১৪ই জুলাই, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
স্বাধীনতার পর কাবো ভার্দের ইতিহাস আর পাঁচটা আফ্রিকান দেশের মতো সামরিক অভ্যুত্থান বা গৃহযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী পথে হাঁটেনি, বরং তা ছিল এক দলীয় শাসন থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণের এক শান্তিপূর্ণ দৃষ্টান্ত। প্রথম দিকে গিনি-বিসাউ এবং কাবো ভার্দে এক জোট হয়ে চলার পরিকল্পনা করলেও ১৯৮০ সালে গিনি-বিসাউতে এক সামরিক অভ্যুত্থানের ফলে সেই রাজনৈতিক ঐক্য ভেঙে যায়। কাবো ভার্দের দলটির নাম বদলে হয় আফ্রিকান পার্টি ফর দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্স অফ গিনি অ্যান্ড কেপ ভার্দে (PAICV)।
১৯৯০ সাল পর্যন্ত একদলীয় শাসন চলার পর, ১৯৯১ সালে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা হয়। 'মুভমেন্ট ফর ডেমোক্রেসি' (MpD) নির্বাচনে জয়ী হয় এবং দেশের প্রথম গণতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট হন আন্তোনিও মাসকারেনহাস মন্তেইরো। সেই থেকে আজ পর্যন্ত কাবো ভার্দেতে ক্ষমতা বদল হয়েছে ব্যালটের মাধ্যমে, বুলেটের মাধ্যমে নয়। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে দেশটির অর্থনীতি পর্যটন শিল্পের ওপর ভর করে চমৎকার বৃদ্ধি অর্জন করেছিল। ২০২০ সালের অতিমারিতে পর্যটন ধাক্কা খেলেও ২০২১ সালের নির্বাচনে হোসে মারিয়া নেভেস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর দেশ আবার ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
তবে সম্পদহীন এই দ্বীপপুঞ্জের সবচেয়ে বড় সমস্যা হল খরা এবং খাদ্যাভাব। বছরের পর বছর বৃষ্টির অভাব আর রুক্ষ মাটির কারণে কৃষিকাজ এখানে প্রায় অসম্ভব। ফলে, দেশের সিংহভাগ মানুষকে বেঁচে থাকতে হয় বিদেশি সাহায্য এবং আমদানিকৃত খাদ্যের ওপর। এই তীব্র সংকটের কারণেই কাবো ভার্দের ইতিহাসের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হল 'অভিবাসন' বা ডায়াসপোরা। আজ খোদ কাবো ভার্দে দ্বীপে যত মানুষ বাস করেন (প্রায় ৫ লাখের কাছাকাছি), তার চেয়ে অনেক বেশি কাবো ভার্ডিয়ান ছড়িয়ে আছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, পর্তুগাল আর ইউরোপের অন্যান্য দেশে। আর এই প্রবাসীরাই রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখেন।
পাঁচ শতাব্দীর পর্তুগিজ শাসন আর আফ্রিকান শেকড়ের এই মিশেল সবচেয়ে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে কাবো ভার্দের সংস্কৃতিতে। এখানকার মানুষ কথা বলেন 'ক্রিওলো' (Crioulo) ভাষায়, যা পর্তুগিজ ব্যাকরণ আর পশ্চিম আফ্রিকান ভাষার এক অপূর্ব ফিউশন।
তাদের লোকগাথা বা গল্পকথার চরিত্র 'তি লোবো' (Ti Lobo) আর 'চিবিনহো' (Chibinho)-র দিকে তাকালে সরাসরি পশ্চিম আফ্রিকান লোকসংস্কৃতির ছায়া দেখা যায়। আবার তাদের মিউজিকের দিকে তাকালে বোঝা যায়, কীভাবে তারা দুঃখকে সুরে রূপান্তর করতে পারে। কাবো ভার্দের নারীরা যখন 'বাতুকো' (Batuko) পরিবেশন করেন— যা মূলত এক ধরণের পলিরিদমিক ড্রামিং এবং কল-অ্যান্ড-রেসপন্স গান— তখন আফ্রিকার আদিম স্পন্দন চেনা যায়।
অন্যদিকে ইউরোপীয় প্রভাব আর দ্বীপের মানুষের একাকীত্বের বেদনা মিলে জন্ম দিয়েছে 'মোরনা' (Morna)-র। মোরনা হল এক ধরণের ধীরগতির, বিষাদভরা গান— যা পর্তুগিজ 'ফাদো' সঙ্গীতের সমতুল্য। এই মোরনাকে বিশ্বদরবারে নিয়ে গিয়েছিলেন কাবো ভার্দের সবচেয়ে জনপ্রিয় গায়িকা সেসারিয়া ইভোরা (Cesaria Evora)। খালি পায়ে স্টেজে দাঁড়িয়ে যখন তিনি গাইতেন, তখন সেই সুরের মধ্যে ভেসে উঠত আটলান্টিকের নোনতা হাওয়া, খরায় পুড়ে যাওয়া দ্বীপের হাহাকার আর প্রিয়জনকে দেশান্তরী হতে দেখার যন্ত্রণা।
(চলবে)
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
কলকাতার বেহালায় জন্ম। দক্ষিণ কলকাতার এন্ড্রিউজ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক স্কুলিং। এরপরে আশুতোষ কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমফিল করে আপাতত সাংবাদিকতার সাথে কিছু বছর যুক্ত। ভবিষ্যতে একাডেমিকসে/শিক্ষকতায় যাওয়ার ইচ্ছা। লেখালিখিতে হাতেখড়ি কলেজে পড়াকালীন সময়েই। অবসর সময়ে ভ্রমণ, ফুটবল, গিটার, পড়াশোনা, রান্না করতে ভালবাসেন।