

সিচুয়েশনশিপ আর অ্যালগরিদমের রোম্যান্সের যুগ নিয়ে এল জেনজি। ছবি - The Fourth Axis.
২৩শে অক্টোবর, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
আজকের দিনে এসে প্রেমের আবহমান ব্যাকরণটাই যেন সম্পূর্ণ ওলটপালট হয়ে গেছে। প্রেম আর কোনও দীর্ঘ অপেক্ষার নাম নয়। বরং প্রেম এখন হাতের মুঠোয় থাকা হাই-স্পিড নোটিফিকেশনের তাৎক্ষণিক ঝলকানি। চিঠি বা ল্যান্ডফোনের যুগের সেই আড়ষ্টতা আজ অতীত।
জেন-জি প্রজন্মের কাছে ভালোবাসা অনেক বেশি সোজাসাপটা এবং বাস্তবমুখী। তাদের কাছে নিজস্ব স্পেস বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার চেয়ে বড় আর কিছু নেই। ভালোবাসা শুরু হতে এখন আর মাস বা বছর কাবার করতে হয় না।
সবকিছুই এখন এক লহমার ডিজিটাল ক্লিক। ডেটিং অ্যাপের পর্দায় বাঁয়ে বা ডানে কয়েকটা সোয়াইপ করলেই হাজির নতুন মানুষ। ইনস্টাগ্রামের স্টোরিতে একটা আগুনের ইমোজি রিঅ্যাক্ট কিংবা স্ন্যাপচ্যাটের স্ট্রিক ধরে রাখা—এখান থেকেই বোনা হয় আধুনিক ভালোবাসার জটিল জাল।
ভালোবাসার প্রচলিত অভিধানে আজ জায়গা করে নিয়েছে একঝাঁক সম্পূর্ণ নতুন শব্দবন্ধ। সেখানে ‘প্রেমিক’ বা ‘প্রেমিকা’ তকমা দেওয়ার আগে মানুষ আটকে থাকে ‘সিচুয়েশনশিপ’-এর ধূসর জগতে। এটি এমন এক সম্পর্ক, যেখানে টান আছে কিন্তু কোনও স্পষ্ট দায়বদ্ধতা নেই।
এর সাথে যুক্ত হয়েছে ব্যবহারের সূক্ষ্ম বিচার। মানুষ এখন প্রথমেই খোঁজে সঙ্গীর মধ্যে কোনও ‘রেড ফ্ল্যাগ’ বা ক্ষতিকর স্বভাব লুকিয়ে আছে কি না। আবার ইতিবাচক গুণ দেখলে তাকে নির্দ্বিধায় দেওয়া হয় ‘গ্রিন ফ্ল্যাগ’-এর তকমা।
সম্পর্কের শুরুতে অতিমাত্রায় মিষ্টি কথা আর উপহারের বন্যায় ভাসিয়ে দেওয়াকে নাম দেওয়া হয়েছে ‘লাভ বম্বিং’। কাউকে বিকল্প হিসেবে ঝুলিয়ে রাখাকে বলে ‘বেঞ্চিং’।
আর সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা হল ‘ঘোস্টিং’। কোনও ঝগড়া বা স্পষ্ট সমাপ্তি ছাড়াই হঠাৎ করে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া। স্রেফ একটা ব্লক বাটনে আঙুল ছুঁইয়ে জলজ্যান্ত একজন মানুষকে নিজের জীবন থেকে বেমালুম মুছে দেওয়া যায়।
এই প্রজন্মের প্রেম সম্পর্কের কোনও চিরন্তন বা অলঙ্ঘনীয় বাঁধনে বিশ্বাসী নয়। তাদের কাছে নিজের ‘মেন্টাল পিস’ বা মানসিক শান্তি সবার উপরে। কেউ কারও ব্যক্তিগত জীবন নিয়ন্ত্রণ করবে—এই ধারণা তাদের কাছে এক চরম দমবন্ধ করা বিষয়।
কাউকে ভালো লাগলে যেমন তারা সোজাসুজি নির্দ্বিধায় ক্যাফে ডেটে যাওয়ার প্রস্তাব দিতে পারে, তেমনই কোনও আচরণে সামান্য খটকা লাগলে মুহূর্তের মধ্যে সম্পর্ক থেকে বেরিয়েও আসতে পারে। দীর্ঘমেয়াদী সারাজীবনের প্রতিশ্রুতির চেয়ে এই প্রজন্ম অনেক বেশি গুরুত্ব দেয় ‘মুহূর্তটিকে উপভোগ করা’র ওপর।
ভবিষ্যতের অনিশ্চিত কল্পনায় না ভেসে তারা বর্তমান সময়টুকুকে যাচাই করে নিতে চায়। নিজেকে ভালো রাখাটাই তাদের কাছে প্রেমের প্রথম ও প্রধান শর্ত। অন্যের জন্য নিজের ব্যক্তিসত্ত্বা বিসর্জন দেওয়াকে তারা স্পষ্টতই এড়িয়ে চলে।
ভালোবাসার প্রকাশের মাধ্যমও আজ পুরোপুরি ভিজ্যুয়াল আর মিম-নির্ভর হয়ে উঠেছে। ডায়েরির পাতায় দীর্ঘ কবিতার জায়গা নিয়েছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইনস্টাগ্রাম রিলস বা মিমস ফরোয়ার্ড করা। দুটি মানুষের মধ্যে কথা না হলেও স্রেফ মিমস আদান-প্রদানের মাধ্যমেই বজায় থাকে প্রতিদিনের যোগাযোগ।
যার সঙ্গে মিমসের রসবোধ বা ‘সেন্স অফ হিউমার’ মিলবে, আধুনিক মনের কাছে সে-ই হয়ে ওঠে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। আবেগের দীর্ঘ অনুচ্ছেদের বদলে মানুষ এখন মনের ভাব বোঝায় ক্যাট-মিমস, ডার্ক হিউমার কিংবা তির্যক জিআইএফ দিয়ে।
এমনকি উপহারের ধরনেও এসেছে আমূল পরিবর্তন। আর্চিজের টেডি বিয়ারের চেয়ে আজকের তরুণ-তরুণী বেশি খুশি হয় স্পটিফাইয়ের কাস্টমাইজড প্লে-লিস্ট কিংবা অনলাইন ফুড ডেলিভারির বিশেষ অর্ডারে। প্রযুক্তিই ঠিক করে দেয় যোগাযোগের গতিপথ।

আধুনিক ডেটিং সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু এখন শহরের ছিমছাম কাচঘেরা বুটিক ক্যাফেগুলো। হিন্দুস্তান পার্ক বা সল্টলেকের ক্যাফেতে পাশাপাশি বসে থাকে তরুণ যুগল। সামনে রাখা থাকে কাচের জারের কোল্ড ব্রু কিংবা ফ্ল্যাট হোয়াইট কফি।
কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, তাদের মুখের কথাবার্তার চেয়েও আঙুলের সচলতা অনেক বেশি। টেবিলে মুখোমুখি বসে থাকলেও দুজনের চোখ হয়তো আটকে থাকে নিজস্ব স্মার্টফোনের রঙিন স্ক্রিনে।
কোন কোণ থেকে কফির ছবি তুললে ইনস্টাগ্রামের স্টোরিটা নিখুঁত দেখাবে, সেই পরিকল্পনাতেই কেটে যায় বহু মুহূর্ত। নিজেদের রসায়নের চেয়েও বেশি জরুরি হয়ে ওঠে সেই সম্পর্কের ডিজিটাল উপস্থিতি। সমাজকে নিজেদের পারফেক্ট রসায়ন দেখানোর এই চাপ সম্পর্কের ভেতরের স্বাভাবিক টানকে অনেক সময় আলগা করে দেয়।
এই সহজলভ্যতা আর ঝড়ের গতির ভিড়েও কোথাও একটা ভারী নিঃশব্দ শূন্যতা কাজ করে। যখন হাতের কাছে বিকল্পের কোনও শেষ থাকে না, তখন মনের গভীরে এক ধরনের স্থায়ী অস্থিরতা বাসা বাঁধে।
চ্যাটবক্সে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ‘Seen’ হয়ে পড়ে থাকা নীল রঙের টিক চিহ্ন তরুণ মনে মারাত্মক উদ্বেগের জন্ম দেয়। কেন উত্তর এল না, অন্য কারও সাথে কথা হচ্ছে কি না—এই ভার্চুয়াল নিরাপত্তাহীনতা কুরে কুরে খায়।
হাজারটা নোটিফিকেশন আর শত শত ভার্চুয়াল চ্যাটের ভিড়েও রাতের বেলা স্ক্রিনের নীল আলোয় একা হয়ে যায় আধুনিক মন। ক্ষণিকের সোয়াইপ আর সিচুয়েশনশিপের মোড়ক ছেড়ে সেই আধুনিক মনও কোথাও গিয়ে এক নিখাদ, নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ করে ফেরে। যে আশ্রয়ে কোনও মেকি ফিল্টার থাকবে না, থাকবে শুধুই ভরসা।
(চলবে)
পরের পর্বে
জেন আলফা: এআই বাবল, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি আর কৃত্রিম স্পর্শ
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।