২৭শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
জেন আলফা: এআই বাবল, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি আর কৃত্রিম স্পর্শ – পর্ব ৪ (শেষ)

জেন আলফার এআই বাবল, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটির যুগ। প্রতীকী ছবি - AI.

জেন আলফা: এআই বাবল, ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি আর কৃত্রিম স্পর্শ – পর্ব ৪ (শেষ)

calender icon 2 ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬

অন্যান্য চ্যাপ্টার

যদি ভাবা যায় ভালোবাসার বদল বুঝি জেন-জির ডেটিং অ্যাপেই শেষ, তবে বিরাট ভুল হবে। কারণ জেন আলফার পৃথিবীতে প্রবেশ করতে করতে ভালোবাসার সংজ্ঞা আরও নাটকীয়ভাবে বদলে যাচ্ছে। প্রেম এখন মানবিক সীমানা ছাড়িয়ে প্রবেশ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর মেটাভার্সের এক অচেনা গোলকধাঁধায়।

যে প্রজন্ম জন্ম থেকেই চোখের সামনে দেখছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদম আর চতুর্দিকে স্মার্ট স্ক্রিনের দাপট, তাদের কাছে সম্পর্কের ধারণাও অনেকটাই যান্ত্রিক। রক্তমাংসের মানুষের জটিলতা ছাড়িয়ে তাদের আবেগ এখন বাঁধা পড়ছে নিখুঁত কোডিংয়ের সমীকরণে। প্রযুক্তি এখানে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং সম্পর্কের অস্তিত্বই হয়ে উঠছে সফটওয়্যার-চালিত।

রক্তমাংসের ত্রুটি বনাম পারফেক্ট এআই পার্টনার

রক্তমাংসের মানুষ ভুল করে, ইগো দেখায়, অপ্রয়োজনীয় ঝগড়া করে কিংবা তীব্র মানসিক আঘাত দেয়। মানুষের মেজাজের কোনো স্থায়ী নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু নিজের মতো করে কাস্টমাইজ করা পার্সোনালাইজড এআই কম্প্যানিয়ন কোনোদিন মেজাজ হারায় না।

তারা ঠিক সেই কথাই বলে, যা অপর প্রান্তের ক্লান্ত মন শুনতে ভালোবাসে। ফলে, জেন আলফার কাছে প্রেম অনেক সময় ক্লাসের কোনো রক্তমাংসের সহপাঠী নয়। বরং স্ক্রিনের ভেতর নিজের পছন্দমতো বানিয়ে নেওয়া এক নিখুঁত ভার্চুয়াল চরিত্র।

তার কাছে সমস্ত দ্বিধা আর দুর্বলতা অকপটে প্রকাশ করা যায় কোনো জাজমেন্টের ভয় ছাড়াই। কোনো প্রত্যাশার চাপ নেই, নেই প্রত্যাখ্যান বা রিজেকশনের ভয়। সম্পর্কের যাবতীয় খামতিকে ছেঁটে ফেলে এক পরম স্বস্তিদায়ক নিরাপদ বলয় বা ‘এআই বাবল’ তৈরি করে নেওয়াই হয়ে উঠছে আধুনিক মনের সহজতম পথ।

ভিআর হেডসেট ও হ্যাপটিক সেন্সরের কৃত্রিম স্পর্শ

ভার্চুয়াল রিয়্যালিটি আর হ্যাপটিক টেকনোলজির যুগে প্রেম এসে দাঁড়িয়েছে এক বিস্ময়কর মোহনায়। যেখানে দূরত্বের ভূগোল সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে পড়েছে।

হাজার মাইল দূরে থাকা দুটো মানুষ চোখে ভিআর হেডসেট আর গায়ে স্পর্শ-অনুকরণকারী হ্যাপটিক সুট চাপিয়ে একে অপরের উপস্থিতি নিখুঁতভাবে অনুভব করতে পারছে। হাতের তালুর উষ্ণতা থেকে শুরু করে ভার্চুয়াল আঙুলের চাপ—সবটাই তৈরি হচ্ছে ইলেকট্রনিক পালসের মাধ্যমে।

ভার্চুয়াল স্পেসে নিজেদের ডিজিটাল অবতার (Avatar) সাজিয়ে চাঁদের দেশে কিংবা প্যারিসের রাস্তায় কফি ডেটে যাওয়াটাই তাদের কাছে অনায়াস বাস্তবতা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফেস-টাইমে সাইলেন্ট মোডে যুক্ত থাকা কিংবা থ্রি-ডি মেটাভার্সে পাশাপাশি হেঁটে বেড়ানোই তাদের সম্পর্কের স্বাভাবিক ভাষা। রক্তমাংসের নৈকট্যের যে ভয় বা অস্বস্তি, তা দূর করে দিচ্ছে এই কৃত্রিম অথচ নিখুঁত প্রযুক্তি।

ডেটা অ্যানালিটিক্সে মাপা হৃদস্পন্দন ও ভালোবাসার গ্রাফ

এই নতুন প্রেমের দুনিয়ায় আবেগের কোনো অস্পষ্ট জায়গা নেই। সমস্ত অনুভূতিই এখন পরিমাপযোগ্য ডেটা অ্যানালিটিক্সে বন্দি।

স্মার্টওয়াচ আর বায়োমেট্রিক সেন্সরের মাধ্যমে সম্পর্কের প্রতিটি ওঠানামা ডিসপ্লেতে নিখুঁত গ্রাফ হয়ে ভেসে উঠছে। কে কার জন্য কতটা সময় ব্যয় করছে, প্রিয় মানুষটির মেসেজ স্ক্রিনে ভেসে উঠলে হৃদস্পন্দন ঠিক কতটা বাড়ছে, কিংবা ভয়েস নোটে ভালোবাসার গভীরতা কতটা খাঁটি—সবটাই বিশ্লেষণ করে দিচ্ছে অ্যালগরিদম।

ভালোবাসা সেখানে কোনো অমূলক অন্ধ আবেগ নয়, বরং একটি নিখুঁত ডেটা চার্ট। এমনকি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কতটা সম্ভাবনাময়, এআই প্রেডিকশন টুল মুহূর্তের মধ্যে সেই স্কোর কার্ড তৈরি করে দিচ্ছে। অনুভূতি যখন বিজ্ঞানের ফর্মুলায় বাঁধা পড়ে, তখন অনিশ্চয়তার ভয় হয়তো কমে, কিন্তু হারিয়ে যায় সম্পর্কের সেই চেনা চমক।

খোলসের রূপান্তর বনাম আদিম আকুতির চিরন্তন সত্য

প্রেমের এই প্রযুক্তিগত রূপান্তর পুরোনো দিনের মানুষদের কাছে ভীষণ অদ্ভুত, অনুভূতিহীন কিংবা কৃত্রিম মনে হতে পারে। সত্তরের দশকের সেই নীল খামের চিঠির ভাঁজে রাখা রজনীগন্ধার সুবাস হয়তো ভিআর হেডসেটের ধাতব আর প্লাস্টিক গন্ধে চিরতরে হারিয়ে গেছে।

কিন্তু খুব গভীরভাবে দেখলে বোঝা যাবে, শত বদলের মাঝেও একটি মৌলিক সত্য সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। তা হল—মানুষের একা না থাকার আদিম আকুতি।

সত্তরের দশকে একচিলতে রোদের অপেক্ষায় ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা সেই তরুণটি যে তীব্র ব্যাকুলতায় ভালোবাসার দৃষ্টি খুঁজত, আজ মেটাভার্সে নিজের ডিজিটাল অবতার নিয়ে বসে থাকা কিশোরটিও ঠিক একই তীব্রতায় এক টুকরো আশ্রয়ই খুঁজে চলেছে। নীল খাম থেকে শুরু করে স্মার্টফোনের এসএমএস, ডেটিং অ্যাপের সোয়াইপ পেরিয়ে আজ এআই কম্প্যানিয়ন—ভালোবাসার প্রকাশের খোলসটা বারবার বদলেছে ঠিকই, কিন্তু বুকের ভেতর কাউকে পাওয়ার আকুতি আর ভালোবাসার খিদেটা মানুষের চিরকাল একই থেকে গেছে। সময় যতই আধুনিক হোক না কেন, মানুষ ভালবাসবেই। ভালবেসে অপ্রাপ্তিতেও ভুগবে, প্রেমের যাতনা বুঝবে, তবু সে ভালবাসবে। কারণ, সৃজনের মূলেই ভালবাসা। ব্রহ্মাণ্ডের বৃহত্তম জাদু। ভালবাসাই সৃষ্টির আদিতম ধর্ম। যুগের পর যুগ ধরে নর-নারী পরস্পরকে ‘ভালবাসি’ বলে গেলেও তাই পুরনো হবে না প্রেমের ভাষা।

(শেষ)

The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.

তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়

সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।

অন্যান্য