২৯শে জুলাই, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

একাকীত্বের অনশন: ইরম চানু শর্মিলা থেকে সোনম ওয়াংচুক

একাকীত্বের অনশন: ইরম চানু শর্মিলা থেকে সোনম ওয়াংচুক

চানু শর্মিলার ১৬ বছর বনাম সোনম ওয়াংচুকের লড়াই। ছবি - Google.

একাকীত্বের অনশন: ইরম চানু শর্মিলা থেকে সোনম ওয়াংচুক

ব্যবস্থার গলদ বনাম নাগরিক বিবেক: এক যৌথ সংকটের মুখ

একটি গণতান্ত্রিক দেশের শাসনব্যবস্থা বা শিক্ষা কাঠামোর ভুলত্রুটি সংশোধনের দায় কি কেবল দু-একজন সমাজকর্মীর? নাকি যে নাগরিকেরা একটি সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখেন, দায়টা তাদেরও? সম্প্রতি দিল্লির যন্তর মন্তরে সোনম ওয়াংচুকের দীর্ঘ অনশন আন্দোলনের আবহে এই জরুরি প্রশ্নটিই নতুন করে তুলে ধরেছেন মণিপুরের 'লৌহমানবী' ইরম চানু শর্মিলা। নিজের জীবনের সুদীর্ঘ ও যন্ত্রণাময় লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি দেশবাসীকে সতর্ক করে বলেছেন, সমষ্টিগত দাবির আন্দোলনকে এভাবে একা একজন মানুষের কাঁধে ফেলে রেখে সমাজ যদি কেবল দর্শক হয়ে বসে থাকে, তবে সেই প্রতিবাদকে রাষ্ট্র খুব সহজেই এড়িয়ে যেতে পারে।

মালম ট্র্যাজেডি এবং এক অসম লড়াইয়ের সূচনা

ইরম চানু শর্মিলার এই লড়াইয়ের ইতিহাস গড়ে উঠেছিল আজ থেকে ছাব্বিশ বছর আগে। ২০০০ সালের ২ নভেম্বর, মণিপুরের মালম শহরে আসাম রাইফেলসের গুলিতে ১০ জন নিরীহ বেসামরিক নাগরিক প্রাণ হারান, যা ইতিহাসে 'মালম গণহত্যা' নামে পরিচিত। এই নিষ্ঠুরতা মাত্র ২৮ বছর বয়সী তরুণী শর্মিলাকে এতটাই নাড়িয়ে দিয়েছিল যে, তিনি মণিপুর থেকে বিতর্কিত 'আর্মড ফোর্সেস স্পেশাল পাওয়ার্স অ্যাক্ট' (AFSPA) প্রত্যাহারের দাবিতে আমরণ অনশনের প্রতিজ্ঞা করেন। শুরু হয় ভারতের তথা আধুনিক বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ এবং নিঃশব্দ এক অহিংস প্রতিরোধ।

নাকের নল, বন্দিত্ব এবং 'শহীদ' বানানোর সামাজিক মনস্তত্ত্ব

তৎকালীন ভারতীয় আইন অনুযায়ী অনশন বা আত্মহত্যার চেষ্টা ছিল দণ্ডনীয় অপরাধ। ফলে আন্দোলন শুরুর তিন দিনের মাথাতেই শর্মিলাকে গ্রেপ্তার করে রাষ্ট্র। শুরু হয় এক অমানবিক ও চক্রাকার রুটিন—প্রতি বছর তাঁকে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারায় গ্রেপ্তার করা হতো, হাসপাতালের বন্দি ওয়ার্ডে নাকের ভেতর নল ঢুকিয়ে জোর করে তরল খাবার (Force-feeding) খাইয়ে বাঁচিয়ে রাখা হতো, আর বছরের শেষে মুক্তি দিয়ে দু-দিন পরেই আবার একই অভিযোগে কারাগারে পোরা হতো।

এইভাবে দীর্ঘ ১৬টি বছর বন্দি থেকে লড়াই চালিয়ে গেছেন শর্মিলা। সারা বিশ্ব তাঁকে 'আয়রন লেডি' বা লৌহমানবী উপাধিতে ভূষিত করেছে। কিন্তু আজ বেঙ্গালুরুতে দাঁড়িয়ে সেই ফেলে আসা দিনগুলোর দিকে তাকিয়ে চানু শর্মিলা আক্ষেপের সুরে বলেন: "মণিপুরের মানুষ আসলে আমাকে তাদের স্বার্থে একটা 'শহীদ' বানিয়ে রেখেছিল। তারা আমাকে উৎসর্গ করতে চেয়েছিল। সবাই দূর থেকে আমার বছরের পর বছর না খেয়ে থাকার মহিমা গাইত ঠিকই, কিন্তু যখন আমার পাশে সশরীরে এসে মানুষের দাঁড়ানো দরকার ছিল, তখন আন্দোলনটা আমার একার মাথায় চেপেই থেকে গিয়েছিল।"

ব্যালট বক্সের নির্মমতা ও নিভৃত প্রস্থান

২০১৬ সালের ৯ আগস্ট। দীর্ঘ ১৬ বছরের অনশন ভেঙে এক ফোঁটা মধু মুখে তুলে নেন ইরম চানু শর্মিলা। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, কেবল নিজের শরীরকে কষ্ট দিয়ে এই বধির ব্যবস্থার ঘুম ভাঙানো যাবে না; পরিবর্তন আনতে হলে ব্যবস্থার ভেতরে ঢুকতে হবে। তিনি নির্বাচনী রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ২০১৭ সালের মণিপুর বিধানসভা নির্বাচনে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ওকরাম ইবোবি সিং-এর বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। কিন্তু রাজনীতির হিসাব ছিল বড় নিষ্ঠুর। যে শর্মিলা মণিপুরের জন্য নিজের জীবনের ১৬টি বসন্ত হাসপাতালের বন্দি ওয়ার্ডে কাটালেন, ভোটের বাক্সে তাঁর ঝুলিতে পড়ল মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি ভোট। এই চরম উদাসীনতা দেখে তিনি সক্রিয় রাজনীতি ও প্রচারের আলো থেকে দূরে সরে যান। বর্তমানে তিনি তাঁর স্বামী ও দুই যমজ কন্যাসন্তানকে নিয়ে বেঙ্গালুরুতে এক শান্ত, নিভৃত জীবন কাটাচ্ছেন।

যন্তর মন্তরের অনশনমঞ্চ: চানু শর্মিলার অভিজ্ঞতায় সোনম ওয়াংচুক

আজ যখন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁস ও অব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর ইস্তফার দাবিতে সোনম ওয়াংচুক দিল্লির বুকে ২০ দিনে পা দেওয়া অনশন চালাচ্ছেন, তখন চানু শর্মিলার এই ফেলে আসা জীবন এক বিরাট সতর্কবার্তা। শর্মিলা স্পষ্ট ভাষায় মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো তা সে কংগ্রেসই হোক কিংবা বর্তমান বিজেপি সরকার—কেউই সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদকে সহজে মান্যতা দিতে চায় না। সরকার একা একজন মানুষকে ভয় পায় না; তারা শুধু অপেক্ষা করে এবং আন্দোলনকে সময়ের নিয়মে মিলিয়ে যেতে দেয়।

NEET পরীক্ষার প্রশ্ন লিকের মতো একটা জাতীয় কেলেঙ্কারি ঘটে গেল। কিন্তু প্রশ্ন হল, যারা ভবিষ্যতে এই ডাক্তার হওয়ার পরীক্ষা দেবে, তাদের বাবা-মায়েরা কি কেউ সোনম ওয়াংচুকের পাশে গিয়ে অনশনে বসেছেন? উত্তরটা আমাদের জানা নেই। আচ্ছা, যারা এ বছরই দুর্নীতির চক্করে পড়ে আবার নতুন করে 'রি-নিট' দিতে বাধ্য হল, সেই লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর অভিভাবকেরা কি যন্তর মন্তরের রাস্তায় নামলেন? এটার উত্তরও বোধহয় 'না'। ধরে নেওয়া যাক, এদের মনে এখনও অদ্ভুত কোনো আশা বেঁচে আছে, কিংবা এরা ধরেই নিয়েছে এই গলদভরা সিস্টেমের ভেতরেই কোনওক্রমে নিজের আখের গুছিয়ে নিতে হবে।

সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হল, এই নিট রি-এক্সামের প্রচণ্ড মানসিক চাপ নিতে না পেরে যে আট-নয়জন নিষ্পাপ বাচ্চা আত্মহত্যা করল, তাদের বাবা-মায়েরা কেউ অনশনে গেছেন কি? সম্ভবত যাননি। কারণ গেলে সেটা নিশ্চিতভাবেই সংবাদমাধ্যমের হেডলাইন হতো। কেন তাঁরা গেলেন না, তা অবশ্য সাধারণ বুদ্ধির বাইরে। সন্তান হারানোর পর ওনাদের কি এখনও নিজেদের অবশিষ্ট জীবনের প্রতি তীব্র মায়া রয়ে গেছে? নাকি ক্ষমতার অন্ধ ভক্তিতে চুর হয়ে থাকা সমাজ তাঁদের অসাড় করে দিয়েছে—সেটা এক গভীর রহস্য।

গণতন্ত্রে একাকী লড়াই ব্যর্থ হয়

চানু শর্মিলার অতীত আর সোনম ওয়াংচুকের বর্তমান আসলে এই দেশের মেরুদণ্ডহীন, সুবিধাবাদী আমজনতার গালে একটা বড় থাপ্পড়। ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো—তা সে যে রঙেরই হোক না কেন—সাধারণ মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে কোনোদিন সম্মান করেনি। সরকার একা একজন মানুষের অনশনকে পাত্তাই দেয় না; তারা শুধু অপেক্ষা করে, বিষয়টাকে এড়িয়ে যায় এবং সময়ের সাথে সাথে আন্দোলনটাকে মিলিয়ে যেতে দেয়।

যেমনটা অতীতে লাখ লাখ কৃষকের একজোট হওয়ার ফলে বিতর্কিত কৃষি আইন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়েছিল সরকার, সোনম ওয়াংচুকের এই গান্ধীবাদী অহিংস আন্দোলনও তখনই সফল হবে যখন দেশের যুবসমাজ ও আমজনতা যন্তর মন্তরে গিয়ে সশরীরে তাঁর পাশে দাঁড়াবে। ইরম চানু শর্মিলা ও সোনম ওয়াংচুকের এই লড়াই আসলে আমাদের আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়—আমরা কি কোনো লড়াকু মানুষকে কেবল 'শহীদ' বানিয়ে দূর থেকে হাততালি দেব, নাকি তাঁর কাঁধের বোঝাটা ভাগ করে নিয়ে সম্মিলিত প্রতিবাদের রাস্তা তৈরি করব?

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য