১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চায় এক যুগের অবসান

সুমিত সরকার। ছবি - Google

আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চায় এক যুগের অবসান

মূল বিষয়

ভারতীয় ইতিহাসচর্চার জগতে এক নক্ষত্রপতন। আধুনিক ভারতের ইতিহাস এবং নিম্নবর্গের মানুষের সামাজিক আন্দোলনের বিশিষ্ট গবেষক ও প্রখ্যাত মার্কসবাদী ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সুমিত সরকার প্রয়াত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট, ২০২৬) নয়াদিল্লির একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর। আগামী রবিবার (১৬ আগস্ট) তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। তাঁর প্রয়াণে শোকের ছায়া নেমে এসেছে দেশের বুদ্ধিজীবী মহল, শিক্ষাজগত ও অগণিত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে।

পরিবার ও শিক্ষাজীবন: নিজস্ব ঐতিহ্যে স্বকীয় ধারা

১৯৩৯ সালে কলকাতায় এক বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী পরিবারে সুমিত সরকারের জন্ম। তাঁর পিতা অধ্যাপক সুশোভনচন্দ্র সরকার ছিলেন আধুনিক বাংলা ও ভারতের ইতিহাসচর্চার অন্যতম কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব। তাঁর মাতুল ছিলেন খ্যাতনামা পরিসংখ্যানবিদ প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশ।

পারিবারিক ঐতিহ্যের সুবিশাল ছায়ায় না থেকে প্রথম থেকেই স্বাধীন ইতিহাস অনুসন্ধানের পথ বেছে নেন তিনি। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইতিহাসে বি.এ (অনার্স) সম্পন্ন করার পর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং পিএইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

 ইতিহাস লিখনশৈলীতে নতুন দিগন্ত ও গবেষণা

দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেছেন তিনি। এ ছাড়া তিনি অক্সফোর্ডের উলফসন কলেজের ফেলো ছিলেন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের একাধিক মর্যাদাপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

সুমিত সরকারের ইতিহাসচর্চার মূল সুর ছিল জাতীয়তাবাদী কাঠামোর ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষ, শ্রমিক, কৃষক ও সামাজিক দ্বন্দ্বের ইতিহাসকে সামনে আনা। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলির মধ্যে রয়েছে:

দ্য স্বদেশী মুভমেন্ট ইন বেঙ্গল, ১৯০৩-১৯০৮ (১৯৭৩)

মডার্ন ইন্ডিয়া (১৯৮৯)

রাইটিং সোশ্যাল হিস্ট্রি (১৯৯৮)

স্ত্রী তথা প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ তনিকা সরকারের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি সম্পাদনা করেন উইমেন অ্যান্ড সোশ্যাল রিফর্ম ইন মডার্ন ইন্ডিয়া (২০০৭) এবং কাস্ট ইন মডার্ন ইন্ডিয়া (২০১৩)।

'সাবঅলটার্ন' ধারা ও আপসহীন গণমুখী অবস্থান

আরও পড়ুন
মদ খান? রামমন্দিরে CEO-র ধর্মপরীক্ষা
দেশের কর্মক্ষেত্রে কমছে মহিলাদের অংশগ্রহণ!
আরাকুর সবুজ আর প্যারিসের মুনাফা

নিম্নবর্গের ইতিহাসচর্চার (Subaltern Studies) প্রারম্ভিক পর্বে অন্যতম প্রবক্তা হিসেবে যুক্ত থাকলেও, পরবর্তী সময়ে এই ধারার সীমাবদ্ধতা নিয়ে নির্দ্বিধায় কলম ধরেছেন তিনি। ২০০৪ সালে *'রাইটিং সোশ্যাল হিস্ট্রি'* গ্রন্থের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে 'রবীন্দ্র পুরস্কার'-এ ভূষিত করেছিল; কিন্তু ২০০৭ সালে নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে জমি অধিগ্রহণের প্রতিবাদে তিনি সেই সম্মান ফিরিয়ে দিয়ে সামাজিক ন্যায় ও গণআন্দোলনের পক্ষে অটল থাকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

স্মৃতিচারণ ও শোকবার্তা

সুমিত সরকারের প্রয়াণে রাজনীতি ও শিক্ষাজগতের বিশিষ্টজনেরা গভীর শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন:

জয়রাম রমেশ (কংগ্রেস সাংসদ):

"তিনি ছিলেন বহু শিক্ষার্থীর প্রকৃত 'গুরু', যাঁর ছিল গভীর পাণ্ডিত্য এবং চমৎকার লিখনশৈলী। তিনি ছিলেন খাঁটি অর্থে এক জনবুদ্ধিজীবী—নিজের মতাদর্শে অটল, অথচ আচরণে অত্যন্ত বিনম্রী।"

মনোজ কুমার ঝা (আরজেডি সাংসদ):

"ইতিহাসকে তিনি কোনো মৃত ঘটনার বিবরণ হিসেবে দেখেননি; বরং দ্বন্দ্ব, সংঘাত এবং সামাজিক স্তরবিন্যাসের জীবন্ত দলিল হিসেবে তুলে ধরেছেন।"

ডি. রাজা (সিপিআই সাধারণ সম্পাদক):

"আধুনিক ভারতের ইতিহাসে শ্রেণি, বর্ণ, সম্প্রদায়, লিঙ্গ ও সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাকে যুক্ত করেছিল তাঁর গবেষণা। ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র ও সামাজিক ন্যায়ের পক্ষে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয়।"

রবীশ কুমার (বরিষ্ঠ সাংবাদিক):

"তিনি কখনও কোনো দাপুটে অধ্যাপকের মতো ক্লাসে আসতেন না; বরং এক রাশ প্রশ্ন নিয়ে একজন বিনয়ী শিক্ষার্থীর মতো দাঁড়াতেন। তাঁর পাঠদানের ভঙ্গি ছিল পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ও অহিংস।"

এস. ইরফান হাবিব (ঐতিহাসিক):

"আধুনিক ভারতের অন্যতম দূরদর্শী ও সংবেদনশীল ইতিহাসবিদকে হারালাম আমরা। তাঁর রচনাগুলো সর্বকালের ক্লাসিক হয়ে থাকবে।"

সুমিত সরকারের প্রয়াণে ভারতের আধুনিক ইতিহাস গবেষণায় যে শূন্যতা তৈরি হল, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম ও সমাজবাস্তবতাকে কেন্দ্র করে ইতিহাসকে নতুনভাবে পাঠ করার যে দিশা তিনি দেখিয়ে গেছেন, তা ভবিষ্যৎ গবেষকদের চিরকাল অনুপ্রেরণা জোগাবে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য