

ট্রাফিক সিগন্যাল। ছবি - Google
২৭শে আগস্ট, ২০২৬
রাস্তায় গাড়ি চালানোর সময় তিনটি রং দেখলেই আমরা বুঝে যাই কী করতে হবে। লাল, থামুন। হলুদ, সতর্ক হোন। সবুজ, এগিয়ে যান। ভাষা আলাদা হতে পারে, দেশ আলাদা হতে পারে, রাস্তার নিয়মে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। কিন্তু এই তিন রঙের সংকেত সারা পৃথিবীর শহুরে জীবনে প্রায় একই অর্থ বহন করে। এত পরিচিত এই ব্যবস্থার পিছনে রয়েছে একশো বছরেরও বেশি পুরনো ইতিহাস। আর মজার বিষয়, ট্রাফিক সিগন্যালের এই রঙের গল্পের শুরু হয়েছিল আসলে গাড়ির রাস্তা থেকে নয়, রেলপথ থেকে।
লালকে থামার সংকেত করার পিছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, লাল রং মানুষের চোখে অত্যন্ত সহজে ধরা পড়ে। দৃশ্যমান আলোর মধ্যে লালের তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি হওয়ায় তা তুলনামূলক ভাবে কম ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দূর থেকেও লাল আলো আলাদা করে বোঝা যায়।
তার সঙ্গে জুড়ে রয়েছে মানুষের মানসিক প্রতিক্রিয়াও। বিপদ, সতর্কতা, রক্ত বা আগুন- লাল রঙের সঙ্গে এমন নানা দৃশ্যের সম্পর্ক রয়েছে। ফলে লাল দেখলে মানুষের মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই সতর্ক হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। এই কারণেই রেলপথের প্রাথমিক সংকেত ব্যবস্থাতেও লালকে ‘থামার’ নির্দেশ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে সেই ধারণাই ঢুকে পড়ে সড়ক পরিবহণে।
এখানেই ইতিহাসের মজার মোড়। আজ সবুজ মানেই ‘এগিয়ে যান’ বলে আমরা ধরে নিই। কিন্তু প্রথম দিকে সবুজের অর্থ সব সময় এমন ছিল না।
রেলওয়ের পুরনো সংকেত ব্যবস্থায় ‘এগিয়ে যাওয়ার’ জন্য সাদা আলো ব্যবহারের নজির ছিল। কিন্তু রাতের অন্ধকারে সাদা আলো নিয়ে সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। দূরের কোনও বাড়ির আলো, রাস্তার আলো বা অন্য আলোর সঙ্গে রেল সংকেত গুলিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
তাই ধীরে ধীরে সবুজকে ‘নিরাপদ ভাবে এগিয়ে যাওয়ার’ সংকেত হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়। লালের সঙ্গে সবুজের তফাতও চোখে পড়ার মতো। ফলে দুই বিপরীত নির্দেশকে আলাদা করে বোঝানো সহজ হল।
লাল মানে থামতে হবে। সবুজ মানে এগোনো যাবে। কিন্তু দুটির মাঝখানে এমন একটি সংকেত দরকার ছিল, যা চালককে বলবে, পরের মুহূর্তে পরিস্থিতি বদলাতে পারে, প্রস্তুত থাকুন। সেখানেই এল হলুদ।
হলুদ বা অ্যাম্বার আলো মূলত পরিবর্তনের সংকেত। অর্থাৎ সবুজের সময় শেষ হচ্ছে, সামনে লাল আসতে পারে, —তাই গতি কমান, সতর্ক হন এবং প্রয়োজন হলে থামার জন্য প্রস্তুত থাকুন। আধুনিক তিন রঙের ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থায় হলুদের এই ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গাড়ির সংখ্যা আজকের মতো না হলেও উনিশ শতকে শহরের রাস্তায় যানবাহন ও পথচারীদের ভিড় বাড়ছিল। সেই সময় ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য পুলিশের উপর নির্ভর করতে হত।
১৮৬৮ সালের ডিসেম্বরে লন্ডনের পার্লামেন্ট স্কোয়ারে প্রথম দিকের ট্রাফিক সিগন্যাল বসানো হয়। সেটি আজকের বৈদ্যুতিক তিন রঙের আলো ছিল না। রেলওয়ের সংকেত ব্যবস্থার আদলে তৈরি গ্যাসচালিত সিগন্যাল ব্যবহার করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল ব্যস্ত রাস্তার মোড়ে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা।
পরবর্তী কয়েক দশকে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে ট্রাফিক সিগন্যালও বদলাতে থাকে। বিদ্যুৎ এল, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এল, এবং ধীরে ধীরে তৈরি হল আজকের পরিচিত সিগন্যাল ব্যবস্থা।
১৯২০ সালে ডেট্রয়েটের পুলিশকর্মী উইলিয়াম পটস চারমুখী এবং তিন রঙের ট্রাফিক লাইট ব্যবস্থার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন । তিনি হলুদ আলোকে যুক্ত করেন পরিবর্তনের সতর্ক সংকেত হিসেবে । এর পর ধীরে ধীরে তিন রঙের সিগন্যাল বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে ।
এর ফলে রাস্তার মোড়ে দাঁড়ানো একজন চালককে আলাদা করে কোনও পুলিশকর্মীর নির্দেশের অপেক্ষা করতে হল না । দূর থেকেই তিনটি আলো বলে দিতে লাগল, কখন থামতে হবে, কখন অপেক্ষা করতে হবে এবং কখন এগিয়ে যেতে হবে।
ট্রাফিক সিগন্যালের রং বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে মানুষের চোখ কী ভাবে আলো দেখে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একটি ব্যস্ত রাস্তায় সিগন্যালকে এমন হতে হবে যাতে চালক দ্রুত সেটি শনাক্ত করতে পারেন। দিনের আলো, রাতের অন্ধকার, বৃষ্টি, কুয়াশা- বিভিন্ন পরিস্থিতিতেই রং যেন আলাদা করে বোঝা যায়। তাই লাল, হলুদ এবং সবুজের মধ্যে যথেষ্ট দৃশ্যমান পার্থক্য রাখা হয়েছে। আধুনিক সিগন্যাল ব্যবস্থায় রঙের পাশাপাশি অবস্থান, আকার, তীরচিহ্ন এবং কখনও কখনও শব্দও ব্যবহার করা হয়।
সময় বদলেছে, শহর বেড়েছে, গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। ফলে ট্রাফিক সিগন্যালও এখন অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর। কোথাও কাউন্টডাউন টাইমার, কোথাও পথচারীদের জন্য আলাদা সংকেত, কোথাও সেন্সরের মাধ্যমে গাড়ির চাপ বুঝে সিগন্যালের সময় বদলে দেওয়া হচ্ছে। তবু মূল ভাষাটি বদলায়নি।
লাল দেখলে থামতে হবে। হলুদ দেখলে সতর্ক হতে হবে। আর সবুজ দেখলে এগোনোর অনুমতি মিলবে। শতাব্দীরও বেশি সময় আগে রেলপথে যে সংকেত ব্যবস্থার বীজ তৈরি হয়েছিল, সেটিই আজ বিশ্বের ব্যস্ততম শহরগুলির রাস্তা নিয়ন্ত্রণ করছে। কলকাতার মোড় হোক বা লন্ডনের রাস্তা, দিল্লির ব্যস্ত চৌরাস্তা হোক বা নিউ ইয়র্কের ক্রসিং- তিনটি রং এখনও একই কথা বলে চলেছে। যেখানে কথা কম, নির্দেশ স্পষ্ট: লাল থামায়, হলুদ সতর্ক করে, সবুজ পথ খুলে দেয়!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
