"পাদশা বেগম" জাহানারা। ছবি: Google, গ্রাফিক্স- দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস
২৬শে মে, ২০২৬
আগ্রা ফোর্ট-এর গাঢ় লাল প্রাচীরে তখন সন্ধ্যা নামছে। যমুনার জলে সূর্যাস্তের শেষ রঙ, যেন কারও চোখে লেগে থাকা সোনালি বিষাদ। সেই আলো-আঁধারির ভিতর, রাজদরবারের অসংখ্য কণ্ঠস্বর আর ক্ষমতার পদধ্বনি ছাপিয়ে, নিঃশব্দে হেঁটে চলেছেন এক নারী। তাঁর পদচিহ্নে নেই কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষার দম্ভ, চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, রাজপ্রাসাদের সৌখিন অন্তরমহল থেকেও যিনি খুঁজে ফিরছেন এক অন্য আকাশ - জাহানারা বেগম!
মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে আমরা বারবার শুনি রাজদণ্ডের শব্দ, ষড়যন্ত্রের ফিসফাস আর রক্তাক্ত উত্তরাধিকারের লড়াই, আর এসবেরই মাঝে জাহানারা যেন এক নীরব কবিতা। খুব অল্প বয়সেই জীবনের নিরমম শোক তাঁকে স্পর্শ করে। মা মুমতাজ মহল-এর মৃত্যুর পর মাত্র সতেরো বছর বয়সে তাঁর কাঁধে এসে পড়ে সাম্রাজ্যের অন্তঃপুরের গুরুদায়িত্ব। সম্রাট শাহজাহান তাঁকে ‘পাদশাহ বেগম’-এর মর্যাদা দেওয়ার পর তাঁর চিন্তা অন্তঃপুর থেকে সরাসরি প্রবেশ করলো রাজনীতির কেন্দ্রে। তাঁর মতামত বদলে দিতে শুরু করলো দরবারের সিদ্ধান্ত। পুরুষশাসিত সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করলেন - ক্ষমতা কোনো লিঙ্গের সম্পত্তি নয়; তা প্রজ্ঞার অধিকার। ক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন সেই অদৃশ্য শক্তি - যেখানে ক্ষমতা কোনো অলংকার নয় বরং দায়িত্বের শপথ।
যে নারী রাজনীতির কেন্দ্রে, তাঁর হৃদয়ের গভীরে ছিলো এক অন্য অনুসন্ধান। জাহানারা খুঁজেছিলেন আত্মার মুক্তি! রাজদরবারের রেশমি পর্দা সরিয়ে তিনি পৌঁছন চিশতিয়া তরিকা-র নিভৃত দরবারে। সুফি সাধক মঈনুদ্দিন চিশতি-র জীবনদর্শনের স্পর্শে তিনি উপলব্ধি করেন - সাম্রাজ্যের ক্ষমতা কিংবা আড়ম্বরে নয়; প্রকৃত শান্তি লুকিয়ে থাকে - করুণা, ভালোবাসা আর আত্মসমর্পণে! এই আত্মিক বোধের মধ্যে দিয়ে তিনি লিখে ফেললেন ‘মুনিস-উল-আরওয়াহ’ - এক রাজকন্যার কলমে আত্মার বিনয়ী গান! যেখানে পরতে পরতে উন্মোচিত হয় জীবনের গভীর উপলব্ধি ও আধ্যাত্বিক চেতনার অবিস্মরণীয় যাত্রাপথ।
জাহানারা শুধু আত্মার সাধিকা নন, তিনি স্বপ্নের স্থপতি। দিল্লির ঐতিহাসিক চাঁদনি চক -এর পরিকল্পনা তাঁর মস্তিস্ক প্রসূত। তিনি জানতেন একটি নগরকে কীভাবে গড়ে তুলতে হয়, যেখানে বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও জনজীবন একসঙ্গে শ্বাস নেয়। আজও তাই চাঁদনি চক-এর ব্যস্ত আলোয় তাঁর চিন্তার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। বাজারের কোলাহল, মানুষের চলাচল আর দোকানের ঝলমলে আলো - সর্বত্র যেন লুকিয়ে আছে তাঁর নির্মাণশক্তির স্পর্শ। প্রায় চারশো বছর আগে এই ভারতীয় উপমহাদেশের বুকে পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার অলিন্দে দাঁড়িয়ে জাহানারার দৃপ্ত ঘোষণা - নারী কেবল সংসার গড়ে না, সভ্যতাও নির্মাণ করে!
জীবনের শেষ অধ্যায়ে, যখন ভাইদের ক্ষমতার লড়াইয়ে সাম্রাজ্য ক্ষতবিক্ষত, তখন জাহানারা বন্দি পিতার পাশে থেকে বেছে নিলেন ভালোবাসার কঠিন পথ। সেই সিদ্ধান্তেই তাঁর নারীত্ব যেন পূর্ণতা পায় -দুর্বলতায় নয়, বিশ্বস্ততায়। সাম্রাজ্য ভেঙেছে, সিংহাসন হারিয়েছে জৌলুস, রাজদরবারের প্রতিধ্বনি মিলিয়ে গেছে কালের অতলে। অথচ জাহানারা যেন এক অবিচল আলোর শিখা। মৃত্যুর পর তাঁর সমাধিও যেন বারবার এই একই কথা উচ্চারণ করে। নিজামুদ্দিন দরগাহ-র খোলা আকাশের নিচে সম্পূর্ণ আড়ম্বরহীন তাঁর সমাধি। যেখানে তিনি কোনো শাহজাদী নন, যেন এক গভীর অথচ সহজ জীবনের মূর্ত প্রতীক। হ্যাঁ, এটাই ছিলো তাঁর এই জীবনের শেষ ইচ্ছা। আজ যখন নারী ক্ষমতায়নের কথা উচ্চারিত হয় তখন তাঁর জীবন আমাদের পাঠ দেয় - নারীর প্রকৃত শক্তি উচ্চারণে নয়, তার অন্তর্লীন দীপ্তিতে। রাজনৈতিক ক্ষমতার দম্ভে দেশ ও সমাজ যখন শোষণের যন্ত্র হয়ে ওঠে, তাঁর কাছে আমরা নতজানু হয়ে শিখি - সত্যিকারের ক্ষমতা আত্মার স্বাধীনতায়। তাই ইতিহাস যখন রক্ত ও হিংসার গল্প বলে, জাহানারা সেখানে জাফরানের গন্ধ হয়ে ভেসে আসেন - নরম, গভীর এবং অবিনশ্বর!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
জন্ম মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জে। সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা। সময় কাটে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায়। বর্তমানে লেখালিখি, ডিজিটাল কন্টেন্ট এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে কর্মব্যস্ত।