

সোনম ওয়াংচুক। ছবি - Google.
২৭শে জুলাই, ২০২৬
নতুন দিল্লির যন্তর-মন্তরে টানা ২৬ দিনের অনশন। নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে দেশের ছাত্রসমাজের পাশে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছেন তিনি। কিন্তু অনশন ভাঙতেই শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। সরকারের সঙ্গে কি কোনও সমঝোতা হয়েছিল? কেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের উপস্থিতিতে অনশন প্রত্যাহার? শুক্রবার এক্স-এ প্রকাশিত ২২ মিনিটের ভিডিওবার্তায় সেই জল্পনাকে কার্যত উড়িয়ে দিয়ে সোনম ওয়াংচুকের প্রশ্ন, "২৬ দিন অনশন করার পরও কি আমাকে আমার সততার প্রমাণ দিতে হবে?"
এই বিতর্কের মাঝেই নতুন করে সামনে এসেছে আর একটি কৌতূহল, কে এই সোনম ওয়াংচুক? অনেকেই তাঁকে শুধু আন্দোলনের মুখ হিসেবেই চেনেন। কেউ আবার মনে করেন, 'থ্রি ইডিয়টস'-এর র্যাঞ্চো বা ফুনসুখ ওয়াংড়ুর বাস্তব অনুপ্রেরণা তিনিই। কিন্তু এই পরিচয়ের বাইরেও রয়েছে এক বিস্ময়কর অধ্যায়। তিনি এমন এক প্রকৌশলী, যিনি লাদাখের মরুভূমিতে কৃত্রিম হিমবাহ তৈরি করেছেন। এমন এক শিক্ষাবিদ, যিনি ফেল করা ছাত্রদের নিয়েই আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। আবার এমন এক পরিবেশবিদ, যাঁর উদ্ভাবন আজ ইউরোপের পাহাড়ি দেশগুলিও অনুসরণ করছে। বিজ্ঞান, শিক্ষা, পরিবেশ এবং সমাজ সংস্কার— এই চারটি ক্ষেত্রকে এক সুতোয় বেঁধে যিনি কাজ করে চলেছেন তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে।
১৯৬৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর লাদাখের আলচি ব্লকের উলেতোকপো (Uleytokpo) গ্রামের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম সোনম ওয়াংচুকের। তখন লাদাখ ছিল অবিভক্ত জম্মু-কাশ্মীরের প্রত্যন্ত অঞ্চল। স্কুল ছিল, কিন্তু মাতৃভাষায় শিক্ষা ছিল না। ছোট্ট সোনম প্রথম কয়েক বছর প্রায় কথা বলতেই পারতেন না, কারণ স্কুলের ভাষা তাঁর অজানা। পরে তিনি নিজেই বলেছেন, এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছিল— ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাস্তবতা বোঝে না। সেই বঞ্চনাই একদিন তাঁকে শিক্ষা সংস্কারের আন্দোলনের মুখ করে তুলবে, তা তখন কেউ ভাবেননি।
শ্রীনগরের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (তৎকালীন রিজিওনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ) থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করার পর বড় কর্পোরেট সংস্থায় কাজের সুযোগ ছিল। কিন্তু তিনি সেই পথ নেননি। ফিরে যান লাদাখে। কারণ তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্রকৌশল শুধু যন্ত্র বানানোর বিদ্যা নয়; মানুষের সমস্যার সমাধানই প্রকৌশলের আসল কাজ। সেই ভাবনা থেকেই ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠা করেন Students' Educational and Cultural Movement of Ladakh (SECMOL)।
SECMOL-এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল— এখানে ভর্তি হতেন মূলত সেই সব ছাত্রছাত্রী, যাঁরা সরকারি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন। মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে হাতে-কলমে বিজ্ঞান, সৌরশক্তি, কৃষি, প্রযুক্তি, নেতৃত্ব এবং বাস্তব সমস্যার সমাধান শেখানো শুরু হয়। আজ বিশ্বের নানা দেশের বিশ্ববিদ্যালয় এই মডেল নিয়ে গবেষণা করছে। এখান থেকেই পরে তৈরি হয় Himalayan Institute of Alternatives, Ladakh (HIAL)— যেখানে ডিগ্রির চেয়ে দক্ষতার উপর বেশি জোর দেওয়া হয়।
১৯৯৪ সালে তিনি শুরু করেন Operation New Hope। সরকারি স্কুলের শিক্ষক, অভিভাবক, প্রশাসন ও স্থানীয় সমাজকে একসঙ্গে এনে বদলে দেওয়া হয় শিক্ষার কাঠামো। স্থানীয় ভাষায় পাঠ্যপুস্তক, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের ফলে কয়েক বছরের মধ্যেই লাদাখের সরকারি স্কুলের ফল নাটকীয়ভাবে উন্নত হয়। ভারতের শিক্ষা সংস্কারের অন্যতম সফল উদ্যোগ হিসেবে আজও এই প্রকল্পের উল্লেখ করা হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লাদাখে বসন্তকালে ভয়াবহ জলসংকট দেখা দিচ্ছিল। প্রাকৃতিক হিমবাহের জল তখনও গলতে শুরু করেনি, অথচ কৃষকদের জমিতে জল প্রয়োজন। এই সমস্যার সমাধানে ওয়াংচুক উদ্ভাবন করেন 'আইস স্টুপা'— শঙ্কু আকৃতির কৃত্রিম হিমবাহ। শীতকালে অতিরিক্ত জলকে পাইপের মাধ্যমে উপরে তুলে বরফে পরিণত করা হয়। বসন্তে সেই বরফ ধীরে ধীরে গলে সেচের জল সরবরাহ করে। বিদ্যুৎ ছাড়াই, শুধুমাত্র মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ব্যবহার করে তৈরি এই প্রযুক্তি আজ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বিশ্বের অন্যতম সফল স্বল্পব্যয়ী উদ্ভাবন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। সুইজারল্যান্ড, নেপাল, কিরগিজস্তান-সহ একাধিক পার্বত্য অঞ্চলেও এই প্রযুক্তি অনুসরণ করা হচ্ছে।
ওয়াংচুকের গবেষণা কেবল কৃত্রিম হিমবাহে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর তৈরি সোলার-হিটেড আর্থেন বিল্ডিং, সৌরশক্তিচালিত গ্রিনহাউস, ফসিল ফুয়েল ছাড়াই চলা SECMOL ক্যাম্পাস, সৌরশক্তিভিত্তিক পাহাড়ি অবকাঠামো, এবং স্থানীয় উপকরণ দিয়ে নির্মিত শক্তি-সাশ্রয়ী ভবন আজ টেকসই উন্নয়নের আদর্শ হিসেবে বিবেচিত।
তাঁর কাজের স্বীকৃতি এসেছে দেশ-বিদেশে। উল্লেখযোগ্য সম্মানগুলির মধ্যে রয়েছে র্যামন ম্যাগসাইসাই পুরস্কার (২০১৮), Rolex Award for Enterprise (২০১৬), Global Award for Sustainable Architecture (২০১৭), International Terra Award, Ashoka Fellowship, CNN-IBN Real Heroes Award, Governor's Medal, Symbiosis-এর সাম্মানিক ডি.লিট, IIT মান্ডির Eminent Technologist of the Himalayan Region-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পুরস্কার। অনেকেই তাঁকে "এশিয়ার পরিবেশ উদ্ভাবনের মুখ" বলেও অভিহিত করেন।
আজ তিনি নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁস থেকে লাদাখের সাংবিধানিক অধিকার— একের পর এক আন্দোলনের মুখ। কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় রাজনীতির মঞ্চে নয়। তিনি এমন এক উদ্ভাবক, যিনি দেখিয়েছেন, কোটি টাকার প্রযুক্তি নয়, মানুষের সমস্যাকে বুঝে বিজ্ঞান প্রয়োগ করাই প্রকৃত উন্নয়ন। তাই অনশন, বিতর্ক বা রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বাইরে সোনম ওয়াংচুক আজও ভারতের শিক্ষা, পরিবেশ ও উদ্ভাবনের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
