

ফাইনালের দিকে তাকিয়ে মার্টিনেজ। ছবি - Google.
যে কোনো দলগত খেলায় কারোর প্রথম দলে থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলে নানা মানসিক সমস্যা থাকে। সে খেলবে কিনা, এই ভাবনা তাকে সবসময় চিন্তায় রাখে। আর যদি সেটি বিশ্বকাপের মতো মেগা মঞ্চ হয়, তা হলে সেটি আরো বড় আকার ধারণ করে।
এবার আর্জেন্টিনা দলে দুই তারকার এমন একটি সমস্যা চলেছে প্রতিক্ষেত্রে। কোচকে ভাবতে হয়েছে, কে খেলবেন – হুলিয়ান আলভারেজ না লাউতারো মার্টিনেজ? দু’জনেই একই পজিশনে খেলেন। সেই কারণে কোচ লিওনেল স্কালোনিকে কোনো ম্যাচে আলভারেজকে শুরুতে ব্যবহার করতে হয়েছে, আবার কখনো প্রথম দলে খেলেছেন লাউতারো।
গত ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল ম্যাচেও পরিবর্ত হিসেবেই নেমেছিলেন লাউতারো। কিন্তু তাঁর জয়সূচক গোলটি এই মুহূর্তে আর্জেন্টিনার সকল দেশবাসীর হৃদয়ে ‘চিরস্থায়ী টেমপ্লেট’ হয়ে রয়েছে। মাঠের দক্ষিণপ্রান্ত বরাবর ডানপায়ে নিখুঁত সেন্টার লিও মেসির, আর ম্যাজিক ওই সেন্টারে দুরন্ত হেডে মার্টিনেজ বল জালে জড়িয়ে দিতেই ইতিহাস। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে হেরে কোনোদিন বিদায় নেয়নি আর্জেন্টিনা। এবারও মারাদোনার দেশ সেই রেকর্ড অব্যাহত রেখেছে।
আর যারজন্য এই নজির অক্ষত রয়েছে, তিনি তো আর্জেন্টিনার অঘোষিত ‘মালিক’, লিওনেল মেসি। অন্যজন অবশ্যই মার্টিনেজ। তিনি যদি সেদিন সাত মিনিটের মধ্যে শেষ গোলটি ইনজুরি টাইমে না করতেন, খেলা যেত অতিরিক্ত সময়ে, সেখানেও খেলার ফল নিস্ফলা থাকলে গড়াত টাইব্রেকারে।
খেলা শেষে দেখা গিয়েছে আবেগবিহ্বল মার্টিনেজ। তাঁকে প্রকাশ্যেই চোখের জল ফেলতে দেখা গিয়েছে। তাঁর ক্ষেত্রেও গোল্ডেন কামব্যাক। সেদিনও তিনি পরিবর্ত হিসেবে মাঠে নেমে নায়ক বনে গিয়েছেন। যিনি আবেগতাড়িত হয়ে সেদিন সাংবাদিকদের শুনিয়েছেন বাবা-মার কথা। বাবাই তাঁর প্রথম ফুটবলের শিক্ষাগুরু। খুদে ফুটবলার থাকার সময় একটা টুর্নামেন্টে সেরা হওয়ার পরে বাবাই মার্টিনেজকে প্রথম বুট কিনে দেন।
আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্সের বন্দরনগরী বাইয়া ব্লাংকায় লাউতারোর জন্ম। বাবাই তাঁকে হাতে ধরে প্রথম ফুটবল মাঠে নিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর দুই ভাইও খেলাতেই রয়েছেন, একজন ফুটবল খেলেন, অন্যজন বাস্কেটবলে। তিনিও যেতেন বাস্কেটবলে, কিন্তু একদিন কোচের বকুনিতে তাঁর মোহভঙ্গ ঘটে, আর যাননি কোর্টে, চলে গেলেন ফুটবলে, সেটাই রয়ে গেল তাঁর মহাতারকার গল্প লেখার অধ্যায় হিসেবে।
রেসিং ক্লাবে যোগ দিতে বাড়ি ছেড়ে দিতে হয়েছিল। তবুও তাঁর মা মেজো ছেলের জন্য পরম মমতায় বিছানা গুছোতেন প্রতিদিন। সেদিন গোল করার পরে মিক্সড জোনে এসে সেই কথাই বলেছেন স্কালোনির বড় ভরসা। যিনি রেসিং ক্লাব ছেড়ে ইতালির ইন্টার মিলানে চলে যান। সেখানে যেতেই মার্টিনেজের কপাল খোলে। তিনি সিরি এ লিগে তিনবার সর্বোচ্চ গোলদাতা হন।
বিশ্বকাপে জাতীয় দলের হয়ে গতবারের শুরুটা তাঁর কাছে ছিল দুঃস্বপ্নের মতোই। প্রথম ম্যাচে সৌদির কাছে হারের পরে তিনি প্রথম একাদশ থেকে ছিটকে যান। লাউতারোর স্থানে খেলার সুযোগ পান আলভারেজ। তিনিই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দলে ছিলেন। তাই লাউতারোর দুঃখও ছিল ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে দলের জন্য তিনি নিজের অবদান রাখতে পারেননি বলে।
এবার সেটি পুষিয়ে দিলেন দলকে ফাইনালে তুলে। এমনকী গত কোপা আমেরিকা থেকেই প্রত্যাবর্তনের অভিযান শুরু হয়ে গিয়েছিল। এবার সুইসদের বিপক্ষে ও ব্রিটিশ বধে বড় ভূমিকা রাখার পরে মেসিদের দলের অন্যতম তারকা মনে করছেন, তাঁর নাটকীয় গল্পের শেষটা তিনি করতে চান রবিবার বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করেই। তাই বলতেই হয়, এই মেগা আসর যে কত তারকার স্বপ্ন গড়ার ও ভাঙার গল্প লেখে, তার ইয়ত্তা নেই।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
