

স্পেনের ভরসা রদ্রি। ছবি - Google.
১৬ই জুলাই, ২০২৬
সেই এক গল্প। পরিবারের সবাই চায় ছেলে পড়াশুনো করে ডাক্তার হবে, আর ছেলের মন অন্যদিকে। সে হতে চায় ফুটবলার। স্পেনের অধিনায়ক রডরিগো হার্নান্দেজের গল্পটাও একইরকম।
এই নামে অবশ্য ফুটবল দুনিয়া তাঁকে চেনে না, চেনে রদ্রি নামে। তিনি স্প্যানিশ আর্মাডার ড্রাইভার। ডাগআউটে বসে কোচ দে লা ফুয়েন্তের হাতে যে রিমোট কন্ট্রোল থাকে, সেটিকে ঠিকভাবে মাঠে পরিচালনার দায়িত্বে ওই রদ্রি।
বাবা চেয়েছিলেন ছেলে আমেরিকায় উচ্চশিক্ষা নিয়ে ডাক্তার হোক। ছেলে সেই আমেরিকাতেই গেল, কিন্তু ডাক্তারি পড়তে নয়, ফুটবলার হতে! আর জীবনের কী অদ্ভুত লিখন, আমেরিকার বুকে স্পেনকে আরও একবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন এই দুরন্ত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। যাঁকে স্পেন দলের ‘শক অ্যাবজরবার’ বলা হচ্ছে। যে কোনো গাড়ি কিংবা মেশিনের যাতে বাড়তি ঝাঁকুনি না হয়, তারজন্য এই যন্ত্র বসানো হয়ে থাকে। স্পেন দলের রদ্রির ভূমিকা অনেকটা এমনই।
তিনি দলের রক্ষণ থেকে মাঝমাঠের নিউক্লিয়াস, প্রাণভোমরা বলতে যা বোঝায়, সেটাই। ফ্রান্সের বিপক্ষে মঙ্গলবার সেমিফাইনাল ম্যাচটাই যেমন। আইমেরিক লাপোর্ত, পাউ কুবারসিকে নিয়ে স্প্যানিশ বক্সের সামনে যেন ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গল’ গড়েছিলেন রদ্রি। এমবাপ্পে-ওলিসে-দেম্বেলেদের ওই ভয়ঙ্কর ত্রিফলাকে ভোঁতা করার কাজটি করছিলেন রদ্রিই। ম্যাচে বেশিরভাগ দ্বৈরথই তিনি জিতেছেন।
আরো অবাক করা বিষয়, ফ্রান্সের আক্রমণকে রোখার ক্ষেত্রে রদ্রি যেভাবে বল কেড়েছেন, তাতে তাঁকেই বেশিবার ফাউল করেছেন ফরাসী ডিফেন্ডাররা। হওয়ার কথা ছিল একেবারে বিপরীত। এবারের বিশ্বকাপে এটাই বেশিবার দেখা গিয়েছে রদ্রির ক্ষেত্রে। সাতটি ম্যাচে গোল হওয়ার মতো পাস দিয়েছেন ৯টি, সফল পাসের হার ৯৪ শতাংশ, যেহেতু মাঝমাঠেরও একটু নিচে খেলেন, তাই দূরপাল্লার পাসই তাঁকে দিতে হয় বেশি। তিনি দূরপাল্লার পাসের জন্য বিখ্যাত, একেবারে গোলের ঠিকানা লেখা পাস দিয়েছেন ৭৯ শতাংশ।
আমেরিকার কানেটিকাটে ফুটবল কোচিং ক্যাম্পে ভর্তি হওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল ১৬। ওই ক্যাম্পে কোনো টিভি ছিল না। একটি কম্পিউটার জোগাড় করে ২০১০ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখেছিলেন রদ্রিদের কয়েকজন। সেই ম্যাচে দেখেছিলেন জাভি, ইনিয়েস্তাদের। তখনই স্বপ্ন ছিল, একদিন দেশের হয়ে কাপ জিতে দেখাবেন। সেই স্বপ্ন সত্যি হতে তাঁদের একটা মাত্র স্টেশন পেরোতে হবে।
২২ মাস আগে এই রদ্রিই মারাত্মক এসিএল চোটে পড়ে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে ছিলেন। সেই চোটের আগে ২০২২-২৩ মরশুমে ম্যান সিটির ‘ট্রেবল’ জয়ে এবং তারপর ইংলিশ ও ইউরোপীয় ফুটবলে সিটির আধিপত্যের মূল কারিগর ছিলেন রদ্রি। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত সিটির হয়ে অপরাজিত ছিলেন টানা ৭৪টি ম্যাচ। এবারের বিশ্বকাপ যেন সেই রদ্রিকেই ফিরিয়ে এনেছে। তিনি ভালো খেলা মানে স্প্যানিশ দলের ঝাঁঝ বেড়ে যাওয়া। তিনি রক্ষণের পাশাপাশি সমানভাবে আক্রমণেও সহায়তা করছেন। যিনি মনে করছেন, ‘‘কাপ জিততে হলে আমাদের আরো শান্ত থাকতে হবে, নিজেদের লক্ষ্যে অবিচল থাকতে হবে।’’
ফুটবল বিশ্লেষকরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচে মোট ১২কিমি পথ দৌড়েছেন রদ্রি। এই ছোট্ট তথ্যটুকুতেই পরিষ্কার তিনি দলের প্রধান চালিকাশক্তি। একটা সময় বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কোর্স করেছিলেন বিত্তশালী পরিবারের এই সন্তান। কিন্তু জীবন কাকে কোনদিকে নিয়ে যায়, সেটা তো অন্যজন লেখে, তাই রদ্রির জীবনের চিত্রনাট্য যিনিই লিখুন না কেন, একেবারে সঠিক লিখেছেন!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
