

তদন্তে উঠল প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ ও আরও প্রশ্ন। গ্রাফিক্স - শুভ্র শর্ভিন, দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
২৬শে জুন, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
একটি খুনের তদন্তে সাধারণত আলোচনার কেন্দ্রে থাকেন অভিযুক্ত। কিন্তু আরজি কর-কাণ্ডে তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই আরেকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে— অপরাধের পর কী হয়েছিল? তদন্তকারীদের মতে, কোনও অপরাধের বিচার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ অপরাধের পর প্রমাণ সংরক্ষণ এবং তদন্তের প্রথম কয়েক ঘণ্টার ভূমিকা। আর সেই সূত্র ধরেই তদন্তের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসেন দুই ব্যক্তি— আরজি করের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ এবং টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মণ্ডল।
সঞ্জয় রায়ের গ্রেফতারির পর অনেকেই মনে করেছিলেন, তদন্তের মূল দিকটি স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সিবিআই তদন্ত যত এগোতে থাকে, ততই গুরুত্ব পেতে শুরু করে ঘটনার পরবর্তী সময়। তদন্তকারীদের মতে, ৯ অগস্ট সকালে দেহ উদ্ধারের পর থেকে পরবর্তী কয়েক ঘণ্টা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের প্রতিটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ, প্রতিটি সিদ্ধান্ত এবং প্রতিটি যোগাযোগ নতুন করে খতিয়ে দেখা শুরু হয়। সেখানেই উঠে আসে একাধিক অসঙ্গতির অভিযোগ।
আরজি কর-কাণ্ডের পর থেকেই আন্দোলনকারীদের ক্ষোভের বড় অংশ গিয়ে পড়েছিল তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের উপর। প্রথম দিকে হাসপাতাল প্রশাসনের বক্তব্য নিয়ে বিভ্রান্তি, পরিবারের অসন্তোষ এবং চিকিৎসকদের অভিযোগ— সব মিলিয়ে তাঁকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।
সিবিআই তদন্তে সেই বিতর্ক আরও গুরুত্ব পায়। তদন্তকারীরা জানতে চান, ঘটনার পর হাসপাতাল প্রশাসন কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল এবং কোন তথ্য কখন প্রকাশ্যে আনা হয়েছিল। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর সন্দীপ ঘোষের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত আরও গভীর হয়।
শুধু হাসপাতাল প্রশাসন নয়, পুলিশের প্রাথমিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। ঘটনাস্থল সুরক্ষিত রাখা, প্রমাণ সংগ্রহ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে যোগাযোগ— তদন্তের প্রথম ধাপের প্রতিটি বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। এই প্রেক্ষাপটে টালা থানার তৎকালীন ওসি অভিজিৎ মণ্ডলের ভূমিকাও সিবিআইয়ের নজরে আসে। তদন্তকারীদের সন্দেহ ছিল, কিছু ক্ষেত্রে গাফিলতি বা অসঙ্গতি ঘটেছে, যার ফলে তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত হতে পারে।
দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর সিবিআই সন্দীপ ঘোষ এবং অভিজিৎ মণ্ডলকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ ছিল, তদন্তের স্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করা হয়েছে এবং প্রমাণ নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। এই গ্রেফতারি গোটা মামলাকে নতুন মোড় দেয়। কারণ, এতদিন আলোচনার কেন্দ্রে ছিলেন মূল অভিযুক্ত সঞ্জয় রায়। কিন্তু এবার প্রশ্ন উঠতে শুরু করে প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়েও।
সন্দীপ ঘোষ এবং অভিজিৎ মণ্ডল দু’জনেই নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, তাঁরা আইন মেনেই কাজ করেছেন এবং তদন্তে সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের দাবি, জনচাপ এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে সিবিআই নিজেদের অবস্থানে অনড় ছিল। ফলে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি জনআলোচনাও আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
এই গ্রেফতারির পর আরজি কর-কাণ্ডে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যায়। মানুষের একাংশের কাছে প্রশ্ন আর শুধু অপরাধীকে ঘিরে থাকেনি। প্রশ্ন উঠতে থাকে, একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানে এমন ঘটনার পরে প্রশাসন কীভাবে কাজ করেছে? প্রথম কয়েক ঘণ্টার সিদ্ধান্তগুলি কি যথাযথ ছিল? কোনও তথ্য চাপা পড়েছিল কি? কোনও গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হারিয়ে গিয়েছিল কি? এই প্রশ্নগুলিই জনমনে নতুন আলোচনার জন্ম দেয়।
এই সময়েই আরজি কর হাসপাতালকে ঘিরে আরও একটি তদন্ত শুরু হয়। হাসপাতালের আর্থিক লেনদেন, বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং টেন্ডার সংক্রান্ত কিছু অভিযোগ খতিয়ে দেখতে শুরু করে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলি। যদিও এই তদন্ত সরাসরি তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যুর মামলার অংশ ছিল না, তবুও জনমনে দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে জুড়ে যেতে শুরু করে। ফলে সন্দীপ ঘোষকে ঘিরে বিতর্ক আরও বাড়ে।
আরজি কর-কাণ্ড তখন রাজ্যের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ইস্যু। তৎকালীন বিরোধী দলগুলির অভিযোগ ছিল, এই ঘটনা কোনও বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা। তৎকালীন শাসক শিবির (তৃণমূল কংগ্রেস) পাল্টা দাবি করে, তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই রাজনৈতিক ফায়দা তোলার চেষ্টা হচ্ছে। ফলে আদালত, তদন্ত এবং রাজনীতি— তিনটি সমান্তরাল স্রোত তৈরি হয়।
এই সময়েও নিহত চিকিৎসকের পরিবার বারবার একই কথা বলে আসছিলেন— তাঁদের বিশ্বাস, পুরো সত্য এখনও সামনে আসেনি। তাঁদের বক্তব্য ছিল, তদন্ত এগোলেও কিছু প্রশ্নের উত্তর তাঁরা এখনও পাননি। এই অবস্থান জনমতের একটি বড় অংশের মধ্যেও প্রতিফলিত হচ্ছিল। কারণ, আরজি কর তখন শুধু একটি মামলা নয়; এটি হয়ে উঠেছে সত্য অনুসন্ধানের প্রতীক।
চার্জশিটের পথে তদন্ত এদিকে সিবিআই ধীরে ধীরে চার্জশিট তৈরির প্রস্তুতি শুরু করে। ফরেন্সিক রিপোর্ট, ডিজিটাল তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান— সব মিলিয়ে তদন্তকারীরা একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর দাবি করেন। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তই পরবর্তী সময়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়৷
(চলবে)
চার্জশিট, আদালতের কাঠগড়া এবং এক নামকে ঘিরে সমস্ত বিতর্ক, বিচারপর্ব
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
