২৯শে জুলাই, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

‘নেকেড ওয়েডিং’: ভারতীয় বিয়েতে এক নতুন ট্রেন্ড

‘নেকেড ওয়েডিং’: ভারতীয় বিয়েতে এক নতুন ট্রেন্ড

লোকদেখানো জাঁকজমক সরিয়ে ভালোবাসা উদযাপনই 'নেকেড ওয়েডিং'। ছবি - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।

‘নেকেড ওয়েডিং’: ভারতীয় বিয়েতে এক নতুন ট্রেন্ড

লোকদেখানো জাঁকজমক সরিয়ে ভালোবাসা উদযাপন

বিয়ে মানেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে এক এলাহী কাণ্ড। মাইলের পর মাইল জুড়ে আলোর রোশনাই, ডিজাইনার লেহেঙ্গা বা বেনারসি, এলাহী ভোজের আয়োজন, আর চেনা-অচেনা শত শত অতিথির কোলাহল। মাসের পর মাস ধরে চলা ক্লান্তিহীন পরিকল্পনা আর বিপুল  টাকার বাজেট যেন ভারতীয় বিয়ের এক অলিখিত নিয়ম। কিন্তু এই চেনা অভ্যাসের ভিড়ে, ইদানীং ইন্টারনেটের দুনিয়ায় একটা একেবারে ভিন্নধর্মী আলোচনা সবার নজর কাড়ছে। আর তা হল— "নেকেড ওয়েডিং" (Naked Wedding) বা "অনাবৃত বিয়ে"।

নামটা শুনে হয়তো অনেকেই চমকে উঠতে পারেন, তবে এর সাথে পোশাক-আশাকের কোনো সম্পর্ক নেই। এর আসল উদ্দেশ্য হল বিয়ের ওপর থেকে বাহুল্যের সমস্ত বাড়তি স্তর বা 'আবরণ' সরিয়ে ফেলে জীবনের অন্যতম পবিত্র এই বন্ধনটির মূল নির্যাসকে উদযাপন করা। যেখানে জাঁকজমকের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় দুটি মানুষের পারস্পরিক অঙ্গীকার ও ভালোবাসা।

মহামারীর দিনগুলো এবং একটি নতুন ট্রেন্ডের জন্ম

এই ধারণার শুরুটা কিন্তু খুব বেশিদিন আগের নয়। ২০২০ সালে মহামারীর সময়ে 'ম্যারেজ উইক ইউকে' (Marriage Week UK) প্রথম এই শব্দবন্ধটি জনপ্রিয় করে তোলে। সেই লকডাউনের দিনগুলোতে যখন সমস্ত বড় আয়োজন থমকে গিয়েছিল, তখন বাধ্য হয়েই মানুষকে উৎসবের বহিরঙ্গ ছেঁটে ফেলতে হয়েছিল। অপ্রয়োজনীয় খরচ, সামাজিক চাপ আর পারফরম্যান্সের পাহাড় সরিয়ে রেখে বিয়েকে তার আদি ও অকৃত্রিম রূপে ফিরিয়ে আনার নামই হল 'নেকেড ওয়েডিং'।

ব্রিটিশ খ্রিস্টান পত্রিকা 'প্রিমিয়ার ক্রিশ্চিয়ানিটি'-তে প্রকাশিত একটি গল্পে দেখা যায়, এক দম্পতি প্রায় ৩০০ অতিথির এক জাঁকজমকপূর্ণ বিয়ের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু কোভিড বিধিনিষেধের কারণে শেষ পর্যন্ত অতি সাধারণ এক আয়োজনে তারা চার হাত এক করেন। পরে তারা অকপটে স্বীকার করেছিলেন, এই ছোট ও ছিমছাম বিয়েটি তাদের প্রত্যাশার চেয়েও অনেক বেশি মধুর, আন্তরিক এবং অর্থবহ ছিল। কারণ, সেখানে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল কেবলই আপনজনদের খাঁটি ভালোবাসা।

একটি অনাবৃত বিয়ের ক্যানভাসে যা থাকে

এই বিয়ের কোনো নির্দিষ্ট বাঁধাধরা নিয়ম নেই। কোনো দম্পতি হয়তো আইনি ম্যারেজ রেজিস্ট্রি করেই খুশি, কেউ বা আবার নিজের বাড়ির চেনা ছাদেই সানাই বাজাতে ভালোবাসেন। অনেকে আবার শুধু পরিবারের চার-পাঁচজন মানুষকে নিয়ে ছোট কোনো মন্দিরে গিয়ে মালাবদল করেন। আয়োজন যেমনই হোক না কেন, মূল ফোকাসটা থাকে কেবলই সেই দুটি মানুষের ওপর, চারপাশের জাঁকজমকপূর্ণ 'প্রোডাকশন'-এর ওপর নয়।

সাধারণত এই ধরণের বিয়েতে যা দেখা যায়

সীমিত অতিথি তালিকা: কেবল পরিবারের সদস্য এবং সবচেয়ে কাছের বন্ধুদের উপস্থিতি।
পুনর্ব্যবহারযোগ্য পোশাক: ভারী ডিজাইনার পোশাকের বদলে সাধারণ কিংবা মায়ের পুরনো ঐতিহ্যবাহী শাড়ি-পাঞ্জাবি।
ছোট বা চেনা ভেন্যু: নিজের বাড়ি, কোনো ছোট বাগান বা ঘরোয়া ক্যাফে।
মিনিমালিস্ট ডেকোরেশন: কৃত্রিম আলোর বন্যা বা থিম ডেকোরেশনের বদলে সাধারণ ফুল ও মোমবাতির ছোঁয়া।
অর্থের সঠিক ব্যবহার: লোকদেখানো খাতে বিপুল খরচ না করে সেই অর্থ ভবিষ্যতের সঞ্চয় বা নিজেদের কোনো স্বপ্নপূরণে রাখা।

ছিমছাম আভিজাত্য

আমরা সাধারণত সেলিব্রিটিদের বিয়ে মানেই এক রূপকথার মতো রাজকীয় আয়োজন দেখতে অভ্যস্ত। কিন্তু ভারতের বেশ কয়েকজন তারকাও এই ইঁদুরদৌড় থেকে বেরিয়ে এসে এক অনন্য নজির গড়েছেন। ২০২১ সালে অভিনেত্রী দিয়া মির্জা যখন ব্যবসায়ী বৈভব রেখিকে বিয়ে করলেন, তখন কোনো বিলাসবহুল রিসোর্ট নয়, বেছে নিয়েছিলেন নিজের মুম্বাইয়ের বাড়ির ছিমছাম পরিবেশ। চেনা কিছু মানুষের উপস্থিতিতে সেই বিয়েতে যেমন ছিল না কোনো জাঁকজমক, তেমনই তিনি বাদ দিয়েছিলেন 'কন্যাদান' বা 'বিদাই'-এর মতো সনাতনী কিছু প্রথা, যা তাঁর ব্যক্তিগত ভাবনার সাথে মিলত না।

একইভাবে অতি সম্প্রতি সোনাক্ষী সিনহা এবং জহির ইকবালের বিয়েও এক বড় দৃষ্টান্ত। নিজেদের ফ্ল্যাটে অত্যন্ত সাধারণ একটি আইনি সই-সাবুদের মাধ্যমে তাঁরা এক হন। সোনাক্ষীর পরনে ছিল তাঁর মা পুনম সিনহার বহু পুরনো আইভরি রঙের হেরিটেজ শাড়ি। বিয়ের পর এই দম্পতি জানিয়েছিলেন, তাঁরা তাঁদের জীবনের এই বিশেষ দিনটিকে কোনো রাজকীয় প্রদর্শনী বানাতে চাননি, চেয়েছিলেন কেবল 'সহজ, সরল ও আবেগঘন' রাখতে। এই বিয়েগুলো হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থে পুরোপুরি 'নেকেড ওয়েডিং' নয়, কিন্তু এর অন্তরালে লুকিয়ে থাকা দর্শনটা ছিল একেবারেই এক— প্রদর্শনীর চেয়ে সম্পর্কের গভীরতাই আসল।

বদলানো মানসিকতা ও নতুন প্রজন্মের অগ্রাধিকার

বর্তমান সময়ে এই রূপান্তরের পেছনে কাজ করছে তরুণ প্রজন্মের চিন্তাভাবনার এক বিশাল পরিবর্তন। আজ একটিভারতীয় বিয়েতে লাখ লাখ বা কোটি কোটি টাকা খরচ হওয়া খুব সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আজকের যুগের ছেলেমেয়েরা প্রশ্ন তুলছেন— মাত্র কয়েক ঘণ্টার এই দেখানোর জন্য এত বড় অঙ্কের টাকা খরচ করা কি সত্যিই বুদ্ধিমানের কাজ? তার চেয়ে সেই টাকা দিয়ে নিজের একটা ফ্ল্যাট কেনা, বিশ্বের কোনো অচেনা দেশে ঘুরতে যাওয়া, কিংবা ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত।

সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে যখন প্রতিদিন নিখুঁত ও কিউরেটেড বিয়ের ছবি আমাদের স্ক্রিনে ভেসে ওঠে, তখন একদল মানুষ এই কৃত্রিমতার ক্লান্তি থেকে মুক্তি খুঁজছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন যে, বিয়ের আসল আনন্দ লোকদেখানো আতিশয্যে নেই, আছে ভালোবাসার মানুষটির হাত ধরার শান্তিতে। মহামারী আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে অল্পতেও জীবনকে সুন্দরভাবে গুছিয়ে নেওয়া যায়, আর সেই শিক্ষাটাই এখন বিয়ের মণ্ডপে প্রতিফলিত হচ্ছে।

'নেকেড ওয়েডিং' কোনো উৎসবকে ম্লান করার কথা বলে না, বরং তা বলে সচেতনভাবে বাঁচার কথা। জাঁকজমকের স্রোতে ভেসে না গিয়ে, নিজের মনকে চিনে, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তটিকে নিজের মতো করে আগলে রাখার এক সাহসী ও সুন্দর প্রয়াস এটি।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য