

সতীদাহের চিতা থেকে ভবিষ্যতের স্ত্রী'কে জব চার্নকের উদ্ধারের প্রতীকী ছবি - AI
১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সময়টা সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগ। নদীর ঘাটের একপাশে দাউদাউ করে জ্বলছে চিতার আগুন। চারপাশের পরিবেশ রীতিমতো থমথমে। তারই মধ্যে ধর্মীয় প্রথা মেনে ১৫ বছরের এক সদ্য বিধবা রমণীকে জোর করে সেই আগুনে ঠেলে দেওয়ার সব আয়োজন প্রায় সম্পন্ন। বাতাসে ভাসছে পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণ। তারই ফাঁকে ফাঁকে ভেসে আসছে চাপা কান্নার আওয়াজ। ঠিক এমন সময় সেখানে এসে হাজির হলেন এক ব্রিটিশ সাহেব। সঙ্গে একদল সশস্ত্র রক্ষী। সাহেবের এক হুঙ্কারে বদলে গেল গোটা পরিস্থিতি। সতীদাহ হতে চলা সেই ১৫ বছরের রমণীকে উদ্ধার করার নির্দেশ দিলেন তিনি।
সশস্ত্র গোরা রক্ষীদের দাপটে পুরোহিত ও মৃতের আত্মীয়রা নিমেষে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল। সাহেব প্রায় জোর করেই তরুণীকে নিজের নৌকায় তুলে নিলেন। এভাবেই শুরু হল এক নতুন ইতিহাস।
সেদিনের সেই ব্রিটিশ সাহেবটি ছিলেন কলকাতায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রাথমিক ভিত মজবুত করার মূল কাণ্ডারী জব চার্নক। এটা ১৬৭৮ বা ১৬৭৯ সালের ঘটনা। চার্নক তখন পাটনায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠির দায়িত্বে। স্কটিশ পর্যটক ক্যাপ্টেন আলেকজান্ডার হ্যামিলটনের লেখা একটি বইতে এই ঘটনার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায়। বইটির নাম ‘অ্যা নিউ অ্যাকাউন্ট অফ দ্য ইস্ট ইন্ডিজ’।
হ্যামিলটন লিখেছিলেন, নদীর ঘাটের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ১৫ বছরের ওই তরুণীর অসামান্য রূপে মুগ্ধ হয়ে এবং জোর করে তাকে সতীদাহ করা ঠেকাতে জব চার্নক দুঃসাহসিক কাজটি করেছিলেন।
রক্ষণশীল হিন্দু সমাজ এই ঘটনাকে চরম কলঙ্ক হিসেবে দেখেছিল। কারণ চিতা থেকে ফিরে আসা বিধবার সমাজে তখন কোনও জায়গা ছিল না। তাই চার্নক তাঁকে নিজের কাছেই রেখে দেন। সম্ভবত তিনি ওই বাঙালি তরুণীর প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। পরে তাঁকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করেন। তাঁর ওই পুরোনো নাম জানা যায় না। তবে দীক্ষিত হওয়ার পর নতুন নাম হয় মারিয়া। অনেকেই অবশ্য তাঁকে অ্যাঞ্জেলা বলেও উল্লেখ করেন।
জব চার্নকের এই পদক্ষেপ কেবলই নিখাদ প্রেমের কাহিনী ছিল, নাকি এটা নিছকই এক শ্বেতাঙ্গের ক্ষমতার আস্ফালন ছিল? ইতিহাসবিদদের মধ্যে এই নিয়ে বিস্তর তর্ক রয়েছে। হ্যামিলটন ব্যক্তিগতভাবে চার্নককে একেবারেই পছন্দ করতেন না। তাই আধুনিক অনেক ঐতিহাসিকের মতে, তিনি হয়ত ঘটনাটিতে কিছুটা রং চড়িয়ে লিখেছিলেন।
তর্ক বা বিতর্ক যাই থাকুক, একটি সত্য এখানে জলের মতো পরিষ্কার। চার্নক সেই দেশীয় রমণীকে নিছক রক্ষিতা হিসেবে রাখেননি। তিনি তাঁকে আজীবন স্ত্রীর পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে ভালোবেসে আগলে রেখেছিলেন। তাঁদের সংসার জীবন ছিল অত্যন্ত বর্ণময়।
যদিও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তারা চার্নকের এই আচরণ একেবারেই মেনে নিতে পারেননি। ব্রিটিশ আভিজাত্যের চোখে এক নেটিভ নারীকে স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়াটা ছিল রীতিমতো অপরাধ।
কিন্তু চার্নক কোনও কিছুরই তোয়াক্কা করেননি। বরং স্ত্রীর প্রভাবে তিনি নিজেই ক্রমশ ভারতীয় জীবনধারায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। ব্রিটিশ পোশাক ছেড়ে গায়ে দিতে শুরু করেন ফতুয়া ও পাজামা। দেশীয় খাবার তাঁর রোজকার অভ্যাস হয়ে দাঁড়াল। এমনকি হুক্কা ছাড়া তাঁর জুত হত না।
তাঁদের দাম্পত্য জীবন ছিল গভীর ভালোবাসায় মোড়া। মারিয়া ও চার্নকের এক পুত্র এবং তিন কন্যা জন্মায়। দুর্ভাগ্যবশত পুত্রটি খুব অল্প বয়সেই মারা যায়। তবে তিন মেয়ে মেরি, এলিজাবেথ ও ক্যাথরিনকে চার্নক অত্যন্ত যত্নে বড় করেছিলেন। পরবর্তীকালে কলকাতার সম্ভ্রান্ত ব্রিটিশ অফিসারদের সঙ্গেই তাঁদের বিয়ে হয়। বড় মেয়ে মেরির সঙ্গে কলকাতার প্রথম প্রেসিডেন্ট স্যার চার্লস আয়ারের বিয়ে হয়েছিল। জব চার্নকের উইলেও তাঁর এই সন্তানদের স্পষ্ট উল্লেখ ও উত্তরাধিকারের স্বীকৃতি পাওয়া যায়।
১৬৯০ সালে যখন চার্নককে পাকাপাকিভাবে কলকাতা চলে আসতে হল, মারিয়া তখন চার্নকের নিত্যদিনের ছায়াসঙ্গী। কিন্তু নতুন শহরের স্যাঁতসেঁতে অস্বাস্থ্যকর আবহাওয়া তাঁর একেবারেই সহ্য হয়নি। অসুস্থ হয়ে পড়ে ১৬৯২ সালের শুরুর দিকে প্রয়াত হন মারিয়া।
প্রিয় স্ত্রীর অকাল মৃত্যুতে জব চার্নক দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন। স্ত্রীর শোকে তিনি এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন যে মাত্র এক বছর পর ১৬৯৩ সালে তিনিও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
আজও কলকাতার বিবাদী বাগের কাছে সেন্ট জনস চার্চের গোরস্থানে গেলে চার্নকের সমাধিসৌধ চোখে পড়ে। ইতিহাস যাকে চেনে চার্নক মাউসোলিয়াম নামে। এখানেই পাশাপাশি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন চার্নক ও তাঁর প্রাণপ্রিয় মারিয়া।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
