

আর্জেন্টিনা দলের চালিকাশক্তি মাতিয়াস। ছবি : Google
৩রা জুলাই, ২০২৬
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস Exclusive
কোচিং শুরুর আগে আর্জেন্টিনার অখ্যাত এক ব্লগারের সাথে দেখা করেছিলেন বিশ্বের বিখ্যাত কোচ পেপ গার্দিওলা। ২০০৬ সালে বুয়েনস আয়ার্সে দুজনের দেখা হয়। গার্দিওলা বলেছিলেন, 'এক কাপ কফি খাওয়া যেতেই পারে।' সেটাই পরে রূপ নিয়েছিল ৩ ঘণ্টার আড্ডায়। দুজনের ফুটবল নিয়ে আলোচনায় অনেক কিছুর হদিশ মিলেছিল, যা পরে দেখা গিয়েছিল বার্সেলোনার ফুটবল কৌশলে।
কখনোই কোনো পর্যায়ে পেশাদার ফুটবল না খেলা মাতিয়াস মান্নাই এই মুহূর্তে আর্জেন্টিনার কম্পিউটার-ব্রেন। লিওনেল স্কালোনির কোচিং স্টাফ টিমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক সদস্য। সেভাবে তিনি কোনোদিন আলোচনায় আসেন না। নিজেও ভালোবাসেন আড়ালে থাকতে।
২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে চ্যাম্পিয়নের মেডেল পরা সবচেয়ে অচেনা যে মানুষটাকে আমরা দেখেছিলাম পোডিয়ামে, তিনিই মান্না। তাঁর গার্দিওলার ফ্যান হওয়ার গল্পটাও অদ্ভুত। ছোটবেলায় পরিবারের সাথে বেড়াতে এসেছিলেন মাদ্রিদে। রিয়ালের কোনো খেলোয়াড় নয়, ওই শহর থেকে তার জন্য কেনা হয়েছিল বার্সা মিডফিল্ডার গার্দিওলার জার্সি!
ছোটবেলা থেকে জার্সিটা সাথে ছিল বলেই বড় হয়েও মান্না গার্দিওলার খেলা অনুসরণ করতে থাকেন। পেপ তখন খেলোয়াড় হিসেবে ক্যারিয়ারের শেষের দিকে। ২০০৫ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকার সময়েই তিনি ব্লগ লেখা শুরু করেন। নাম দেন 'প্যারাডিগমা গার্দিওলা'।
সে সময় ইউরো চ্যাম্পিয়ন ছিল গ্রিস, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হলো ইতালি। দুই দলই শরীর-নির্ভর ফুটবল খেলায় সাফল্য পেতে শুরু করলে বেশির ভাগ ম্যানেজার প্রভাবিত হয়। কিন্তু মান্না তখন থেকেই বলতে শুরু করেন, ফুটবলে শারীরিক সক্ষমতার চেয়ে স্কিল সব সময় গুরুত্বপূর্ণ।
গার্দিওলার খেলার ধরন, বিভিন্ন ম্যাচে তার প্রভাব এসব নিয়েই লিখতেন। তার ব্লগ যে খুব জনপ্রিয় ছিল এমনও না। ২০১২ সালে নিজের ব্লগের লেখাগুলো থেকে একই নামে একটা বই লেখার পর আর্জেন্টিনায় সাড়া পড়ে যায়।২০১৬ সালে ম্যান সিটির দায়িত্ব নেওয়ার সময় গার্দিওলা ফোন দিয়েছিলেন মান্নাকে। বলেছিলেন, 'চলো ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে রাজত্ব করি।' শৈশবের হিরোর এমন প্রস্তাব পেলে আপনি কী করতেন? অথচ মান্না সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। আর্জেন্টিনার হয়ে কাজ করবেন বলে।
মান্নার স্বপ্ন পূরণ হয়। ২০১৮ বিশ্বকাপেই সাম্পাওলির কোচিং স্টাফ টিমে অ্যানালিস্ট হিসেবে যোগ দেন। সাম্পাওলি ছাঁটাই হওয়ার পর তার স্টাফদের মধ্যে থেকে গিয়েছিলেন সহকারী লিওনেল স্কালোনি। থেকে গিয়েছিলেন মান্নাও।
আর্জেন্টিনা টিমে মান্নার ম্যাচ অ্যানালাইসিস, প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতার বিশ্লেষণ, স্কালোনিকে ভিন্ন ভিন্ন পারস্পেকটিভ দেওয়া তো আছেই...তার সবচেয়ে বড় অবদান 'স্যান্ডবল সিস্টেম'। মান্না খেয়াল করেন, বোর্ডে এঁকে এঁকে খেলোয়াড়দের ট্যাকটিক বোঝানো খুব বোরিং। খেলোয়াড়রাও খুব একটা উপভোগ করে না।
মেসিসহ দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড় তখন জয়স্টিক দিয়ে ফিফা ভিডিও গেমটা খেলতে ভীষণ ভালোবাসতেন। মান্না সহজ সমাধান বের করে দিলেন। তার নেতৃত্বে তৈরি হলো ফিফার মতোই একটি সিম্যুলেটর গেম 'স্যান্ডবল'। এটাও জয়স্টিক দিয়ে খেলা যায়। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা এখন ম্যাচের আগে স্ট্র্যাটেজিক ব্রিফ পান এই স্যান্ডবল দিয়েই।

বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা দলের কান্ডারী বলতে আমরা বুঝি দুই লিওনেলকে। একজন মেসি এবং অন্যজন কোচ স্কালোনি। কিন্তু দলের নেপথ্যে থেকে যে পুরো দলকে পরিচালনা করছেন তাঁর কথা আর কেই বা খোঁজ রেখেছেন। তাই মাতিয়াস মান্নার কদর বাকিরা না করলেও আর্জেন্টিনা দলের সবাই করে থাকেন। তিনিই দলের আসল চালিকা শক্তি।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
