

মজিদ বাসকার। ছবি - Google
৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
মজিদ বাসকারকে কলকাতা ময়দান ভোলেনি এখনও। ইরানের ওই জাদুকরের প্রস্থানের প্রায় ৫০ বছর পরেও। প্রাক্তনদের কন্ঠে এখনও সেই একই মুগ্ধতা তাঁকে নিয়ে কথা বলার সময়। একসময়ের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড, লিগের দু’বারের সর্বোচ্চ গোলদাতা মানস ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ‘‘মজিদ আমার দেখা ভারতে আসা সেরা বিদেশী, তারপর আসবে ব্যারেটো, তারপর চিমা। তবে মজিদের মাপের ফুটবলারের সঙ্গে খেলেছি, এটা ভাবলেই এখনও গায়ে কাঁটা দেয়।’’
মানসের সবসময়ের সঙ্গী আরও এক প্রাক্তন তারকা বিদেশ বসুও একই কথা বললেন। তাঁর মন্তব্য, ‘‘মজিদের ফুটবলবোধ, তাঁর গোল চেনার ক্ষমতা আমি অন্তত ভারতে আসা কোনও বিদেশী তারকার মধ্যে দেখেনি। মজিদ যদি শৃঙ্খলা ধরে রাখতে পারত, তা হলে ও এশিয়ার সর্বকালের সেরা মিডফিল্ডার হতে পারত। তাও যা করেছে, যা খেলেছে, আমরা অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম।’’
খেলায় একটা প্রবাদ খুব চালু – ‘ফর্ম ইজ টেম্পোরারি বাট ক্লাস ইজ পারমানেন্ট!’ ফর্ম ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু জাত চিরস্থায়ী। ১৯৮৭ সালের কলকাতা লিগে মহামেডান বনাম ভাতৃসংঘের খেলা। ওই ম্যাচই মজিদের কলকাতায় শেষ কোনও ম্যাচ ছিল। সেইসময় মজিদ ফর্মের ধারেকাছে ছিলেন না। এক মহাতারকার মায়ের সঙ্গে প্রেম নিয়ে তিনি একেবারে বিপর্যস্ত। মনে করা হয়, ওই বাস্কেটবল তারকার সঙ্গে সম্পর্কে না জড়ালে মজিদের ফুটবল ঝলক আরও কয়েকদিন দেখার সুযোগ পেত কলকাতার ফুটবল দর্শকরা।
তো সেই ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হয়ে গেছে প্রায় ৫০ মিনিটের কাছাকাছি। তখন মহামেডানের কোচ কান্নন। কোচ তার আগে পর্যন্ত মজিদকে রিজার্ভ বেঞ্চে বসিয়ে রেখেছিলেন। আচমকা দেখা গেল সারা মাঠ পুলকিত মজিদ মাঠে নামছেন দেখে। রিজার্ভ বেঞ্চ থেকে উঠে হালকা ওয়ার্ম আপ শুরু করলেন বাদশা। তখন অবশ্য মজিদ নিজের সেরা সময় পেছনে ফেলে এসেছেন, তবুও মজিদকে দেখে মহামেডান সমর্থকরা মনে একটু আশার আলো দেখতে পেলেন।

সন্দীপ মুন্সীর পরিবর্তে মজিদ মাঠে নামলেন। কিন্তু দুটি ফ্রিকিক এবং দুটো কর্নার নিয়েও আশানুরূপ কিছু করতে পারলেন না মজিদ। দর্শকরাও হতাশ হলেন, হয়তো দর্শকরা ভাবছিলেন এই মজিদের নতুন কিছু দেওয়ার নেই! অতীতের ছায়া মাত্র! এদিকে খেলা প্রায় অন্তিম লগ্নে এসে হাজির, যে কোনও মূহূর্তে রেফারি খেলা শেষের লম্বা বাঁশি বাজিয়ে দেবেন। হতাশ মহামেডান গ্যালারি ফাঁকা হতে শুরু করেছে, অনেকেই মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন!
একেবারে খেলা শেষে ফের আক্রমনে মহামেডান। বল নিয়ে এগিয়ে চলেছেন প্রদীপ তালুকদার, মহামেডান মাঝমাঠ পেরিয়ে প্রদীপ তালুকদার বল দিলেন আগুয়ান মজিদকে, বল এখন মজিদের পায়ে সামনে ভাতৃর লেফট ব্যাক। মজিদের আউট সাইড ডজে ছিটকে গেলেন ভাতৃর ওই ডিফেন্ডার, মজিদ বল নিয়ে চলে গেলেন একেবারে দূরহ কোণে ঠিক কর্নার ফ্ল্যাগের একটু আগে, যেখান থেকে ভাতৃর দুটি পোস্টকে একটা পোস্ট বলে মনে হয়। ভাতৃ বক্সে তখন জটলা। সবাই প্রস্তুত মজিদের সেন্টারের জন্য। কিন্তু বাদশা মজিদ ভেবেছিলেন অন্য কিছু। ওই জিরো ডিগ্রি অ্যাঙ্গল থেকে ঝলসে উঠল মজিদের ডান পায়ের আউট স্টেপ - বল অনেকটাই সুইং করে জালে জড়িয়ে গেল। সারা মাঠ হতবাক, তারচেয়েও বেশি ভ্রাতৃর ফুটবলাররা। এই জায়গা থেকেও গোল করা যায়!
নিঃসন্দেহে বিশ্বমানের গোল। যে গোল দেখে মহামেডান সমর্থকরা একপ্রকার পাগল হয়ে গেলেন আনন্দে। মজিদ কেন তাঁদের নয়নের মণি, সেটা তাঁরা বুঝতে পারলেন। সতীর্থদের কাঁধে চেপে সেদিন মাঠ ছেড়েছিলেন বাদশা, তিনি ছিলেন কলকাতা ফুটবলের সেই সময়ের জাদুকর। তাঁকে বারবার আটকাতে গিয়ে ব্যর্থ হওয়া প্রাক্তন ডিফেন্ডার মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য বলেছেন, ‘‘মজিদের ক্লাসটাই আলাদা ছিল। একদম বোঝা যেত না ওঁর চোরা গতি, কিন্তু বল পায়ে পড়লেই বিদ্যুৎগতিতে এগিয়ে যেত বিপক্ষের বক্সের দিকে। মজিদ আমাকে বারবার সমস্যায় ফেলেছে, সেটা আজও স্বীকার করতে অসুবিধে নেই।’’
এই মুহূর্তে কলকাতা ময়দান থেকে বহু দূরে ইরানের বাস্কে নামক অঞ্চলে থাকেন মজিদ। আগে একটি বেসরকারি ট্রাভেল এজেন্সিতে কাজ করতেন, এখন অবসর নিয়ে ফেলেছেন। তাঁর এক ভাইপো জাইদুল সায়েস্তা ইরান থেকে ম্যাসেঞ্জারে জানিয়েছেন, ‘‘কাকা এখন বাড়ির কাছেই স্কুলের একটা ফুটবল দলকে কোচিং দেন। তিনি ফুটবল নিয়েই রয়েছেন, বাকি জীবনেও থেকে যাবেন।’’
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
