১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
ইউরোপে অভিবাসনের নতুন ঢেউ: চরম দক্ষিণপন্থার সঙ্কেত

প্রতীকী চিত্র। ছবি - AI

ইউরোপে অভিবাসনের নতুন ঢেউ: চরম দক্ষিণপন্থার সঙ্কেত

calender icon 2 ৮ই আগস্ট, ২০২৬

উত্তর আফ্রিকায় ইউরোপ তথা স্পেনের ছিটমহল সেউটায় সম্প্রতি আছড়ে পড়া অভিবাসীদের ঢল ইউরোপীয় ভূ-রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন ফেলেছে। মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় প্রায় ৬০ হাজার মানুষের ইউরোপে মরিয়া অনুপ্রবেশের চেষ্টা এবং পরবর্তীতে একপ্রকার বাধ্য হয়ে তাদের দ্রুত প্রত্যাবর্তনের ঘটনাটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন বা হঠাৎ ঘটে যাওয়া সীমান্ত-সঙ্কট নয়। এটি ইউরোপের দোরগোড়ায় কড়া নাড়া এক বৃহত্তর অভিবাসন-সুনামির খণ্ডচিত্র। তবে এটা ঠিক, মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় এত বিপুলসংখ্যক মানুষের একত্রে ইউরোপে ঢোকার প্রচেষ্টা এর আগে দেখা যায়নি।

এই মানবিক ও প্রশাসনিক সঙ্কটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। যার ফলে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে গিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্তর্গত প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের রাজনীতি। এতে বাড়ছে উত্তেজনা, সংঘর্ষ। অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বিকশিত হচ্ছে চরম দক্ষিণপন্থী বা উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক মনোভাব। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম ইউরোপে তার ফসল তোলার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে চরম দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলি।

আফ্রিকা-ইউরোপের একমাত্র স্থল সীমান্তে সঙ্কট

স্পেনের সেউটা হল উত্তরা আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের একটি ছিটমহল। এটি রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, আইন সমস্ত দিক থেকে স্পেনের অংশ। অর্থাৎ এটিও স্পেন। আরও ভালো করে বললে, মরক্কোর গায়ে লেগে থাকা আফ্রিকা মহাদেশে স্পেন তথা সমগ্র ইউরোপের একমাত্র ভূখণ্ড। যদিও মরক্কো এটি তাদের নিজেদের বলে দাবি করে থাকে। সেখানেই অভিবাসনের এই নতুন ঢেউ আছড়ে পড়ে।

তবে এটা কোন‌ও ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। ইউরোপের প্রায় প্রতিটি প্রবেশদ্বারেই অভিবাসীদের স্রোত আছড়ে পড়ছে। ভূমধ্যসাগর পেরিয়ে ইতালির লাম্পেদুসা দ্বীপে প্রতিদিন হাজার হাজার ছিন্নমূল মানুষ ভিড় জমাচ্ছেন। একইভাবে গ্রিসের উপকূল থেকে শুরু করে ইংলিশ চ্যানেল, সর্বত্রই রাবারের নৌকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলছে মরিয়া যাত্রা। যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা, চরম দারিদ্র্য এবং জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার এই মানুষদের একটাই লক্ষ্য কোনরকমে ইউরোপে প্রবেশ করা। এদের বিশ্বাস, ইউরোপে প্রবেশ করলে গোটা জীবনটা বদলে যাবে। অনেক ভালোভাবে বাঁচার সম্ভব হবে। এই অভিবাসীদের চাপ সামলাতে গিয়ে ইউরোপের দেশগুলোর অর্থনীতি, আবাসন ও সামাজিক কাঠামোতে ফাটল ধরছে। স্থানীয় নাগরিকদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে তীব্র নিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক সম্পদের ভাগাভাগি নিয়ে প্রবল ক্ষোভ। তার হাত ধরে বাড়ছে বর্ণবিদ্বেষ ও অভিবাসী বিরোধী মানসিকতা।

আরও পড়ুন
‘সুন্নি ন্যাটো’? পাকিস্তান-সৌদি-তুরস্কের জোট কার্যকরী হবে?
অপেরা বাংলাদেশ: সেনার আপত্তি সত্ত্বেও ক্ষমতায় ইউনুস!
‘ইহুদি’ ক্ষতে ফের পা কাটল জার্মানির!

ভীতিকে পুঁজি করে দক্ষিণপন্থার রাজনৈতিক উত্থান

ইউরোপের জনমানসে তৈরি হওয়া এই ক্ষোভ ও ভীতিকেই অত্যন্ত সুকৌশলে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের চরম দক্ষিণপন্থী দলগুলো। স্পেনে 'ভক্স' (Vox) পার্টির মতো কট্টরপন্থী রাজনৈতিক শক্তি সেউটা ইস্যুকে সামনে রেখে জাতীয় নিরাপত্তার ধুয়ো তুলে অভিবাসন-বিরোধী কড়া সুর চড়িয়েছে এবং নিজেদের জনসমর্থন বাড়িয়েছে।

এই ছবি কেবল স্পেনের নয়। ফ্রান্সে মেরি ল্য পেনের 'ন্যাশনাল র‍্যালি', জার্মানিতে 'এএফডি' (AFD) কিংবা ইতালির বর্তমান চরম দক্ষিণপন্থী সরকার- সর্বত্রই অভিবাসন ভীতিকে পুঁজি করে উগ্র বিদ্বেষমূলক জাতীয়তাবাদের নতুন আখ্যান তৈরি করা হচ্ছে। তাদের প্রচারণার মূল ভাষ্য একটাই- বহিরাগতদের হাত থেকে দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, কর্মসংস্থান ও অর্থনীতিকে রক্ষা করতে হবে।

ডিজিটাল মিডিয়া এবং সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে এই বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে, যা খুব সহজেই ভীত সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে মেরুকরণ ঘটাচ্ছে। ফলে, একসময়ের প্রান্তিক কট্টরপন্থী দলগুলো আজ ইউরোপের মূলধারার রাজনীতিতে নির্ধারক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে।

অস্তিত্বের সঙ্কটে উদারপন্থী মূল্যবোধ

অভিবাসনের এই লাগামহীন ঢেউ ইউরোপকে আজ এক চরম নৈতিক ও আইনি দ্বিধাদ্বন্দ্বের মুখে দাঁড় করিয়েছে। একদিকে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক শরণার্থী আইন রক্ষার দায়বদ্ধতা, অন্যদিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের ভীতি। এই টানাপোড়েনের সুযোগ নিয়ে চরম দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলো যেভাবে ইউরোপের রাজনীতি ও প্রশাসন দখল করছে, তাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের উদারপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ ও বহুমাত্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামো গভীর সঙ্কটে পড়েছে।

ডিজিটাল যুগে ভুয়ো খবরের রমরমা এই মেরুকরণকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অবিলম্বে যদি অভিবাসন নীতি নিয়ে একটি মানবিক অথচ বাস্তবসম্মত না বের করা যায়, তবে চরমপন্থার এই বিকাশ অদূর ভবিষ্যতে গোটা ইউরোপকে গিলে খাবে। এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। ইউরোপের রাজনৈতিক ও সামাজিক মানচিত্রকে চিরতরে বদলে দেবে। সেউটার এই অস্বাভাবিক ঘটনা যেন সেই আসন্ন ঝড়েরই একটি আগাম সতর্কবার্তা।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য