

একটি কাল্পনিক দৃশ্যপট। ছবি - AI দ্বারা নির্মিত।
৭ই আগস্ট, ২০২৬
ইহুদি ক্ষতে ঔদ্ধত্যের সাজানো ভরা সংসার চৌপাঠ হয়ে গিয়েছিল অ্যাডলফ হিটলারের। প্রায় ৮ দশক পর সেই একই হাল বর্তমান জার্মানির। না, হিটলারের নাৎসি সরকারের মতো ধ্বংসলীলার সম্মুখীন হয়ত বর্তমান জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রেডরিখ মার্জের হয়নি। তবে যা হয়েছে সেটাও বর্তমান সময় ও পরিস্থিতির নিরিখে কম কিছু নয়।
সম্প্রতি মানে মাস কয়েক আগে, জুন মাসের গোড়ায় রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের ২ বছর মেয়াদী অস্থায়ী সদস্য নির্বাচনের ভোটে গোহারা হেরেছে জার্মানি। বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ইউরোপের সর্ববৃহৎ অর্থনীতি তারা। তা সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়নেরই দুই সতীর্থ সদস্য দেশ অস্ট্রিয়া ও পর্তুগালের কাছে বিরাট ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে জার্মানি।
নিরাপত্তা পরিষদের ইইউ ও অন্যান্য দেশ এই জোন থেকে দুটি সদস্য রাষ্ট্র নির্বাচিত হতে পারত। তার জন্য প্রত্যেকের ১২৭টি ভোট পাওয়া দরকার ছিল। কিন্তু জার্মানির দৌড় থেমে গেছে মাত্র ১০৪টি ভোটে। অপরদিকে অস্ট্রিয়া ও পর্তুগাল পেয়েছে যথাক্রমে ১৩১ ও ১৩৪টি ভোট।
এর আগে জার্মানি ৬ বার রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল এবং প্রতিবারই তারা বিপুল ভোটে জয়ী হয়। আশাকরা হয়েছিল সপ্তমবারও তার পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে। কিন্তু গোপন ব্যালটের এই নির্বাচন বুঝিয়ে দিল আসল পরিস্থিতি অন্য।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ এমনিতেই তার গুরুত্ব হারিয়েছে। তার ওপর ওখানকার অস্থায়ী সদস্যদের আরওই কোনও গুরুত্ব নেই। কারণ রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত স্থায়ী পাঁচ সদস্য দেশের মতামতের উপরই নির্ভর করে। এখানকার ১৫ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৪টি-ই যদি এক দিকে থাকে আর অন্য একজন স্থায়ী সদস্য যদি তার উপর ভিটো দিয়ে দেয়, তখন সংখ্যাগরিষ্ঠ মতের আলাদা করে কোনও অর্থ থাকে না। ফলে নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য জার্মানি বা অন্য কোনও রাষ্ট্র হতে পারল কি পারল না সেটা খুব একটা কোনও অর্থ রাখে না।
কিন্তু রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য পদের নির্বাচনে পরাজয় একটা বিষয় পরিষ্কার করে দিয়েছে, জার্মানির বৈশ্বিক প্রভাব কমছে। আমেরিকার পর রাষ্ট্রসঙ্ঘের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অনুদান প্রদানকারী রাষ্ট্র জার্মানি। কিন্তু তা সত্বেও প্যালেস্তাইনের উপর ইহুদি রাষ্ট্র ইজরায়েলের মানবসংহার নীতি নিয়ে জার্মানির ন্যাক্কারজনক অবস্থান বিশ্বের অন্যান্য দেশগুলির দরবারে তাদের নৈতিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। তাই জার্মানির উপর আর কেউ ভরসা রাখতে পারছে না।
অ্যাডলফ হিটলারের নেতৃত্বে ইহুদিদের ওপর তৎকালীন জার্মান সরকার এথনিক ক্লিনজিং চালিয়েছিল। বেছে বেছে ইহুদিদের হত্যা করা হয়। সেই মৃত্যুর সংখ্যা ৬০ লক্ষেরও বেশি। সেই ঐতিহাসিক দায় থেকে পরবর্তী জার্মান সরকাররা বিভিন্ন ইস্যুতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা ইহুদি রাষ্ট্র ইজরায়েলের প্রতি সমর্থন দিয়ে আসছে।
কিন্তু সেই ইহুদী রাষ্ট্র ইজরায়েল যখন সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে প্যালেস্তাইনের গাজা ভূখণ্ডে ঠিক অনুরূপ এথনিক ক্লিনজিং শুরু করল, পরিকল্পিতভাবে সকল ফিলিস্তিনিকে হত্যা করার নরসংহার যজ্ঞে তারা যখন নামল, আশ্চর্যজনকভাবে এই জার্মানি তার বিরোধিতা করেনি।
বরং জার্মানি রাষ্ট্রসঙ্ঘে বিভিন্নভাবে ইজরায়েলকে রক্ষা করেছে। উল্টে প্যালেস্তাইনে তারা আরও যাতে ভালোভাবে হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারে তার জন্য নিয়মিতভাবে ইজরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ করে গেছে। অথচ রাশিয়াকে আক্রমণকারী তকমা দিয়ে তারা আবার ইউক্রেনের পাশে সব সময় থেকেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের এই দুই সংঘাত নিয়ে জার্মানির দ্বিমুখী নীতি ও দ্বিচারিতা মোটেও আন্তর্জাতিক দুনিয়া ভালোভাবে নেয়নি।
যদিও বর্তমান জার্মান সরকার তাদের এই পরাজয়ের পিছনে রাশিয়ার দিকে আঙুল তুলে দায় ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করেছে। তবে বোঝাই যাচ্ছে মূলত প্যালেস্তাইন নিয়ে তাদের লজ্জাজনক অবস্থানই জার্মানির প্রতি ছোট, সাধারন ও আপাততভাবে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা দেশগুলির আস্থা টলিয়ে দিয়েছে।
রাষ্ট্রসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচনে জার্মানির পরাজয় বা বিশ্ব কূটনীতিতে তাদের নড়বড়ে অবস্থান বাকিদের কাছেও শিক্ষার। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি রাষ্ট্রের সম্মান ও গুরুত্ব তখনই বৃদ্ধি পায় যখন সে সঠিক নীতি নিতে পারে। নিজের স্বার্থের বিষয়টি মাথায় রেখেও একটি দেশ তার নীতির মাধ্যমে যদি যুক্তিসঙ্গত, দায়িত্বশীল ও ধারাবাহিক ভূমিকা পালন করে আসতে থাকে, তাহলে তার গুরুত্ব অবশ্যই বাড়বে। অপরদিকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পলায়ন প্রবৃত্তি মনোভাব নিয়ে যে রাষ্ট্রগুলো চলে, যারা সিদ্ধান্ত না নিয়ে সবকিছু থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখতে চায় তাদের উপর অন্যরা মোটেও ভরসা করে না।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
