

প্রতীকী চিত্র। ছবি - Google
১০ই আগস্ট, ২০২৬
অন্ধ্রপ্রদেশের আরাকু উপত্যকার ৩৩৩টি গ্রামের ছবি বাইরে থেকে দেখলে বেশ মনোরম মনে হবে। প্রায় ৬,০০০ হেক্টরের নিজ জমিতে আদিবাসী সম্প্রদায় লাগিয়েছেন লক্ষ লক্ষ গাছ, যে এলাকাটি আয়তনে প্রায় ১৫০টি ফুটবল মাঠের সমান। কিন্তু দৃশ্যত সবুজে ঘেরা এই প্রকৃতির আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে আন্তর্জাতিক কর্পোরেট কূটকৌশলের এক বিষাদময় গল্প।
দিল্লিভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ‘সেন্টার ফর সাইন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ (CSE)-এর গবেষক রৌহিণী কৃষ্ণমূর্তি ও ত্রিশান্ত দেবের প্রকাশিত প্রতিবেদন ‘ডিসক্রেডিটেড: দ্য ভলান্টারি কার্বন মার্কেট ইন ইন্ডিয়া’-তে উঠে এসেছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। স্থানীয় আদিবাসীরা ঘাম ঝরিয়ে নিজেদের জমিতে বন সৃজন করলেও, তার থেকে তৈরি হওয়া ‘কার্বন ক্রেডিট’-এর সমস্ত আইনি অধিকার না জেনেই হাতছাড়া করে ফেলেছেন এক স্থানীয় এনজিও ‘নন্দী ফাউন্ডেশন’-এর মধ্যস্থতায়।
২০১০ সাল থেকে আরাকুর এই বৃক্ষরোপণ প্রকল্প ফরাসি সংস্থা ‘লাইভলিহুড ফান্ডস’-এর জন্য কার্বন ক্রেডিট তৈরি করা শুরু করে। এরপরই শুরু হয় বিশ্বজুড়ে এক চতুর বিপণন খেলা।
ইভিয়ান ও ডানোন: ফরাসি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ বহুজাতিক সংস্থা ‘ডানোন’-এর বিখ্যাত বিলাসবহুল পানীয় জল ব্র্যান্ড ‘ইভিয়ান’ আরাকুর এই কার্বন শোষণের ওপর ভিত্তি করে নিজেদের পণ্যকে পরিবেশবান্ধব বা ‘কার্বন-নিউট্রাল’ হিসেবে বিশ্বজুড়ে প্রচার করে।
মিশেলিন গ্রুপ: ফরাসি টায়ার প্রস্তুতকারক সংস্থা ‘মিশেলিন’ তাদের কর্মীদের ভ্রমণজনিত কার্বন নির্গমন ‘অফসেট’ বা ভারসাম্য করতে লাইভলিহুডস ফান্ডের কাছ থেকে এই ক্রেডিট কিনে নেয়।
স্থানীয়দের প্রাপ্তি শূন্য: ফরাসি ফান্ডের বিনিয়োগকারী সংস্থাগুলি এই ক্রেডিট ব্যবহার করে নিজেদের পরিবেশ-বান্ধব হিসেবে তুলে ধরলেও, আরাকুর যে আদিবাসীরা বছরের পর বছর ধরে গাছপালা লালন-পালন করলেন, তারা এই কার্বন ব্যবসার লভ্যাংশের এক পয়সাও পাননি। এমনকি তারা জানতেনই না যে তাদের গাছের আড়ালে এমন এক বিশ্বব্যাপী ব্যবসা চলছে।
১৯৯৭ সালের কিয়োটো প্রোটোকল থেকে কার্বন বাজারের উৎপত্তি। সহজ কথায়, কার্বন ক্রেডিট হলো এক ধরণের ব্যবসায়িক অনুমতিপত্র- ১টি কার্বন ক্রেডিট মানে পরিবেশ থেকে ১ টন কার্বন ডাই অক্সাইড (CO2) দূর করা।
যদি কোনো উন্নত দেশ বা সংস্থা তাদের নির্দিষ্ট সীমার চেয়ে বেশি কার্বন নির্গমন করে, তবে তারা উন্নয়নশীল দেশে কার্বন শোষক প্রকল্পে (যেমন গাছ লাগানো বা পুনর্ব্যবহারযোগ্য শক্তি) বিনিয়োগ করে সেই পাপ ‘স্খলন’ বা অফসেট করতে পারে। এর মূল শর্ত ছিল ‘এডিশনালিটি’ বা অতিরিক্ততা—অর্থাৎ, প্রকল্পটি না থাকলে যে পরিমাণ কার্বন নির্গমন রোধ হতো না, প্রকল্পটির কারণে যেন তার চেয়ে বেশি রোধ হয়।
তবে গবেষক বার্বারা হায়া (ইউসি বার্কলে) দেখিয়েছেন কিভাবে এই বাজারকে চালিত করা হয়। একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি জানান, বাতাসের মাধ্যমে বিদ্যুৎ তৈরির প্রকল্পে এক পরামর্শদাতা ব্যাংককে দেখিয়েছিলেন যে প্রকল্পটি লাভজনক, আবার জাতিসংঘকে দেখিয়েছিলেন যে প্রকল্পটি অলাভজনক ও আর্থিক সাহায্য প্রয়োজন! অর্থাৎ, কাগজপত্রের কারসাজিতে ভূতুড়ে ক্রেডিট তৈরি করা অসম্ভব কিছু নয়।
প্যারিস চুক্তির ধারা ৬ অনুমোদনের পর ঐচ্ছিক কার্বন বাজারে ‘বন রক্ষা ও ক্ষয় রোধ’ (REDD+) সংক্রান্ত প্রকল্পগুলি সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে একাধিক অনুসন্ধানে প্রকাশ পেয়েছে এর ভয়ঙ্কর রূপ:
ভুয়ো ক্রেডিট: ২০২৩ সালে দ্য গার্ডিয়ান, ডাই জাইট ও সোর্সমেটেরিয়ালের এক অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রধান কার্বন রেজিস্ট্রি 'ভেরা' (Verra) দ্বারা যাচাইকৃত ৯০%-এরও বেশি রেইনফরেস্ট কার্বন ক্রেডিট আদতে বায়ুমণ্ডলে কোনো বাস্তব কার্বন হ্রাসই করেনি।
স্যাক্রিফাইস জোন (বলির অঞ্চল): তেল শোধনাগার বা ভারী শিল্পাঞ্চলগুলি দেদারসে বিষাক্ত গ্যাস (যেমন বেঞ্জিন, ডাইঅক্সিন) নির্গমন করে যাচ্ছে এবং কার্বন ক্রেডিট কিনে নিজেদের 'সবুজ' দাবি করছে। এর ফলে শিল্পাঞ্চলের আশেপাশের প্রান্তিক মানুষ বিষাক্ত বাতাসে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন।
উচ্ছেদ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন: পেরুর মতো দেশে বহু বন রক্ষা প্রকল্পের নামে স্থানীয় আদিবাসীদের নিজ ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার প্রমাণ মিলেছে।
এনার্জি কনজারভেশন অ্যাক্ট সংশোধনের মাধ্যমে ভারত ২০২৩ সালের জুনে ‘কার্বন ক্রেডিট ট্রেডিং স্কিম’ বিজ্ঞপ্তি জারি করে। তবে উদ্বেগের বিষয় হল, ভারতের মোট ভূমির বিশাল অংশ এবং বনভূমির ওপর যাদের অধিকার, সেই আদিবাসী বিষয়ক মন্ত্রক (Ministry of Tribal Affairs)-এর সাথে কোনো পরামর্শ ছাড়াই এই নির্দেশিকা আনা হয়।
সেন্টার ফর সাইন্স অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট (CSE)-এর গবেষক ত্রিশান্ত দেবের মতে, "যেকোনো কার্বন বাজারকে স্বচ্ছ হতে হবে। প্রকল্প কোথায় চলছে, কত দামে ক্রেডিট বিক্রি হচ্ছে এবং আদিবাসী বা স্থানীয় সম্প্রদায়ের সম্মতি (Free, Prior and Informed Consent) ও ন্যায্য লভ্যাংশ নিশ্চিত হচ্ছে কি না, তা স্পষ্টভাবে জনসমক্ষে আনতে হবে।"
আরাকু উপত্যকার অভিজ্ঞতা আমাদের সতর্ক করে দেয় যে, জলবায়ু পরিবর্তনের নাম করে পরিবেশ সুরক্ষার এই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা যেন বিশ্বজুড়ে কর্পোরেট সংস্থাগুলোর দায় এড়ানোর সহজ অস্ত্র এবং প্রান্তিক মানুষের ওপর নতুন কোনো শোষণের হাতিয়ার হয়ে না দাঁড়ায়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
