১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
হানি ট্র্যাপ! মোবাইলের পর্দায় নতুন গুপ্তযুদ্ধ

প্রতীকী ছবি - AI

হানি ট্র্যাপ! মোবাইলের পর্দায় নতুন গুপ্তযুদ্ধ

একটি বন্ধুত্বের অনুরোধ। একটি ভিডিয়ো কল। তার পর নিয়মিত চ্যাট। ধীরে ধীরে তৈরি হল বিশ্বাস। ব্যক্তিগত কথা থেকে আলোচনা পৌঁছল কাজের জায়গায়। তার পর চাওয়া হল ছবি, ভিডিয়ো, নথি, সামরিক গতিবিধির খবর। কোথাও আবার বলা হল, নির্দিষ্ট একটি অ্যাপ ডাউনলোড করতে। অর্থাৎ লক্ষ্য শুধু তথ্য নেওয়া নয়, ফোনের ভিতরে ঢোকার চেষ্টাও। 

বায়ুসেনার সাম্প্রতিক হানি ট্র্যাপ-কাণ্ড সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনেছে। দিল্লি পুলিশ ভারতীয় বায়ুসেনার এক কর্মরত উইং কমান্ডারকে গ্রেফতার করেছে। অভিযোগ, পাকিস্তানি গোয়েন্দা-চক্রের সঙ্গে যুক্ত এক মহিলা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করেছিলেন এবং পরে সংবেদনশীল প্রতিরক্ষা-তথ্য আদায় করা হয়েছিল। ওই আধিকারিকের বিরুদ্ধে Official Secrets Act-এ মামলা হয়েছে এবং তাঁকে চার্জশিটও করা হয়েছে বলে সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানা যাচ্ছে।

হানি ট্র্যাপ কী?

হানি ট্র্যাপ কথাটির অর্থই হল ব্যক্তিগত আকর্ষণ, সম্পর্ক বা যৌনতার প্রলোভনকে ব্যবহার করে কাউকে এমন অবস্থায় নিয়ে যাওয়া, যেখানে তার কাছ থেকে তথ্য, টাকা বা অন্য কোনও সুবিধা আদায় করা যায়। কিন্তু এখন আর তার জন্য সামনাসামনি দেখা করার প্রয়োজন নেই। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট—একটি ভুয়ো অ্যাকাউন্টই যথেষ্ট। প্রোফাইলে আকর্ষণীয় ছবি, পরিচয় সেনা বা পুলিশকর্মীর বন্ধু কিংবা সাংবাদিক হিসাবে, কয়েক দিনের নিয়মিত কথাবার্তা—তার পর শুরু হয় আসল লক্ষ্যপূরণের কাজ।

২০১৪

পাঠানকোটে বায়ুসেনা ঘাঁটিতে কর্মরত এক এয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এমনই একটি ঘটনায় পাকিস্তানি এজেন্টকে তথ্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। তদন্তকারীদের দাবি ছিল, সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে বিমানঘাঁটি, সেখানকার সরঞ্জাম, সামরিক মহড়া এবং বিমানের মোতায়েন সংক্রান্ত তথ্য নেওয়া হয়েছিল। সেই সময়ও ভুয়ো মহিলা পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছিল।

২০১৮

সালে উত্তরপ্রদেশ ATS এক BSF কনস্টেবলকে গ্রেফতার করে। অভিযোগ ছিল, ফেসবুকে পাকিস্তানি মহিলা সাংবাদিকের পরিচয়ে তৈরি একটি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে তাঁকে ফাঁদে ফেলা হয়েছিল। তদন্তকারীদের দাবি, তিনি বাহিনীর ইউনিটের অবস্থান, অস্ত্র ও গোলাবারুদের তথ্য এবং BSF ক্যাম্পের ছবি পাকিস্তানি ISI-র কাছে পাঠিয়েছিলেন।

IAF মামলা

সাম্প্রতিক IAF মামলায় সেই পুরনো আশঙ্কাই যেন আরও আধুনিক রূপে ফিরে এসেছে। এক জন আধিকারিকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে তাঁর কাছ থেকে তথ্য নেওয়া এবং একই সঙ্গে অন্য আধিকারিকের ফোনে ঢোকার চেষ্টা, দুটি কৌশল পাশাপাশি চললে তার সম্ভাব্য ক্ষতি অনেক বেশি।

কারণ, একটি সামরিক ফোন কখনও শুধু একটি ফোন নয়। তাতে থাকতে পারে সহকর্মীদের নম্বর, ডিউটি সংক্রান্ত বার্তা, বৈঠকের সময়, নথি, ছবি, ভিডিয়ো, ই-মেল কিংবা এমন কোনও তথ্য, যা আলাদা করে গোপন মনে না হলেও একাধিক তথ্য একসঙ্গে জুড়লে সামরিক পরিকল্পনার ছবি স্পষ্ট করে দিতে পারে।

এই কারণেই হানি ট্র্যাপকে এখন শুধু ব্যক্তিগত দুর্বলতা হিসেবে দেখছে না নিরাপত্তা সংস্থাগুলি। এটি ‘হিউম্যান ইন্টেলিজেন্স’ বা মানুষের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহের একটি পদ্ধতি, যার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে সাইবার প্রযুক্তি।

আরও পড়ুন
অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতায় জরুরি অবস্থাকেও হারিয়ে দিল?
মুখ্যমন্ত্রীর নামেও মামলা! শীর্ষে কে?
ভোট কুশলী থেকে জননেতা?

এবং নিশানা শুধু সেনা নয়

পুলিশকর্তারাও বিভিন্ন ধরনের হানি ট্র্যাপ ও ব্ল্যাকমেল চক্রের আওতায় এসেছেন বলে বিভিন্ন তদন্তে অভিযোগ উঠেছে। ২০১৯ সালের মধ্যপ্রদেশের বহুচর্চিত হানি ট্র্যাপ-কাণ্ড তার বড় উদাহরণ। সেখানে অভিযোগ ছিল, একটি সংগঠিত চক্র যৌন সম্পর্কের ফাঁদে ফেলে প্রভাবশালী ব্যক্তি, আমলা, রাজনীতিক এবং সরকারি আধিকারিকদের ব্ল্যাকমেল করত। তদন্তে হাজারের বেশি ভিডিয়ো, অডিয়ো এবং যৌন কথোপকথনের ক্লিপ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল পুলিশ। বহু প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগাযোগের তথ্যও তদন্তকারীদের হাতে এসেছিল বলে রিপোর্টে প্রকাশিত হয়।

পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজন কেন এমন চক্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ? কারণ তাঁদের হাতে থাকে ক্ষমতা, তথ্য এবং যোগাযোগের নেটওয়ার্ক। কোনও থানার ভিতরের খবর, তদন্তের গতিপ্রকৃতি, কোনও অভিযানের আগাম তথ্য, সরকারি সিদ্ধান্তের খবর বা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগাযোগ—একটি সাধারণ ব্যক্তিগত সম্পর্কের আড়ালে এমন তথ্যও চাওয়া হতে পারে। আবার অন্য ধরনের হানি ট্র্যাপে লক্ষ্য হতে পারে টাকা আদায় বা প্রভাব খাটানো।

মধ্যপ্রদেশের ওই কাণ্ডে তদন্তকারীরা দাবি করেছিলেন, চক্রটির যোগাযোগের তালিকায় রাজনীতিক ও আমলাদের পাশাপাশি অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও ছিলেন। পরবর্তী তদন্তে একাধিক সরকারি আধিকারিককে ঘিরে প্রশ্ন ওঠে। তবে কারও নাম কোনও তালিকায় থাকা মানেই তিনি অপরাধে যুক্ত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর কারণ নেই। এ ধরনের মামলায় অভিযোগ, তদন্ত এবং আদালতে প্রমাণ- তিনটি আলাদা বিষয়।

আর এটাই হানি ট্র্যাপের আরও ভয়ঙ্কর দিক। অনেক ক্ষেত্রে ‘টার্গেট’ ব্যক্তি নিজেই জানেন না তিনি কখন থেকে টার্গেট। একটি সাধারণ ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট হয়তো প্রথম ধাপ। তার পর কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে যোগাযোগ। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ জানা। পারিবারিক পরিস্থিতি বোঝা। কাজের জায়গা সম্পর্কে ধারণা নেওয়া। কোন বিষয়ে তিনি দুর্বল, তা বুঝে নেওয়া। তারপর এক দিন এমন একটি অনুরোধ, যা আগের কথাবার্তার তুলনায় সামান্য আলাদা। সেই সামান্য ফাঁক দিয়েই শুরু হতে পারে বড় তথ্য পাচার।

জম্মু-কাশ্মীরেও সাম্প্রতিক সময়ে এমন অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০২৬ সালের জুনে ডোডায় এক যুবককে ঘিরে তদন্তে পুলিশ জানিয়েছিল, ফেসবুকে এক মহিলার সঙ্গে পরিচয়ের পর তিনি জানতে পারেন যোগাযোগকারী আসলে পাকিস্তান থেকে ফোন করছেন। পরে তাঁকে নিরাপত্তা বাহিনীর মোতায়েনের ছবি পাঠানোর বিনিময়ে টাকা দেওয়ার প্রস্তাব এবং হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলে পুলিশ সূত্রের দাবি। এর কিছু দিন আগে মাকওয়াল এলাকায় এক ২৩ বছরের যুবককে Snapchat-এর মাধ্যমে এক মহিলা পাকিস্তানি অপারেটিভের ফাঁদে ফেলার অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

২০২৫ সালেও রাজস্থানের আলওয়ারে এক ব্যক্তিকে Official Secrets Act-এ গ্রেফতার করা হয়। গোয়েন্দা আধিকারিকদের অভিযোগ ছিল, তিনি প্রায় দু’বছর ধরে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে পাকিস্তানি ISI-র হ্যান্ডলারদের সঙ্গে যোগাযোগে ছিলেন এবং এক মহিলা পাকিস্তানি হ্যান্ডলার তাঁকে ‘হানি ট্র্যাপ’ করেছিলেন। আলওয়ার ক্যান্টনমেন্ট ও অন্যান্য কৌশলগত স্থানের তথ্য তাঁর কাছ থেকে নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।

ছবিটা তাই স্পষ্ট। হানি ট্র্যাপের প্রথম অস্ত্র হয়তো আকর্ষণ। দ্বিতীয় অস্ত্র বিশ্বাস। তৃতীয় অস্ত্র ভয়। আর চতুর্থ অস্ত্র প্রযুক্তি।

কখনও টাকা দিয়ে প্রলুব্ধ করা হয়। কখনও সম্পর্কের প্রতিশ্রুতি। কখনও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিয়ো প্রকাশের ভয় দেখানো হয়। আবার গুপ্তচরবৃত্তির ক্ষেত্রে লক্ষ্য আরও নির্দিষ্ট- সামরিক ঘাঁটি, বাহিনীর মোতায়েন, অস্ত্র, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আধিকারিকদের পরিচয় কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার টুকরো টুকরো তথ্য।

সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা সেনার কাছে শত্রুকে চেনা তুলনামূলক সহজ। কিন্তু ফোনের ওপারে বসে থাকা শত্রুকে চেনা কঠিন। কারণ সে হয়তো শত্রুর মতো কথা বলবে না। বরং বন্ধুর মতো কথা বলবে।

এই জায়গাতেই বর্তমান বায়ুসেনা মামলার গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি। তদন্ত যদি প্রমাণ করে যে এক জন আধিকারিকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির আড়ালে অন্য এক আধিকারিকের ফোনে ঢোকার পরিকল্পনাও ছিল, তা হলে সেটি শুধুই একটি ব্যক্তিকে ফাঁদে ফেলার ঘটনা থাকবে না। তখন প্রশ্ন উঠবে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে কতগুলি ‘ডিজিটাল দরজা’ এমন ভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে?

আজকের গুপ্তযুদ্ধ তাই আর শুধু সীমান্তে নয়। যুদ্ধ চলছে তথ্যের জন্য। আর সেই যুদ্ধে গুলি ছোড়ার প্রয়োজন নেই। কখনও একটি ছবি যথেষ্ট, কখনও একটি ফোন নম্বর, কখনও একটি ‘ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট’, কখনও আবার একটি ভিডিয়ো কল।

স্ক্রিনের ওপারে যে মানুষটি বন্ধুত্ব চাইছে, সে সত্যিই বন্ধু কি না, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সেটিই এখন সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।

কারণ, হানি ট্র্যাপের নতুন সংজ্ঞা হয়তো এটাই- ফাঁদটি আর ঘরে পাতা থাকে না। ফাঁদটি এখন হাতে ধরা ফোনের ভিতরেই।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য