

ষষ্ঠ দলাই লামা। ছবি - Google
৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
তিব্বতের ইতিহাসে দালাই লামাদের যেসব ছবি আমাদের সামনে এসেছে, তা বড়ই শান্ত, সমাহিত এবং কঠোর আধ্যাত্মিকতার মোড়কে মোড়া। কিন্তু এই চেনা কাঠামোকেই ভেঙে তছনছ করে দিয়েছিলেন ৎসাঙ্গিয়াং গিয়াতসো (Tsangyang Gyatso)। ষষ্ঠ দালাই লামা।
ৎসাঙ্গিয়াং গিয়াতসোর জীবন কোনও ধর্মীয় শাস্ত্রের পাতা থেকে নয়, যেন উঠে এসেছিল কোনও রোমান্টিক ট্র্যাজেডির পান্ডুলিপি থেকে। মাত্র ২৩ বছরের এক সংক্ষিপ্ত জীবন। কিন্তু সেই জীবনের পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এমন সব রাজনৈতিক কূটকৌশল, উদ্দাম প্রেম আর রহস্য, যা আজও মানুষকে কৌতূহলী করে তোলে।
ষষ্ঠ দালাই লামার জীবনের শুরুটাই হয়েছিল এক বিশাল মিথ্যের উপর দাঁড়িয়ে। ১৬৮২ সালে পঞ্চম দালাই লামার মৃত্যু হয়। কিন্তু তিব্বতের তৎকালীন কার্যনির্বাহী প্রধান বা 'দেশি' সাঙ্গিয়ে গিয়াতসো মনে করেছিলেন, এই মুহূর্তে দালাইলামার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেবে এবং পোতালা প্রাসাদের নির্মাণকাজও মাঝপথে থমকে যাবে। এই অবস্থায় তিনি ভাবনারও বাইরে এক সিদ্ধান্ত নেন। পঞ্চম দালাই লামার মৃত্যুর খবর প্রায় ১৫ বছর তিব্বতিদের কাছ থেকে বেমালুম চেপে গিয়েছিলেন!
এদিকে, ১৬৮৩ সালে আজকের অরুণাচল প্রদেশের তাওয়াং-এর এক সাধারণ মোনপা উপজাতি পরিবারে জন্ম হয় এক শিশুর। নাম ৎসাঙ্গিয়াং। দেশি-এর পাঠানো অনুসন্ধানকারী দল খুব গোপনে এই শিশুকেই পরবর্তী অবতার অর্থাৎ দলাই লামা হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু তাকে লাসায় নিয়ে যাওয়া হয়নি। লোকচক্ষুর আড়ালে লাসার বাইরে এক অজ্ঞাত স্থানে রেখে বড় করা হতে লাগল। অবশেষে ১৬৯৭ সালে, যখন মিথ্যের পাহাড় আর সামলানো গেল না, দেশি সাঙ্গিয়ে গিয়াতসো পঞ্চম দালাইলামার মৃত্যুর খবর ঘোষণা করেন। সেই সঙ্গে ১৪ বছরের কিশোর ৎসাঙ্গিয়াং-কে ষষ্ঠ দালাইলামা হিসেবে পোতালা প্রাসাদে নিয়ে যান।
যে ছেলেটি জীবনের প্রথম ১৪ বছর খোলা হাওয়ায় সাধারণ মানুষের মতো বড় হয়েছে, হঠাৎ করে পোতালা প্রাসাদের কঠোর আধ্যাত্মিক 'বন্দিদশা' আর কঠোর সন্ন্যাসের নিয়মাবলি হাঁফ ধরিয়ে দেয়।
১৮ বছর বয়সে পঞ্চম পাঞ্চেন লামার কাছ থেকে তাঁর পূর্ণাঙ্গ সন্ন্যাস গ্রহণ করার কথা ছিল। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি কেবল পূর্ণাঙ্গ সন্ন্যাস প্রত্যাখ্যানই করেননি, বরং নিজের প্রাথমিক শ্রমণ ব্রতও ফিরিয়ে দেন। স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন, দালাই লামার রাজনৈতিক ও প্রথাগত দায়িত্ব তিনি পালন করবেন ঠিকই, কিন্তু সন্ন্যাসীর জীবন তাঁর জন্য নয়।
এরপরই শুরু হল ৎসাঙ্গিয়াং গিয়াতসোর (ষষ্ঠ দলাইলামা) উদ্দাম জীবন। দিনের বেলা তিনি প্রথা মেনে পোতালা প্রাসাদে রেশমি পোশাক পরে সিংহাসনে বসতেন। আর রাত নামলেই রাজকীয় পোশাক ছেড়ে তিনি পরে নিতেন সাধারণ গৃহস্থের জামা। মাথায় পরতেন নীল রঙের টুপি। নিজের এই ছদ্মবেশের নাম দিয়েছিলেন 'দাকপা দর্জে'। প্রাসাদের পেছনের গোপন দরজা দিয়ে বেরিয়ে পড়তেন রাতের লাসায়।
শহরের শুঁড়িখানাগুলোতে (Tavern) মদ্যপান, তীরন্দাজির আড্ডা আর নারীদের সাহচর্যে মেতে উঠতেন তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের এই সর্বোচ্চ ধর্মগুরু! শোনা যায়, লাসার বারবণিতা থেকে শুরু করে সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে, অনেকের সাথেই তাঁর প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। তিনি ছিলেন এক অসাধারণ কবি। তাঁর লেখা প্রেম ও কামনার কবিতাগুলো তিব্বতীদের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি লিখেছিলেন-
"যদি আমি কেবল ধর্মেই মন দিতাম, তবে এই শরীরেই বুদ্ধত্ব লাভ করতাম। কিন্তু আমার মন পড়ে থাকে তার কাছে, কী করে ভুলব সেই মুখখানি?"
একজন দালাই লামার এমন আচরণ রক্ষণশীল তিব্বতি সমাজে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে। আর ঠিক এই সুযোগটারই অপেক্ষায় ছিল তিব্বতের ক্ষমতা দখল করতে ইচ্ছুক মঙ্গোল শাসক লহাজাং খান।
তিনি প্রচার করেন, ৎসাঙ্গিয়াং গিয়াতসো আসলে প্রকৃত দালাইলামা নন। দেশি সাঙ্গিয়ে গিয়াতসো ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে এক ভণ্ডকে সিংহাসনে বসিয়েছে। এই অজুহাতে ১৭০৫ সালে লহাজাং খান লাসা আক্রমণ করে। দেশিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। চিনের কাংজি সম্রাটের সমর্থন আদায় করে ১৭০৬ সালে লহাজাং খান ষষ্ঠ দালাইলামাকে আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহাসনচ্যুত করেন।
বন্দি দালাই লামাকে যখন বেজিং-এ চিন সম্রাটের দরবারে নিয়ে যাওয়ার জন্য লাসা থেকে বের করা হচ্ছিল, তখন হাজার হাজার তিব্বতি রাস্তায় নেমে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকেই সেই কনভয়ে হামলা করে তাঁদের প্রিয় ধর্মগুরুকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টাও করেন। কিন্তু লাভ হয়নি।
বেজিং যাওয়ার পথে, ১৭০৬ সালের শেষের দিকে কিংহাই হ্রদের (কোকোনোর) কাছে মাত্র ২৩ বছর বয়সে হঠাৎ রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় ৎসাঙ্গিয়াং গিয়াতসোর। অনেকের মতে, তাঁকে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছিল। আবার কিছু ঐতিহাসিক নথিতে দাবি করা হয়েছে, তিনি মারা যাননি; ওই রাতে তিনি সকলের চোখ এড়িয়ে মঙ্গোলিয়ার আলাশান পর্বতে পালিয়ে যান এবং জীবনের বাকি ৩২ বছর একজন সাধারণ মঠবাসী হিসেবে কাটিয়ে দেন।
এই ঘটনার পর তিব্বতে নেমে আসে চরম রাজনৈতিক অরাজকতা। লহাজাং খান নিজের পছন্দমতো ইয়েশে গিয়াতসো নামে এক ভিক্ষুকে 'আসল' ষষ্ঠ দালাই লামা হিসেবে সিংহাসনে বসান। কিন্তু তিব্বতের সাধারণ মানুষ ও মঠের লামারা এই 'পুতুল' ধর্মগুরুকে ঘৃণ্যভাবে প্রত্যাখ্যান করে। তিব্বত জুড়ে শুরু হয় বিদ্রোহ।
সবাই যখন হতাশ, তখন আশার আলো হয়ে ফিরে এল খোদ ৎসাঙ্গিয়াং গিয়াতসোর লেখা একটি ছোট কবিতা। মৃত্যুর কিছুকাল আগে তিনি লিখেছিলেন—
"সাদা সারস, তোমার ডানা দুটি ধার দাও। বেশি দূরে যাব না, কেবল লিথাং ঘুরে ফিরে আসব।"
এই কবিতাই ছিল তাঁর অবতারের 'পুনর্জন্মের' ইঙ্গিত। মঠের প্রভাবশালী লামারা গোপনে অনুসন্ধান শুরু করেন এবং তিব্বতের লিথাং প্রদেশেই ১৭০৮ সালে জন্ম নেওয়া এক বালকের সন্ধান পান, যার নাম কেলজাং গিয়াতসো। সেই শিশুই ছিল সপ্তম দালাই লামা। ১৭১৭ সালে দজুঙ্গার মঙ্গোলরা যখন তিব্বত আক্রমণ করে লহাজাং খানকে হত্যা করে, তখন পরিস্থিতি আরও ঘোরালো হয়। অবশেষে ১৭২০ সালে চিনের সাহায্যে সপ্তম দালাই লামাকে সসম্মানে পোতালা প্রাসাদে প্রতিষ্ঠিত করা হয় এবং তিব্বতে পুনরায় শান্তি ফিরে আসে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
