

সিজেপি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে করা গৌরব ভাটিয়ার মানহানির মামলায় পরিণতি কী হবে? ছবি - Google
১০ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
রাজনীতিতে অনেক সময় একটি ভুল পদক্ষেপের কারণে পিছনে চাপা পড়ে যায় গভীর কোনও সত্য। বিজেপির সর্বভারতীয় মুখপাত্র গৌরব ভাটিয়া এবং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতাদের মধ্যকার সাম্প্রতিক আইনি লড়াই ঠিক এমনই একটি ঘটনার জন্ম দিয়েছে। গৌরব ভাটিয়া সিজেপি নেতাদের বিরুদ্ধে ২ কোটি টাকার মানহানির মামলা করেছেন। কারণ হিসেবে ভাটিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁর নামে একটি ভুয়ো মন্তব্য সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই নিয়ে ক্ষমাপ্রার্থনার কথা বলা হলেও সিজেপি-র সহ-আহ্বায়ক সৌরভ দাস সেই ভুয়ো পোস্টটি ডিলিট করেছেন, কিন্তু দাবি মতো ক্ষমা চাননি।
এদিকে এই আইনি পদক্ষেপের ডামাডোলে যে আসল প্রশ্নটি উঠে এসেছে তা হল, ডানপন্থী উগ্রবাদীদের প্রতি বিজেপির নীরব সমর্থন ও প্রচ্ছন্ন মদত জনিত বিতর্ক।
এই ঘটনার সূত্রপাত একটি AI দিয়ে তৈরি গ্রাফিক ঘিরে। সিজেপি নেতা সৌরভ দাস সম্প্রতি এক্স হ্যান্ডেলে একটি পোস্ট শেয়ার করেন। তাতে দাবি করা হয়েছিল, গৌরব ভাটিয়া নাকি ডানপন্থী ইনফ্লুয়েন্সার স্বতন্ত্র ভরদ্বাজকে 'দিমাগি নকশাল' বলেছেন। বাস্তবে গৌরব ভাটিয়া এমন কোন মন্তব্য করেননি।
এমন ভুয়ো খবর ছড়ানোর বিষয়টি নিঃসন্দেহে সিজেপি-র মতো নয়া প্রজন্মের একটি সংস্কারকপন্থী বিপুল জনসমর্থন পাওয়া যুব সংগঠনের পক্ষে ভ্রান্ত পদক্ষেপ। এর ফলে গোটা দায় সৌরভ দাস তথা সিজেপি-র উপর গিয়ে পড়ে। একজন দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতার নামে এমন ভুয়ো কথা ছড়ানো নৈতিকভাবে সমর্থনযোগ্যও নয়। সেই দিক থেকে দেখলে ভাটিয়ার আইনি পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত একেবারে সঠিক।
তবে মুদ্রার অন্য পিঠটি আরও বেশি ভয়ঙ্কর। স্বতন্ত্র ভরদ্বাজ নামের এক ডানপন্থী ইনফ্লুয়েন্সারকে ঘিরে বেশ তোলপাড় হচ্ছে সর্বভারতীয় মিডিয়া ও মানুষজন। সম্প্রতি একটি পডকাস্টে বুক ফুলিয়ে স্বতন্ত্র ভরদ্বাজ স্বীকার করেছিলেন, যন্তর মন্তরে জেন-জি আন্দোলন চলার সময় তাতে অংশ নেওয়া এক তরুণের বাবার মাথা তিনি হেলমেট দিয়ে মেরে ফাটিয়ে দিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়। তিনি অত্যন্ত দম্ভের সঙ্গে জানান, শাসক পক্ষের রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকার কারণেই পুলিশ তাঁকে ছুঁতে পারেনি!
আশ্চর্যজনকভাবে দেশের রাজধানীর বুকে বসে একজন অপরাধী এমন বুক ফুলিয়ে আস্ফালন করার পরও প্রাথমিকভাবে বিজেপির কোনও নেতা এর নিন্দা করেননি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তবে কি স্বতন্ত্র ভরদ্বাজ'রাই কি বিজেপির সম্পদ? এদের কাণ্ডকারখানাই কি বিজেপির নীতি? গৌরব ভাটিয়াও প্রাথমিক পর্যায়ে এই ঘটনার কোনও নিন্দা করেননি।
সিজেপি নেতা সৌরভ দাসের যে সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট ঘিরে বিতর্ক, সেটি আসলে ছিল একটি ব্যঙ্গাত্মক চ্যালেঞ্জ। তবে তার প্রকাশের ধরণ কোনভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কারণ সেটি এক ধরণের ফেক নিউজ বা ফেক মন্তব্যের আশ্রয় নিয়েছিল। যদিও বোঝাই যাচ্ছে, তাঁর আসল উদ্দেশ্য ছিল বিজেপির দ্বিচারিতাকে প্রকাশ্যে আনা।
সৌরভ দাস বোঝাতে চেয়েছিলেন, বিজেপির কোনও নেতার সাহস নেই স্বতন্ত্র ভরদ্বাজের মতো উগ্রবাদীদের প্রকাশ্যে সমালোচনা করার। কিন্তু তিনি এটি অন্যভাবে তুলে ধরে চ্যালেঞ্জ জানালে বিষয়টি অনেক বেশি যুক্তিসঙ্গত হত। বর্তমান পরিস্থিতিতে সৌরভ দাসের এই একটি ভুলের কারণে তার ছুঁড়ে দেওয়ার চ্যালেঞ্জ পিছনের সারিতে চলে গিয়েছে। বিজেপি ও তাদের দিকে হেলে থাকা পক্ষের কারণে এখন ফোকাসে এসে গেছে, সিজেপির নেতারাও বিজেপিকে নিশানা করতে গিয়ে ফেক বিষয় ছড়াচ্ছে। যা কিছুটা হলেও জেন-জি মুভমেন্টকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
ভুয়ো 'কোটেশন'-এর দায় এড়িয়ে গৌরব ভাটিয়া নিজেকে হয়ত আইনিভাবে সুরক্ষিত করবেন। সঠিকভাবেই এর জন্য সমালোচনার মুখে পড়তে হবে ককরোচ জনতা পার্টিকে। কিন্তু ডানপন্থী মৌলবাদীদের প্রতি গৌরব ভাটিয়াদের বা তাঁদের দলের নীরব সমর্থনের যে অভিযোগ সাধারণ মানুষ এবং বিরোধীরা তুলছেন, তা কিন্তু মিথ্যে হয়ে যায় না।
এই গোটা বিতর্কের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকটি হল, সৌরভ দাসের একটি ছোট্ট কটাক্ষ। গৌরব ভাটিয়া সম্প্রতি হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, সত্যের পরীক্ষা আদালতেই হবে। অর্থাৎ তিনি এই বিষয়ে সিজেপি-র বিরুদ্ধে করা ২ কোটি টাকার মানহানির মামলাকে তুলে ধরে জেন-জি নেতাদের আক্রমণ করেছেন। এর পাল্টা সৌরভ দাস সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, ভুল করে আবার গ্রেটার নয়ডা আদালতে না পৌঁছে যাবেন না।
এই একটি বাক্যেই গৌরব ভাটিয়াকে তাঁর অতীতের সবচেয়ে অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। কয়েক মাস আগেই গ্রেটার নয়ডা আদালতে আইনজীবীদের হাতে চরম হেনস্থার শিকার হতে হয়েছিল এই বিজেপি মুখপাত্রকে। সৌরভ দাসের এই মন্তব্যটি নিছক মজা নয়। এটি আসলে গৌরব ভাটিয়ার দম্ভ চূর্ণ করার জন্য একটি সুপরিকল্পিত 'মাইন্ড গেম'।
এখন দেখার, মূল বিষয় নাকি বাই-লেন সাবজেক্ট আলোচনার প্রধান জায়গাটা দখল করে। বিতর্ক থেকেই সুস্থ গণতান্ত্রিক অভ্যাস তৈরি হয় বা বজায় থাকে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
