১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
সেক্সের নেশায় রানি থেকে সিরিয়াল কিলার!

এশিয়ার প্রথম লিপিবদ্ধ রানি অনুলা। ছবি - AI

সেক্সের নেশায় রানি থেকে সিরিয়াল কিলার!

calender icon 2 ১০ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মূল বিষয়

ইতিহাসের পাতা উল্টালে সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের কাহিনী, অসামান্য বীরত্ব গাঁথা যেমন আছে, তেমন‌ই পাওয়া যাবে বিশ্বাসঘাতকতার অজস্র ঘৃণ্য বিবরণ। কিন্তু প্রাচীন সিংহলের এক রানির কাহিনী বাস্তবিক অর্থেই হার মানাবে যে কোনও আধুনিক ক্রাইম থ্রিলারকে।

প্রাচীন সিংহল বা আজকের শ্রীলঙ্কার এক গৌরবময় অধ্যায়ের নাম অনুরাধাপুর। সেই পবিত্র ভূমিতেই রচিত হয়েছিল চরম যৌন লালসা, ক্ষমতার লোভ আর ধারাবাহিক গুপ্তহত্যার কলঙ্কজনক ইতিহাস। আর তার কেন্দ্রে ছিলেন কলঙ্কিত রানি অনুলা। বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাবংশ-এ এই নিয়ে বিস্তারিত বিবরণ আছে।

এক স্বর্ণযুগের জন্ম

খ্রিস্টপূর্ব ৪৩৭ অব্দে রাজা পাণ্ডুকাভয় অনুরাধাপুর শহরের পত্তন করেছিলেন। তাঁর হাত ধরেই শুরু হয় অনুরাধাপুর রাজবংশের পথচলা। কালক্রমে এই রাজ্য হয়ে ওঠে প্রাচীন সিংহলের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং শক্তিশালী রাজত্ব। ওখানে যখন রাজা দেবানাম্পিয় তিস্স শাসন করছেন, তখন প্রাচীন ভারতে রাজত্ব করছিলেন সম্রাট অশোক। অশোকের পুত্র এবং কন্যার হাত ধরেই সিংহলে বৌদ্ধ ধর্মের আগমন ঘটেছিল।

অনুরাধাপুরকে কৃষি, বাণিজ্য এবং ধর্মীয় উৎকর্ষে সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছেছিল। প্রায় দেড় হাজার বছর টিকে ছিল এই সাম্রাজ্য। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে সিংহলিদের কাছে পবিত্র এই শহরের উপর এক অশুভ ছায়া ঘনিয়ে আসে।

ক্ষমতার অলিন্দে রানি অনুলার প্রবেশ

অনুলা কিন্তু জন্মসূত্রে রাজবংশের কেউ ছিলেন না। তিনি রাজপরিবারে প্রবেশ করেন বিবাহের মাধ্যমে। তাঁর স্বামী ছিলেন রাজা চোর নাগ। নামের মতোই মানুষটার কাজকর্মও ছিল ভয়ানক। রাজা হওয়ার আগে চোর নাগ ছিলেন একজন ডাকাত প্রকৃতির বিদ্রোহী। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তাঁর চরম বিদ্বেষ ছিল। রাজ বিদ্রোহ করার সময় তাঁকে আশ্রয় না দেওয়ায় পরবর্তীতে ১৮টি প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস করেছিলেন।

স্বভাবতই সাধারণ মানুষ ও ধর্মগুরুদের কাছে চোর নাগ ছিলেন চরম অপ্রিয়। অনুলা স্বামীর এই অজনপ্রিয়তা খুব কাছ থেকে দেখেন। ক্ষমতার স্বাদ ততদিনে রানির রক্তে মিশে গেছে। তিনি বুঝলেন, এই অযোগ্য স্বামীকে সরিয়ে ক্ষমতা নিজের হাতে নেওয়ার এটাই সেরা সময়। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮ অব্দে অনুলা প্রথম তাঁর ভয়ঙ্কর রূপ দেখান। রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলে নিঃশব্দে মৃত্যু হয় রাজা চোর নাগের। রানির দেওয়া বিষেই প্রাণ হারান তিনি।

যৌন লালসা ও বিষের খেলা

আরও পড়ুন
বিয়ে নিয়ে প্রতারণা করে ধ্বংস হয়েছিল গৌতম বুদ্ধর পরিবার!
বৌদ্ধ না হলে মানুষ নয়! বুদ্ধের নামে শ্রীলঙ্কায় মৌলবাদীদের তাণ্ডব
একই মণ্ডপে চার বোনের গলায় মালা! ভুটানরাজের সাড়া ফেলা বিয়ে
রাত হলেই লাসার শুঁড়িখানায় মদ্যপান করতেন ষষ্ঠ দলাই লামা!

স্বামীর মৃত্যুর পর অনুলা কিন্তু নিজে সিংহাসনে বসেননি। তিনি ঘুঁটি সাজালেন অন্যভাবে। রাজবংশের নিয়ম মেনে সিংহাসনে বসানো হয় আগের রাজা মহাচূলী মহাতীস্সর নাবালক পুত্র কুদ তিস্সকে। এই তরুণ রাজা ছিলেন আসলে অনুলার হাতের পুতুল। ক্ষমতার রাশ থাকল রানির হাতেই।

ধু ক্ষমতা নয়। রানি অনুলার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক বিকৃত যৌন আকাঙ্ক্ষা। প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাবংশ থেকে জানা যায়, কুদ তিস্স সিংহাসনে বসার কিছুদিন পরেই রানির চোখ পড়ে প্রাসাদের এক প্রহরীর উপর। লোকটির নাম ছিল শিব। অনুলা শিবের প্রেমে পাগল হয়ে ওঠেন। কিন্তু মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়ান তরুণ রাজা। রানির নির্দেশে অবধারিতভাবে বিষের শিকার হলেন কুদ তিস্স। শিব হলেন নতুন রাজা।

এদিকে রানি অনুলার প্রেম খুব বেশিদিন এক‌ই ব্যক্তির উপর টিকত না। ঠিক এক বছর দু'মাসের মাথায় শিব রানির কাছে পুরনো হয়ে গেলেন। এবার রানির নজর পড়ল শহরের এক সাধারণ ছুতোর মিস্ত্রির দিকে। তার নাম ভাটুক। অনুলা তাকেই প্রাসাদে নিয়ে এলেন। আর ঠিক আগের মতোই বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করলেন শিবকে।

এরপর রাজার পদে বসালেন নতুন প্রেমিক তথা এক সাধারণ ছুতোর মিস্ত্রি ভাটুক-কে। কিন্তু কিছুদিন পরেই রানির আবার মন বদল হল। এবার এক কাঠুরিয়া রানির মন জয় করে নিল। নাম তার দারুভাটিক তিস্স। পরিণতি সেই একই। মৃত্যু হল ছুতোর মিস্ত্রি ভাটুকের। নতুন রাজা হলেন কাঠুরিয়া।

রানির এই অবাধ যৌনাচার ততদিনে রাজপ্রাসাদের সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেছে। কাঠুরিয়ার পর রানির শয্যাসঙ্গী হলেন এক ব্রাহ্মণ পুরোহিত। নাম নিলিয়া। আগের সব প্রেমিকের মতো কাঠুরিয়া তিস্সকেও বিষ খাইয়ে মেরে ফেলা হয়। মহাবংশ অনুযায়ী, রানি এতটাই কামুক হয়ে পড়েছিলেন যে প্রাসাদের বত্রিশ জন প্রহরীর সঙ্গেই তিনি শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করতে চেয়েছিলেন!

এই ধারাবাহিক খুনের খেলা থেকে নিলিয়াও রেহাই পেলেন না। রাজা হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই রানির বিষে তারও মৃত্যু হয়। অবশেষে খ্রিস্টপূর্ব ৪৭ অব্দে রানি অনুলা নিজেই সরাসরি সিংহাসনে বসেন।

অনুলার চরম পরিণতি

রানি অনুলা ভেবেছিলেন পথের সব কাঁটা দূর হয়ে গেছে। কিন্তু একটা বড় ভুল তিনি করেছিলেন। কুদ তিস্সকে হত্যা করার সময় তার ছোট ভাই কুতাকান্না তিস্সকে তিনি মারতে পারেননি। কুতাকান্না নিজের প্রাণ বাঁচাতে রাজধানী ছেড়ে পালিয়েছিলেন। রানির চোখে ধুলো দিতে তিনি বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর ছদ্মবেশে দীর্ঘদিন বনে জঙ্গলে আত্মগোপন করে থাকেন।

অনুলা যখন সিংহাসনে বসে স্বৈরাচার চালাচ্ছেন, কুতাকান্না তখন গোপনে নিজের বাহিনী গোছাতে শুরু করেন। রানি অনুলা এককভাবে সিংহাসনে মাত্র চার মাস স্থায়ী হয়েছিল। বিশাল এক সেনাবাহিনী নিয়ে অনুরাধাপুর আক্রমণ করেন রাজকুমার কুতাকান্না তিস্স। রানির অনুগত বাহিনী সেই আক্রমণে খড়কুটোর মতো উড়ে যায়।

পরাজিত রানিকে বন্দি করা হয়। কুতাকান্না তিস্স কোনও দয়া দেখাননি। যে রাজপ্রাসাদে বসে অনুলা একের পর এক প্রেমিককে রাজার পদে বসিয়েছেন এবং বিষ খাইয়ে মেরেছেন, সেই প্রাসাদেই একটি চিতা সাজানো হয়। রানি অনুলাকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। কলঙ্কিত সেই প্রাসাদটাও সম্পূর্ণ পুড়িয়ে ছাই করে দেন কুতাকান্না তিস্স।

খ্রিস্টপূর্ব ৪২ অব্দে অনুরাধাপুরের সিংহাসনে বসেন কুতাকান্না তিস্স। একটি সম্পূর্ণ নতুন প্রাসাদ তৈরি করেন। তাঁর ২২ বছরের শাসনকাল ছিল এই রাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম শান্তিপূর্ণ একটা সময়। রানি অনুলার সেই ভয়ঙ্কর ব্যভিচারী অধ্যায় পেছনে ফেলে অনুরাধাপুর এইভাবেই আবার তার পুরনো ছন্দে ফিরে পেয়েছিল।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য