

তৃতীয় দলাই লামা সোনম গিয়াৎসো। ছবি - Google
১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
পৃথিবীর ইতিহাসে এমন চমকপ্রদ ঘটনা কিছুটা বিরলই। ভাবুন তো, একজন মানুষ সারাজীবন নিজের ধর্ম ও দর্শন নিয়ে মগ্ন থাকলেন। মানবকল্যাণে কাজ করে গেলেন এবং জগতের নিয়মেই একদিন পৃথিবী থেকে বিদায়ও নিলেন। অথচ তাঁর মৃত্যুর এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর তাঁকে এমন এক উপাধিতে ভূষিত করা হল যা আজ বিশ্বজুড়ে পরম শ্রদ্ধার বিষয়! তিব্বতের প্রথম ও দ্বিতীয় দলাই লামার ক্ষেত্রে ঠিক এটাই ঘটেছিল। শুধু তাই নয়, মৃত্যুর আগে তাঁরা জানতেনই না যে তাঁরা এক বিশেষ শাসন ব্যবস্থা সর্বোচ্চ ব্যক্তি। কারণ তাঁদের হাত ধরে তো সেই শাসনব্যবস্থার প্রবর্তনই ঘটেইনি। কিন্তু বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় দলাই লামা বলে স্বীকৃতিও জুটে যায়।
এর পেছনে লুকিয়ে আছে ধর্ম এবং রাজনীতির এক অদ্ভুত সমীকরণ। আর সেই সমীকরণের অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন এক মঙ্গোলীয় শাসক। ইতিহাস যাঁকে আলতান খান নামে চেনে। ইনি আবার খোদ চেঙ্গিস খান-এর সরাসরি বংশধর।
দলাই লামা উপাধির শিকড় খুঁজতে গেলে আমাদের বেশ খানিকটা পিছিয়ে যেতে হবে। চতুর্দশ শতাব্দীতে তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে তখন রীতিমত ক্ষমতার রেষারেষি চলছে। ঠিক সেই সময়েই জে সোংখাপা নামে এক অত্যন্ত মেধাবী ও জ্ঞানী বৌদ্ধ পণ্ডিত প্রতিষ্ঠা করলেন 'গেলুগ' বা পীত-টুপি সম্প্রদায়। ঠিক তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বললে একটু ভুল বলা হবে। তিনি বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের বিচ্যুতিগুলিকে দূর করে শিক্ষা, ধর্ম ও দর্শনের প্রতি আরও নিবেদিত প্রাণ হওয়ার পথের কথা প্রচার করে গিয়েছিল। তাঁর অনুসারী বা শিষ্যদের হাত ধরেই এই সম্প্রদায়ের সূচনা।
কঠোর নিয়ম, ব্রহ্মচর্য ও বৌদ্ধ দর্শনের উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই নতুন শাখাটি খুব দ্রুত তিব্বতের সাধারণ মানুষের মন জয় করে নেয়। প্রথম দলাই লামা হিসেবে গোটা বিশ্ব আজ যাঁকে চেনে, সেই গেন্দুন দ্রুপা ছিলেন সোংখাপারই অন্যতম প্রধান শিষ্য। তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ সাধক ও পণ্ডিত। তাঁর মৃত্যুর পর এলেন গেন্দুন গিয়াৎসো। তিনিও নিজেকে একজন উচ্চস্তরের গুরু এবং মঠাধ্যক্ষ হিসেবেই পরিচয় দিতেন। দলাই লামা বলে কোনও শব্দের অস্তিত্ব তখনও তিব্বতের অভিধানে ঢোকেনি। এই প্রসঙ্গে বলে রাখার, 'দলাই লামা' শব্দটি পুরোপুরি তিব্বতি নয়।

গোটা পটভূমি বদলাতে শুরু করল ১৫৭৮ সালে। মঙ্গোলিয়ার তুমেদ মঙ্গোলদের প্রবল পরাক্রমশালী শাসক আলতান খান তখন চাইছেন মঙ্গোল সাম্রাজ্যের হৃতগৌরব পুনরুদ্ধার করতে। সামরিক শক্তির পাশাপাশি তাঁর দরকার ছিল এক মজবুত আধ্যাত্মিক সমর্থন। তিনি তিব্বতের গেলুগ সম্প্রদায়ের তৎকালীন প্রধান সোনম গিয়াৎসোকে আমন্ত্রণ জানালেন মঙ্গোলিয়ায়। এই একটি সাক্ষাতেই বদলে গিয়েছিল গোটা তিব্বতের ভবিষ্যৎ।
সোনম গিয়াৎসোর অগাধ পাণ্ডিত্য ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানে আলতান খান মুগ্ধ হন। তিনি সপারিষদ বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। সেই মহামিলনের মঞ্চেই আলতান খান সোনম গিয়াৎসোকে মঙ্গোলীয় ভাষায় একটি বিশেষ সম্মান প্রদান করেন। উপাধিটি ছিল 'দালাই লামা'। মঙ্গোলীয় ভাষায় 'দালাই' মানে মহাসাগর এবং তিব্বতি ভাষায় 'লামা' মানে গুরু। অর্থাৎ তিনি হলেন জ্ঞানের মহাসাগর।
এই ঘটনার পর সোনম গিয়াৎসো হয়ে উঠলেন ইতিহাসের প্রথম জীবিত দালাই লামা। কিন্তু তিব্বতি বৌদ্ধধর্মে পুনর্জন্ম বা 'তুলকু' প্রথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বাস করা হত, সোনম গিয়াৎসো আসলে গেন্দুন গিয়াৎসোর পুনর্জন্ম। আর গেন্দুন গিয়াৎসো হলেন গেন্দুন দ্রুপার পুনর্জন্ম। এই আধ্যাত্মিক বংশধারার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেই এক অদ্ভুত অথচ দূরদর্শী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
সোনম গিয়াৎসোকে স্বীকৃতি দেওয়া হল তৃতীয় দালাই লামা বা দলাই লামা হিসেবে। আর তাঁর আগের দু'জন পূর্বসূরিকে মরণোত্তর প্রথম ও দ্বিতীয় দলাই লামার মর্যাদা দেওয়া হয়। এর পেছনে ছিল গভীর এক রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ। সদ্য পাওয়া এই মঙ্গোলীয় উপাধির শেকড় যে অনেক গভীরে প্রোথিত, মূলত সেটাই প্রমাণ করতে চেয়েছিল গেলুগ সম্প্রদায়। মঙ্গোলীয় শক্তির সাহায্যে নিজেদের আধ্যাত্মিক ধারাটিকে প্রাচীন ও অকাট্য প্রমাণের জন্যই এই মরণোত্তর স্বীকৃতির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এর মাধ্যমে তিব্বতি বৌদ্ধ ধর্মের বাকি তিনটি শাখা কে পেছনে ফেলে আরও গুরুত্ব অর্জন করে ফেলে সবচেয়ে নবীন গেলুগ শাখাটি।
আলতান খানের দেওয়া একটি উপাধি আর রাজনৈতিক জোট তিব্বতের শাসনতান্ত্রিক কাঠামোকে ভেতর থেকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এর প্রভাব ছিল যুগান্তকারী।
প্রথমত, মঙ্গোলদের এই বিশাল সামরিক ও রাজনৈতিক মদত পেয়ে গেলুগ সম্প্রদায় রাতারাতি তিব্বতের সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়। অন্যান্য পুরোনো তিব্বতি সম্প্রদায়গুলো তাদের কাছে ধীরে ধীরে কোণঠাসা হতে থাকে।
দ্বিতীয়ত, তিব্বতে ধর্ম ও রাজনীতির এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটে। ১৬৪২ সালে পঞ্চম দালাই লামা মঙ্গোল সেনাপতি গুশরি খানের প্রত্যক্ষ সামরিক সাহায্যে সমগ্র তিব্বতকে একত্রিত করেন। দালাই লামারা তখন থেকে কেবল আর আধ্যাত্মিক গুরুই রইলেন না। তাঁরা একাধারে হয়ে উঠলেন তিব্বতের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক শাসক। এইভাবেই পথচলা শুরু হয় দলাই লামা শাসিত তিব্বতের 'গানদেন ফোদ্রাং' সরকারের।
মঙ্গোলিয়ার সাথে তিব্বতের বহু পুরোনো 'পুরোহিত-পৃষ্ঠপোষক' সম্পর্ক আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। তিব্বত জোগাত আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শন। বিনিময়ে মঙ্গোলরা দিত সামরিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা।
একটি সাধারণ উপাধি কীভাবে একটি গোটা দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো পালটে দিতে পারে, দলাই লামা প্রথা তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। আলতান খানের দেওয়া সেই সম্মান শুধু একজন ব্যক্তি বা একটি সম্প্রদায়কে বড় করেনি, তা গোটা তিব্বতকে এক সুতোয় বেঁধেছিল। আর সেই সুতোতেই বাঁধা পড়েছিলেন প্রথম ও দ্বিতীয় দলাই লামা। নিজেদের অজান্তেই তাঁরা কিংবদন্তি তুল্য স্বীকৃতির অধিকারী হয়েছেন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
