

ব্যাঙ্ককে থাই রাজপরিবারের রয়্যাল গ্র্যান্ড প্যালেস। ছবি - Google
১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
চারদিকে ছড়িয়ে আছে অজস্র বৌদ্ধ বিহার। গেরুয়া বসন পরিহিত ভিক্ষুদের ভিড়। এটাই স্বাভাবিক। কারণ দেশটার সরকারি ধর্মই বৌদ্ধ। অথচ সেই দেশেরই যিনি রাজা, তিনি নিজেকে মনে করেন ভগবান বিষ্ণুর অবতার। শুধু মনে করাই নয়, তাঁর সরকারি উপাধি হল 'রাম'।
বর্তমান পৃথিবীতে আজ আর কোথাও এমন কোনও রাজবংশ নেই, যারা শাসনক্ষমতায় বসে ভগবান রামের নামে উপাধি ব্যবহার করে। সেই অদ্ভুত ব্যতিক্রম দেশটি হল থাইল্যান্ড। সেখানকার বর্তমান রাজা হলেন 'দশম রাম'। থাইল্যান্ডের রাজা একাধারে বৌদ্ধ ধর্মের রক্ষক, অন্যদিকে হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের চূড়ান্ত ধারক।
এর নেপথ্য কাহিনীর দিকে একটু উঁকি মারা যাক।
থাইল্যান্ডের প্রাচীন নাম ছিল সিয়াম। একসময় অত্যন্ত শক্তিশালী সাম্রাজ্য আয়ুথায়া রাজবংশ সিয়াম শাসন করতো। তবে ১৭৬৭ সালে বর্মিদের (আজকের মায়ানমার) আক্রমণে সেই সাম্রাজ্য তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। বর্মিরা সিয়ামের তৎকালীন রাজধানীসহ গোটা সাম্রাজ্যকেই ছিন্নভিন্ন, তছনছ করে দিয়েছিল।দেশকে পরাধীনতার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন সেনাপতি তাকসিন। কিন্তু কয়েক বছরের মধ্যেই রাজ্য শাসনের প্রবল চাপে তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। সেখান থেকেই নিজেকে বোধিসত্ত্ব ভাবতে শুরু করুন। আর সেই সূত্র ধরেই সাধারণ প্রজা থেকে শুরু করে অভিজাত, সকলের উপর শুরু হয়েছিল তাকসিনের ভয়াবহ অত্যাচার।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতির ত্রাতা হয়ে দাঁড়ান তাকসিনের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও ভরসাযোগ্য সেনাপতি থংদুয়াং। যিনি পরবর্তীতে চাও ফ্রায়া চক্রী নাম ধারণ করেছিলেন। তাকসিনকে সরিয়ে ১৭৮২ সালের ৬ এপ্রিল তিনি সিয়ামের সিংহাসনে বসেন। প্রতিষ্ঠা করেন 'চক্রী রাজবংশ'। রাজধানী সরিয়ে আনেন বর্তমান ব্যাঙ্ককে। সেই চক্রী রাজবংশই আজ পর্যন্ত থাইল্যান্ড শাসন করে আসছে। তবে এই প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, চক্রী রাজবংশের ষষ্ঠ শাসক অর্থাৎ ষষ্ঠ রাম প্রথম 'রাম' উপাধিটি সরকারিভাবে ব্যবহার করেন। তার আগে থেকেই এটি প্রচলিত ছিল, কিন্তু সেটা থাইল্যান্ডের রাজ পরিবারের সমর্থনকারীদের একাংশ বলত। কিন্তু সরকারিভাবে এটি ষষ্ঠ রামের সময় প্রথম ব্যবহৃত হয়।
কিন্তু একটি সম্পূর্ণ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশের রাজা হিন্দু রীতি কেন মেনে চলেন? এর শেকড় লুকিয়ে আছে প্রাচীন খেমার সাম্রাজ্যের প্রভাবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় যুগ যুগ ধরে একটা অলিখিত নিয়ম চলে আসছে। আধ্যাত্মিক শান্তির পথ হিসেবে এরা বেছে নিয়েছে বৌদ্ধ ধর্মকে। আর ইহকালের রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং রাজকীয় ক্ষমতার জন্য তারা নির্ভর করেছে হিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদের উপর।
থাই রাজারা নিজেদের 'দেবরাজ' বা ঈশ্বরের অবতার বলে মনে করেন। সাধারণ মানুষের চোখে রাজার ক্ষমতাকে ঐশ্বরিক ও নিরঙ্কুশ প্রমাণের জন্য হিন্দু রীতিনীতির কোনও বিকল্প ছিল না। তাই থাইল্যান্ডের রাজার রাজ্যাভিষেক আজও সম্পন্ন হয় সম্পূর্ণ হিন্দু বৈদিক প্রথায়। রাজদরবারের হিন্দু ব্রাহ্মণরা নদী থেকে আনা পবিত্র জল দিয়ে রাজাকে স্নান করান। শঙ্খধ্বনি ও বেদ পাঠের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হিন্দু চিহ্ন সমন্বিত রাজমুকুট পরানো হয়। এই ব্রাহ্মণরাই আবার মে মাসে রয়্যাল প্লাউইং সেরিমনি বা কৃষিকাজের শুভসূচনা করেন। থাই সংস্কৃতিতে তাদের রামায়ণ 'রামাকিয়েন' শুধু মহাকাব্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতীক।
উল্লেখ্য, চক্রী রাজবংশের সরকারি প্রতীকটি ভগবান বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র ও শিবের ত্রিশূলের সমন্বিত রূপ। থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাঙ্কক সহ সর্বত্র বৌদ্ধমঠের পাশাপাশি অজস্র হিন্দু মন্দির আছে। এখানে ভগবান ব্রহ্মার পাশাপাশি ব্যবসা ও শিল্পের দেবতা হিসেবে গণেশ (যাঁকে থাই ভাষায় 'ফ্রা ফিকানেত' বলা হয়) অত্যন্ত জনপ্রিয়। এছাড়া শিব (ফ্রা ইসুয়ান), বিষ্ণু (ফ্রা নারাই) এবং ইন্দ্রের (ফ্রা ইন) মূর্তিও বিভিন্ন বৌদ্ধ মন্দিরের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১৯৩২ সালে এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের পর থাইল্যান্ডে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে। সাংবিধানিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বাস্তবে থাই রাজার ক্ষমতা অপরিসীম। তিনি একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান, সামরিক বাহিনীর প্রধান এবং সমস্ত ধর্মের রক্ষক। থাইল্যান্ডে 'লেস মেজেস্ট' বা রাজপরিবারের অবমাননা বিরোধী আইন অত্যন্ত কড়া। রাজার সমালোচনা করলে দীর্ঘ কারাদণ্ড অনিবার্য। সেইসঙ্গে থাই রাজপরিবারের কোনও সদস্য অপরাধ করলেও রাজার অনুমতি ছাড়া তাঁকে শাস্তি দেওয়া যায় না।
বর্তমান থাই রাজা দশম রাম বা মহা ভজিরালংকর্ন সিংহাসনে বসার পর থেকে বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি। এর জন্য তাঁর প্রথা বহির্ভূত বিলাসবহুল ও উচ্ছশৃঙ্খল জীবনযাপন এবং বছরের বেশিরভাগ সময় জার্মানিতে কাটানো নিয়ে জনমানসে প্রবল ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সেই সঙ্গে রাজার একের পর এক বিয়ে ও বিবাহ বিচ্ছেদ, রাজ পরিবারের উত্তরসূরী নিয়ে অযথা বিতর্ক, রাজকীয় সঙ্গিনী সিনিনাতকে হঠাৎ বরখাস্ত করে জেলে পাঠানো এবং পরে আবার সসম্মানে ফিরিয়ে আনার ঘটনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে রীতিমতো ঝড় তোলে। এইসব ঘটনায় থাইল্যান্ডের সাধারণ নাগরিকদের একটা বড় অংশ ক্ষুব্ধ হয়।
এর পাশাপাশি বৌদ্ধ ধর্মের সর্বোচ্চ পদে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেন রাজা। ২০১৭ সালে প্রথা ভেঙে তিনি নিজের পছন্দের এক রক্ষণশীল সন্ন্যাসীকে 'সুপ্রিম প্যাট্রিয়ার্ক' পদে বসান। এর আগে এই পদের জন্য বৌদ্ধ ধর্মের সর্বোচ্চ পরিষদ যার নাম সুপারিশ করেছিল, তিনি নানান বিতর্কে জড়িত ছিলেন। কিন্তু তাতেও রাজার এই সরাসরি হস্তক্ষেপকে ভালোভাবে নেয়নি সেখানকার তরুণ প্রজন্ম।
তবে এই ক্ষোভই থাইল্যান্ডের সম্পূর্ণ চিত্র নয়। মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। রাজপরিবারের প্রতি অগাধ সমর্থন ও ভক্তি আজও থাই সমাজের একটা বিশাল অংশের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে রয়েছে। দেশের প্রবীণ নাগরিক, গ্রামীণ জনপদ এবং সামরিক বাহিনীর কাছে রাজা এখনও এক ঐশ্বরিক ঐক্যের প্রতীক। রাজনৈতিক দলগুলোর লাগাতার রেষারেষি এবং ঘন ঘন সামরিক অভ্যুত্থানের মাঝে রাজতন্ত্রকেই তারা দেশের স্থিতিশীলতার একমাত্র ভরসা বলে মনে করে। তাদের চোখে রাজা দশম রাম হলেন সেই অভিভাবক, যিনি সমস্ত সঙ্কটে দেশকে এক সুতোয় বেঁধে রাখেন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
