

এমেকা এজুগো। ছবি - Google
১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কলকাতা মাঠে আসা বিদেশী ফুটবলারদের মধ্যে সেরা কে, সেই নিয়ে আলোচনা হলে অব্যর্থভাবে এসে পড়বেন এমেকা এজুগো। এই নাইজেরিয়ান আটের দশকের শেষ দিকে কলকাতার মাঠে খেলতে এসেছিলেন। তিনি ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে যোগ দেন সেই ১৯৮৬ সালে, তারপর মহামেডান স্পোর্টিংয়ে সেরা সময় কাটিয়েছিলেন। ১৯৮৭ সালে কলকাতার মহামেডানে খেলার সময়ই এমেকার ফুটবলদক্ষতা বোঝা গিয়েছিল। তারপর তিনি আর কলকাতায় থাকেননি, চলে যান বাংলাদেশের ঢাকা মহামেডান ক্লাবে খেলতে।
১৯৯৭ সালে মোহনবাগানে ফের আসেন, তখন আর সেই ঝলক ছিল না। কিন্তু যাঁরা এমেকার খেলা দেখেছেন, তাঁরা জানেন তিনি একটা কোহিনূর ছিলেন। নাইজেরিয়া থেকে ভারতীয় ফুটবলে পা রেখেছিলেন ওই দীর্ঘদেহী মিডিও। চণ্ডীগড়ের ডাভ কলেজের স্নাতক ছিলেন ওই নামী তারকা। পরবর্তীতে ১৯৯৪ বিশ্বকাপে তিনি দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। বুলগেরিয়ার বিপক্ষে ৭৭ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নামেন। তার আগে সিওল অলিম্পিকে নাইজেরিয়া দলের হয়ে অনেকগুলি ম্যাচ খেলেছিলেন।
এখনও কলকাতা মাঠের আনাচে-কানাচে তর্ক হয়, বিদেশীদের মধ্যে কে সেরা মজিদ বাসকার, রামিরেজ ব্যারেটো নাকি এমেকাই? মজিদ ও ব্যারেটোর মধ্যে খেলার অনেক মিল থাকলেও এমেকা মূলত সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার ছিলেন। পাশাপাশি, মজিদ ও ব্যারেটো অসাধারণ গেম মেকার। টাচ-প্লে ছিল অত্যন্ত উচ্চ মার্গের। ক্লাসিক তারকা। দুজনের খেলা অনেক বেশি নান্দনিক।
সেদিক থেকে এমেকা ছিলেন মাঝমাঠের তারকা, তিনি ডিফেন্সকে আগলানোর পাশাপাশি গোল করতে বিপক্ষ বক্সেও হানা দিতেন। তাঁর ফিটনেস অনেক উচ্চমার্গের ছিল। বুদ্ধির সঙ্গে শারীরিক সক্ষমতাকে ম্যাচে কাজে লাগাতেন। এমেকা শিল্পী ফুটবলার ছিলেন না, কিন্তু তাঁর কার্যকারিতা কোনও অংশে কম ছিল না। লাল হলুদ জার্সিতে ময়দানে এমেকার অভিষেক হলেও মহামেডানে খেলার সময়ই তাঁর ঝলক বেশি দেখা গিয়েছিল। তিনি সেইসময় গোল করে বহু ম্যাচে মহামেডানকে জিতিয়েছেন।
ডুরান্ড কাপে এমেকার অসাধারণ পারফরম্যান্স তাঁর ইস্টবেঙ্গল ক্লাবে খেলার ছাড়পত্র মেলে। ভারতীয় ফুটবলে তিনি খুব একটা লম্বা সময় না খেললেও যেটুকু খেলেছেন সবার মন জয় করেছেন। আধুনিক ফুটবলের সব রকমের টোটালিটি এমেকার খেলায় দেখা যেত। যে কোনও পরিস্থিতিকে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে এমেকার ভূমিকা ছিল খুবই প্রশংসনীয়। এমেকা সেই কারণেই নাইজেরিয়া জাতীয় দলেও সুযোগ পেয়ে যান তাঁর ফুটবল দক্ষতার জন্য।
মজিদ, ব্যারেটোর দুরন্ত সব পাসে দলের অন্য খেলোয়াড়রা গোল করতেন। এমেকার পাসিং দুজনের মত অত নিখুঁত না হলেও এমেকা গোল করতে পারতেন। অনেক দূর থেকে শটে অথবা অত্যন্ত উঁচু বলে লম্বা শরীরটাকে আরও কয়েক ফুট উঁচুতে তুলে হেড করে বল জালে রাখতেন। ঠিক তেমনি ছিল দুরন্ত ডিফেন্সিভ কোয়ালিটি। গোল বাঁচানোর জনা ডিফেন্সে এসে সাহায্য করতেন। দৌড়নোর গতি মারাত্মক সঙ্গে পাওয়ার। শারীরিক শক্তিকে কাজে লাগাতে পারতেন। এমেকা নিয়ে বলতে গিয়ে বিকাশ পাঁজি মন্তব্য করেছেন, ‘‘এমেকা বড়মানের তারকা ছিলেন। আমি তো ওঁকে চিমার থেকেও এগিয়ে রাখব। এমেকা দলের নিউক্লিয়াস হিসেবে খেলতেন।’’ তাঁর সঙ্গে বহু ম্যাচে মাঠে থেকে বিকাশের অভিজ্ঞতা অনেক সুন্দর। বলেছেনও, ‘‘এমেকা যদি জাতীয় দলে ডাক না পেত, তা হলে কলকাতায় থেকে যেত। না হলে অল্পসময়ে এসেও আধো আধো বাংলা বলতে শিখে গিয়েছিল। আমি ওঁর খেলার ফ্যান ছিলাম।’’
বর্তমানে এমেকার বয়স ৬০, তিনি এই মুহূর্তে নাইজেরিয়ায় লাগোস লায়ন্স ক্লাবে হেড কোচের দায়িত্বে। তাঁর ছোট ছেলেও ফুটবলারই হয়েছেন। তবে বাবার মতো বিখ্যাত হতে পারেননি। এমেকার ভাই ভ্যালেন্টাইন এজুগোও চার্চিল ব্রাদার্সের হয়ে খেলে গিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে চার্চিলের প্রেসিডেন্ট আলেমাও চার্চিলের সম্পর্ক খুবই মধুর ছিল। এমেকা অবশ্য বছর তিনেক আগে একবার গোয়ায় এসেছিলেন, সেইসময় কলকাতায় পা রাখেননি। তবে তাঁর মনে এখনও কলকাতা মানে সোনালি স্মৃতি।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
