

মেটিয়াবুরুজে নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ'র বিতর্কিত হারেমের প্রতীকী ছবি - AI
১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কোপে পড়ে লখনউয়ের সিংহাসন হারান নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ। তাঁকে নির্বাসনে পাঠায়। নবাব এসে পৌঁছন কলকাতার উপকণ্ঠে মেটিয়াবুরুজে। হ্যাঁ, আজ মেটিয়াবুরুজ কলকাতার মধ্যে অবস্থিত হলেও তখন জায়গাটা উপকণ্ঠেই ছিল।
সেখানে তিনি গড়ে তোললেন নিজের সাধের এক ছোটখাটো লখনউ। সেখানে বিশাল চিড়িয়াখানা ছিল। ছিল শিল্প, সাহিত্য আর ঠুমরির জমজমাট আসর। কিন্তু বাইরের এই জাঁকজমকের ঠিক পেছনেই লুকিয়ে ছিল এক অন্য জগত। মেটিয়াবুরুজের হারেম। লখনউ-এর হারেম যেন মেটিয়াবুরুজে তুলে নিয়ে এসেছিলেন নির্বাসিত নবাব। তা ছিল বিশাল। তবে এই হারেম কেবল নবাবের বিলাসিতার জায়গা ছিল না। বরং ধীরে ধীরে এটি কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি, ক্ষমতার লড়াই আর অসংখ্য নারীর নিঃশব্দ কান্নার এক বিশাল কারাগারে পরিণত হয়।
ইতিহাসবিদ আবদুল হালিম শররের লেখা 'গুজিশতা লখনউ' কিংবা রোজি লয়েলিন জোনসের গবেষণাপত্র ঘাঁটলে এই অন্ধকার জগতের এমন কিছু তথ্য সামনে উঠে আসে যা রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো।
ওয়াজেদ আলি শাহ'র এই অন্দরমহল সাধারণ কোনও জায়গা ছিল না। শিয়া আইন মেনে ওয়াজেদ আলি শাহ প্রচুর চুক্তিভিত্তিক বা মুতাহ বিবাহ করতেন। হারেমের নারীদের তিনটি স্পষ্ট ভাগে ভাগ করা ছিল- বেগম, মহল এবং পরি। সাধারণ বা দরিদ্র পরিবারের সুন্দরী মেয়েদের কিনে এনে নাচগান শেখানো হত। এদের নাম দেওয়া হত পরি। এদের মধ্যে বিখ্যাত হয়েছিল মেহক পরি, সুলতান পরি।
নবাবের সুনজরে পড়লে এই পরিরাই চুক্তিভিত্তিক স্ত্রী হিসেবে পদোন্নতি পেতেন। তখন তাদের নামের পাশে মহল উপাধি জুটত। নবাবের সন্তানের জন্ম দিলে তারা সরাসরি বেগম হয়ে যেতেন। আর এই পদোন্নতির লোভেই হারেমের অন্দরে শুরু হয় নোংরা খেলা।
নবাব মেটিয়াবুরুজে আসার কিছুদিন পর থেকেই ধীরে ধীরে শারীরিক দিক থেকে দুর্বল হতে শুরু করেন। ব্রিটিশ নথিপত্রে এমন ইঙ্গিত রয়েছে যে, তিনি হয়ত সিফিলিস বা সেই জাতীয় কোনও যৌন রোগে আক্রান্ত ছিলেন। অন্যদিকে তাঁর হারেমে তখন প্রায় তিনশোর বেশি তরুণী ও যুবতী নারী ছিল। নবাব অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করায় তারা চরম শারীরিক ও মানসিক অতৃপ্তিতে ভুগতে শুরু করে। হারেমের নিরাপত্তার সম্পূর্ণ দায়িত্বে থাকা খোজারা এই পরিস্থিতির চরম সুযোগ নিত। টাকার বিনিময়ে রাতের অন্ধকারে প্রাসাদের পাহারাদার থেকে শুরু করে সাধারণ যুবকদের অন্দরমহলে পাচার করত তারা। খোজারা এতটাই ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছিল যে কেউ তাদের অবাধ্য হলে, সোজা নবাবের কাছে তার নামে মিথ্যে ব্যাভিচারের নালিশ করত। শাস্তি হিসেবে জুটত অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দিদশা বা চাবুকের ভয়ঙ্কর মার। এর জন্য মেটিয়াবুরুজের ওই প্রাসাদ প্রাঙ্গনেই একটি গারদ তৈরি করেছিলেন ওয়াজেদ আলি শাহ।
ওয়াজেদ আলি শাহ'র হারেমের সবচেয়ে বড় স্ক্যান্ডাল ছিল ভুয়ো গর্ভাবস্থার ঘটনা। নিয়ম ছিল, সন্তানের জন্ম দিলেই পরিরা মহল বা বেগম উপাধি পাবেন। সেইসঙ্গে তাদের ভাতাও একধাক্কায় বহুগুণ বেড়ে যাবে। নিজস্ব দাসদাসীও মিলবে। এই বিপুল অর্থের লোভে হারেমের ভেতর রীতিমত এক শিশু পাচার চক্র গজিয়ে ওঠে। খোজাদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে অনেক নারী নিজেদের গর্ভবতী বলে রটিয়ে দিতেন। তারপর মাসের পর মাস পেটে কাপড় বেঁধে নবাবের চোখে ধুলো দেওয়া হতো। প্রসবের সময় ঘনিয়ে এলে হারেমের খোজা রক্ষীদের সাহায্যে স্থানীয় বস্তি থেকে সদ্যোজাত শিশু কিনে আনাত।
রাতের অন্ধকারে সেই শিশু পাচার হয়ে যেত হারেমের ভেতর। নবাবের পক্ষে এত নারীর খোঁজ ব্যক্তিগতভাবে রাখা কোনওভাবেই সম্ভব ছিল না। ফলে বছরের পর বছর এই দুর্নীতি অবাধে চলেছে।
মেটিয়াবুরুজের এই অবাধ দুর্নীতি আর কেচ্ছার খবর ব্রিটিশদের কাছে অজানা ছিল না। বরং তারা সচেতনভাবেই এই সুযোগ কাজে লাগিয়েছিল। ব্রিটিশ গোয়েন্দা বিভাগ হারেমের বেশ কিছু দাসী এবং খোজাকে টাকার লোভ দেখিয়ে নিজেদের গুপ্তচরবৃত্তির কাজে লাগায়। প্রতিদিন নবাবের হারেমে কে কার সাথে শুচ্ছে বা কে কাকে বিষ দিচ্ছে, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ রিপোর্ট ব্রিটিশ রেসিডেন্টের কাছে পৌঁছাত। রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে এই রিপোর্টগুলো নিয়মিত লন্ডনে পাঠানো হত। এর একটাই উদ্দেশ্য ছিল- ওয়াজেদ আলি শাহকে লম্পট ও অযোগ্য প্রমাণ করে তাঁর রাজ্য দখলের সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়া।
হারেমের ভেতর নিজস্ব জিন্দান বা কারাগার ছিল। কোনও নারী অবৈধ সম্পর্কে ধরা পড়লে তাকে সেখানে দিনের পর দিন অভুক্ত রাখা হত। অনেককে জোর করে তালাক দিয়ে একবস্ত্রে প্রাসাদ থেকে রাস্তায় বের করে দেওয়া হত। বহু নর্তকী এই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে বাঁচতে প্রহরীদের সাথে প্রেমের অভিনয় করে পাঁচিল টপকে পালিয়ে যেতেন। এসব খবর তৎকালীন স্থানীয় সংবাদপত্রে তখন রসালো কেচ্ছা হিসেবে ছাপা হত।
১৮৮৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের মৃত্যু হয়। আর সেই দিনই তাসের ঘরের মত ভেঙে পড়ে মেটিয়াবুরুজের জাঁকজমক। ব্রিটিশ সরকার নবাবের মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পরপরই পুরো এলাকা সিল করে দেয়। বন্ধ হয়ে যায় নবাবের বিপুল ভাতা। উল্লেখ্য তৎকালীন সময়ে ওয়াজেদ আলি শাহ বছরে ১২ লক্ষ টাকা ব্রিটিশদের থেকে ভাতা পেতেন। ফলে নবাবের হারেমের বেগমরা ভালো পরিমাণ অর্থ মাসোহারা পেতেন। ফলে ব্রিটিশের ভাতা বন্ধ হতে একদিন যারা সোনাদানায় মুড়ে থাকতেন, তারা রাতারাতি পথে এসে বসেন।
ব্রিটিশরা যখন নারীদের জন্য ভাতা নির্ধারণের কাজ শুরু করে তখন এক ব্যাপক চাঞ্চল্যকর বিষয় প্রকাশ্যে আসে। প্রায় তিনশো নারী নিজেদের নবাবের বিধবা স্ত্রী বলে দাবি করে বসেন। প্রকাশ্য আদালতে প্রমাণ করতে হয় সত্যিই নবাবের সাথে তাদের মুতাহ বিবাহ হয়েছিল কি না। কে ভুয়ো সন্তান এনেছিল আর কে অন্য পুরুষের সাথে পালিয়েছিল তা কোর্টকাছারিতে এবং খবরের কাগজে সবার সামনে উন্মুক্ত হয়ে যায়। ব্রিটিশ সরকার শেষ পর্যন্ত অনেককে নামমাত্র কিছু টাকা দিয়ে তাড়িয়ে দেয়। মেটিয়াবুরুজের সেই রাজকীয় হারেমের সমাপ্তি ঘটে চরম দারিদ্র্য আর অপমানে। অনেকেই পেটের দায়ে বেশ্যালয়ে নাম লেখাতে বাধ্য হন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
