

শুক্র গিলে ফেলেছিল নিজের উপগ্রহ? ছবি - Google
১৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আকাশে তাকালে পৃথিবীর সঙ্গী চাঁদকে দেখা যায়। কিন্তু পৃথিবীর প্রায় সমান আকার ও গঠনের প্রতিবেশী শুক্রের আকাশে নেই কোনও প্রাকৃতিক উপগ্রহ। কেন? এত দিন পর্যন্ত তার একাধিক সম্ভাব্য ব্যাখ্যা ছিল, শুক্রের কোনও দিন চাঁদ তৈরি হয়নি, অথবা কোনও মহাজাগতিক সংঘর্ষে তার উপগ্রহ ছিটকে গিয়েছে। এ বার নতুন গবেষণা সেই রহস্যের সামনে নিয়ে এল একেবারে অন্য সম্ভাবনা। শুক্রের হয়তো এক সময় চাঁদ ছিল। কিন্তু গ্রহটির অত্যন্ত ধীর ঘূর্ণনের কারণে সেই চাঁদ ধীরে ধীরে শুক্রের দিকেই এগিয়ে এসে শেষ পর্যন্ত গ্রহটির সঙ্গে সংঘর্ষে ধ্বংস হয়ে যায়।
গবেষণাটি করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইডের জ্যোতির্পদার্থবিদ স্টিফেন ক্রেনের নেতৃত্বে এক দল গবেষক। তাঁদের কম্পিউটার মডেল দেখিয়েছে, শুক্রের মতো ধীর গতিতে ঘূর্ণনশীল গ্রহের ক্ষেত্রে জোয়ার-ভাটাজনিত মহাকর্ষীয় প্রভাব একটি উপগ্রহকে বাইরে ঠেলে না দিয়ে উল্টে ধীরে ধীরে গ্রহের দিকে টেনে আনতে পারে। গবেষণাটি The Astrophysical Journal-এ প্রকাশিত হয়েছে।
রহস্যের কেন্দ্রে রয়েছে ‘টিডাল’ বা জোয়ার-ভাটাজনিত বল। পৃথিবী ও চাঁদের মধ্যে এই মহাকর্ষীয় পারস্পরিক ক্রিয়া চাঁদের কক্ষপথকে প্রতি বছর সামান্য করে বাইরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থাৎ পৃথিবীর চাঁদ ধীরে ধীরে আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।
শুক্রের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ আলাদা হতে পারে। শুক্র নিজের অক্ষের চার দিকে এক বার ঘুরতে সময় নেয় প্রায় 243 পৃথিবী-দিন। অর্থাৎ গ্রহটির ঘূর্ণন অত্যন্ত ধীর। গবেষকদের মডেল অনুযায়ী, এই ধীর ঘূর্ণনের কারণে শুক্রের চার পাশে থাকা কোনও উপগ্রহের কক্ষপথে জোয়ার-ভাটার শক্তি এমন ভাবে কাজ করতে পারে যে উপগ্রহটি ক্রমশ গ্রহের কাছাকাছি চলে আসে। শেষে গ্রহের মহাকর্ষীয় প্রভাব এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে যে উপগ্রহটি শুক্রের দিকে সর্পিল পথে এগিয়ে এসে ধ্বংস হয়।
শুক্রের কোনও উপগ্রহ নেই, এই তথ্য নতুন নয়। কিন্তু সেই উপগ্রহ আদৌ কোনও দিন তৈরি হয়েছিল কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
একটি সম্ভাবনা ছিল, পৃথিবীর মতো শুক্রের চারপাশে কখনও বড় উপগ্রহ তৈরি হয়নি। আর একটি সম্ভাবনা ছিল, প্রাচীন কোনও ভয়াবহ সংঘর্ষে উপগ্রহ তৈরি হলেও পরে অন্য কোনও মহাজাগতিক ঘটনায় সেটি হারিয়ে যায়।
নতুন গবেষণার বক্তব্য আলাদা। গবেষকদের কম্পিউটার সিমুলেশনে দেখা গিয়েছে, নির্দিষ্ট প্রাথমিক পরিস্থিতিতে একটি চাঁদ তৈরি হওয়ার পরেও তাকে টিকিয়ে রাখার মতো পরিবেশ শুক্রের ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। বরং গ্রহটির ঘূর্ণন ও উপগ্রহের মহাকর্ষীয় পারস্পরিক ক্রিয়া শেষ পর্যন্ত উপগ্রহটির পতনের পথ তৈরি করতে পারে।
গবেষণার আরও চমকপ্রদ দিক হল, উপগ্রহের আকারও তার পরিণতিকে প্রভাবিত করতে পারে। মডেল অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে তুলনামূলক বড় উপগ্রহ শুক্রের ঘূর্ণনকে আরও দ্রুত ধীর করে দিতে পারে। আর সেই পরিবর্তন উপগ্রহটির ভিতরের দিকে সরে যাওয়ার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করতে পারে। অর্থাৎ এক সময় শুক্রের চারপাশে চাঁদ থাকলেও সেটি পৃথিবীর চাঁদের মতো কোটি কোটি বছর ধরে কক্ষপথে টিকে থাকেনি, এমন একটি সম্ভাবনাই উঠে আসছে।
এখানে অবশ্য সতর্ক থাকা জরুরি। বিজ্ঞানীরা শুক্রের পৃষ্ঠে এমন কোনও সরাসরি প্রমাণ এখনও পাননি যে সেখানে এক সময় পৃথিবীর চাঁদের মতো একটি উপগ্রহ ছিল এবং পরে সেটি শুক্রের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে নিশ্চিহ্ন হয়েছে।
এটি মূলত কম্পিউটার মডেল ও জোয়ার-ভাটাজনিত বিবর্তনের হিসাবের উপর তৈরি একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। গবেষণার ফলাফল দেখাচ্ছে যে শুক্রের বর্তমান ‘চাঁদহীন’ অবস্থায় পৌঁছনোর জন্য অতিরিক্ত কোনও বিশাল ধ্বংসাত্মক সংঘর্ষ অবশ্যই প্রয়োজন ছিল—এমনটা ধরে নেওয়া জরুরি নয়। নির্দিষ্ট প্রাথমিক পরিস্থিতিতে জোয়ার-ভাটার প্রভাবই উপগ্রহটিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
আরও একটি রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে এই প্রশ্ন। শুক্রের বর্তমান ঘূর্ণন গতি কী ভাবে তৈরি হল, তা নিয়েও বিজ্ঞানীদের গবেষণা চলছে। নতুন মডেল অনুযায়ী, শুক্রের প্রাথমিক ঘূর্ণন, সম্ভাব্য সংঘর্ষ এবং তার পরে জোয়ার-ভাটাজনিত বিবর্তন- সবকিছুর মধ্যে একটি যোগসূত্র থাকতে পারে।
গবেষকদের হিসাব বলছে, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে একটি উপগ্রহ হারানোর পাশাপাশি শুক্রের বর্তমান ধীর ঘূর্ণনও তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ ‘চাঁদ কোথায় গেল?’ এবং ‘শুক্র এত ধীরে ঘোরে কেন?’—দুটি প্রশ্নের উত্তর একই বিবর্তনীয় ইতিহাসের মধ্যে লুকিয়ে থাকতে পারে।
আকার ও গঠনের দিক থেকে শুক্রকে অনেক সময় পৃথিবীর ‘যমজ’ বলা হয়। কিন্তু দুই গ্রহের বিবর্তনের পথ যে কতটা আলাদা হতে পারে, চাঁদের এই রহস্য তারই উদাহরণ।
পৃথিবীর চাঁদ আজও স্থিতিশীল কক্ষপথে রয়েছে এবং ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। শুক্রের সম্ভাব্য চাঁদের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটতে পারে, বাইরে না গিয়ে ভিতরে, দূরে না সরে কাছে, শেষ পর্যন্ত গ্রহের মধ্যেই হারিয়ে যাওয়া।
এই পার্থক্য দেখাচ্ছে, কোনও গ্রহের উপগ্রহ তৈরি হলেই যে তা চিরকাল তার পাশে থাকবে, এমন কোনও নিশ্চয়তা নেই। গ্রহের ঘূর্ণন, উপগ্রহের ভর, কক্ষপথ এবং জোয়ার-ভাটার পারস্পরিক প্রভাব তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে।
শুক্র নিয়ে আগামী দিনের মহাকাশ গবেষণায় তাই এই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে, গ্রহটির অতীত কি তার বর্তমান চেহারার মধ্যেই কোনও চিহ্ন রেখে গিয়েছে?
ভবিষ্যতের শুক্র অভিযানগুলি গ্রহটির ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস, বায়ুমণ্ডল ও পৃষ্ঠের গঠন সম্পর্কে আরও তথ্য দেবে। সেই তথ্যের সঙ্গে নতুন মডেল মিলিয়ে দেখা গেলে বোঝা যেতে পারে, শুক্র সত্যিই কোনও সময় উপগ্রহ ধারণ করেছিল কি না। অর্থাৎ আপাতত চূড়ান্ত উত্তর নয়, বরং একটি নতুন দরজা খুলল গবেষণায়। চাঁদহীন শুক্র হয়তো কোনও দিন চাঁদহীন ছিলই না, তার সঙ্গী ছিল, কিন্তু নিজের ধীর ঘূর্ণনের টানে সেই সঙ্গীকেই এক সময় হারিয়ে ফেলেছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
