

টাটার হাতেই ভাঙবে 'টাটা'? ছবি - Google
১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
মুম্বাইয়ের বম্বে হাউসের চার দেওয়ালের মধ্যে যে এত বড় মাপের একটি ভূমিকম্প হতে পারে, তা ভারতীয় কর্পোরেট দুনিয়া দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। ঠিক একদিন আগে অর্থাৎ ১৭ সেপ্টেম্বর টাটা সন্সের বোর্ড মিটিং ছিল সেই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল। গতকালের ওই বোর্ড মিটিংয়ের পর থেকে দেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী ও মজবুত শিল্পগোষ্ঠীটি মতাদর্শ, উত্তরাধিকার এবং আধুনিক কর্পোরেট বাধ্যবাধকতার মধ্যে এক চূড়ান্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। রতন টাটা পরবর্তী টাটা সাম্রাজ্যের ভাগ্য জুড়ে এখন সঙ্কটের কালো ছায়া।
কর্পোরেট বোর্ডরুমের এই সংঘাতের একদিকে আছেন রতন টাটার উত্তরসূরি ও তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই তথা টাটা ট্রাস্টের বর্তমান চেয়ারম্যান নোয়েল টাটা। অন্যদিকে টাটা সন্সের এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান এন চন্দ্রশেখরন। ওই বোর্ড মিটিংয়ে আগামী পাঁচ বছরের জন্য চন্দ্রশেখরনকে টাটা সন্সের চেয়ারম্যান পদে পুনর্নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সিদ্ধান্ত হয়েছে, রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার নির্দেশ মেনে টাটা সন্সকে শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত করা হবে, অর্থাৎ আইপিও আনবে টাটা সন্স। কিন্তু এই দুটি সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে নোয়েল টাটার স্পষ্ট ঘোষণা, পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ বেআইনি।
পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে অনেকেই অশনি সঙ্কেত দেখতে পাচ্ছেন। কর্পোরেট বিশেষজ্ঞদের অনেকের আশঙ্কা, নজিরবিহীনভাবে নোয়েল টাটা এরপর নিজের ভেটো পাওয়ার প্রয়োগ করে চন্দ্রশেখরনের টাটা সন্সে ডিরেক্টর পদে পুনর্নির্বাচিত হওয়া আটকে দিতে পারেন। তাঁর হাতে এর জন্য পর্যাপ্তের থেকেও বেশি শেয়ার আছে। কিন্তু তা যদি হয় গোটা গোষ্ঠীর ভাবমূর্তি নিয়েই প্রশ্নচিহ্ন দেখা দেবে।
কিন্তু যে টাটাদের ভারতীয় কর্পোরেট জগতে আদর্শ বলে মনে করা হয়, তাদের 'বাড়ির ভেতর'-এর এই তীব্র সংঘাতের শিকড় কোথায় লুকিয়ে?
এই বিবাদের মূল কারণ বুঝতে গেলে টাটা গোষ্ঠীর জন্মলগ্ন এবং তাদের পার্সি ধর্মবিশ্বাসের দিকে ফিরে তাকাতে হবে। জরাথুস্ট্রীয় বা পার্সি দর্শনের মূল মন্ত্র হল- 'হুমাথা, হুখথা, হভার্শতা'। অর্থাৎ সৎ চিন্তা, সৎ বাক্য এবং সৎ কর্ম। জামশেদজি টাটা ঠিক এই দর্শনের উপর ভিত্তি করেই তাঁর সাম্রাজ্য গড়েছিলেন। পার্সি ধর্মে বিশ্বাস করা হয় যে সম্পদ তৈরি করা পুণ্যের কাজ, কিন্তু সেই সম্পদ নিজের কাছে কুক্ষিগত করে রাখা ঘোর পাপ। অর্জিত সম্পদ সমাজের কল্যাণে ব্যয় করতে হবে।
রতন টাটার সময়কাল পর্যন্ত সমগ্র টাটা গোষ্ঠীতে মোটের উপর এই মতাদর্শ নিঁখুতভাবে বজায় ছিল। ব্যবসার মূল লক্ষ্য ছিল দেশ গঠন এবং জনকল্যাণ। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি বদলেছে। এন চন্দ্রশেখরন একজন আদ্যোপান্ত পেশাদার কর্পোরেট ব্যক্তিত্ব। তিনি চাইছেন টাটা গোষ্ঠীকে একুশ শতকের প্রযুক্তি ও প্রতিযোগিতার উপযুক্ত করে তুলতে। অন্যদিকে নোয়েল টাটা মনে করেন, আগ্রাসীভাবে কর্পোরেট ইঁদুর দৌড়ে নামতে গিয়ে টাটারা তাদের সেই আদি জনহিতকর আদর্শ থেকে সরে যাচ্ছে। এর ফলে টাটা ট্রাস্টের মাধ্যমে বছরভর যে বিপুল পরিমাণ জনহিতকর কাজকর্ম করা হয় সেগুলো থমকে যাবে বা ব্যাঘাতপ্রাপ্ত হবে বলে নোয়েল টাটার আশঙ্কা। একই সঙ্গে চন্দ্রশেখরনের নেতৃত্বদান নিয়েও তিনি মৌলিক কতগুলো প্রশ্ন তুলেছেন। এর কারণ হল- এয়ার ইন্ডিয়া, টাটা ডিজিটালের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায় গোষ্ঠীর ক্রমাগত বিপুল লোকসান হয়ে চলা।
পুরো বিবাদটি আরও জটিল হয়ে উঠেছে টাটাদের ইকোসিস্টেমের গঠন প্রকৃতির কারণে। পুরো গোষ্ঠীটি মূলত তিনটি স্তরে বিভক্ত। সবার ওপরে রয়েছে 'টাটা ট্রাস্ট'। যে টি এ যাবৎকাল পর্যন্ত টাটাদের তৈরি বিভিন্ন সমাজ সেবামূলক ট্রাস্টের একটি সমষ্টি। তাদের হাতে আছে টাটা সন্সের ৬৬.৪ শতাংশ শেয়ার বা মালিকানা। এরা ব্যবসা চালায় না, এদের কাজ সমাজসেবা। ঠিক এর নিচেই রয়েছে 'টাটা সন্স', যারা হল মূল হোল্ডিং কোম্পানি বা মস্তিষ্কের মতো। এদের এক অর্থে টাটা গোষ্ঠীর ব্যবসাগুলোর মূল বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তা বলা যেতে পারে। আর একেবারে নিচে রয়েছে টিসিএস, টাটা মোটরস, টাটা স্টিল, টাটা কেমিক্যালস, টাটা ডিজিটালের মতো প্রায় ৩০টিরও বেশি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা অপারেটিং কোম্পানি।
এই অপারেটিং কোম্পানিগুলোর একটা বড় অংশ বিভিন্ন দেশের শেয়ার বাজারের নথিভুক্ত। তারা যে লাভ করে, তার একটা অংশ ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ হিসেবে যায় টাটা সন্সের কাছে। টাটা সন্স আবার সেই টাকার বড় অংশ লভ্যাংশ হিসেবে তুলে দেয় টাটা ট্রাস্টের হাতে। সেই টাকা দিয়েই চলে ট্রাস্টের যাবতীয় জনকল্যাণমূলক কাজ।
নোয়েল টাটা বর্তমানে টাটা ট্রাস্টের চেয়ারম্যান। অর্থাৎ খাতায় কলমে তিনিই এখন টাটা সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। রতন টাটার জীবদ্দশায় নোয়েল বরাবরই তাঁর বিশাল ছায়ার আড়ালে ছিলেন। রতন টাটা ও নোয়েল সম্পর্কে বৈমাত্রেয় ভাই হলেও তাঁদের মধ্যে কখনও খুব একটা ঘনিষ্ঠতা ছিল না। তবে সম্মানজনক সম্পর্ক বরাবরই বজায় ছিল। কিন্তু রতন টাটার প্রয়াণের পর নোয়েল ট্রাস্টের রাশ নিজের হাতে নেওয়ার পর থেকেই কর্তৃত্ব প্রমাণের তাগিদ এবং ট্রাস্টের হারানো ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন বলে কর্পোরেট মহলের একাংশের অভিমত। যা এই সংঘাতকে আরও প্রকট করে তুলেছে। অপরদিকে রতন টাটা অনেক বেশি সকলকে নিয়ে কাজ করতেন বলে তাঁর ঘনিষ্ঠদের দাবি। অবশ্য রতন টাটার ব্যক্তিত্ব, তাঁর নিজস্ব ক্যারিশমার ব্যপ্তী এতটাই বেশি ছিল যে সরাসরি তাঁর বিরোধিতা করার ক্ষমতা খুব কমজনেরই ছিল।
নোয়েল টাটার আপত্তির সবচেয়ে বড় কারণ হল, চন্দ্রশেখরনের নেতৃত্বাধীন টাটা গোষ্ঠীর নতুন ব্যবসাগুলোর বিপুল আর্থিক ক্ষতি। এই মুহূর্তে এয়ার ইন্ডিয়ার লোকসান ২০,০০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মূল কারণ, নতুন বিমান কেনায় বিপুল বিনিয়োগ এবং পরিষেবা আধুনিকীকরণের পেছনে বিপুল খরচ। পিছিয়ে নেই টাটা ডিজিটালও। বিগবাস্কেট বা টাটা নিউ অ্যাপের মতো উদ্যোগগুলো ৫,০০০ কোটি টাকার বেশি লোকসানের মুখে দাঁড়িয়ে। পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর ব্যবসায় টাটা ইলেকট্রনিক্সের প্রাথমিক বিনিয়োগের কারণেও বড় আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে।
যদিও এই প্রসঙ্গে টাটা সন্সের বর্তমান চেয়ারম্যান, এন চন্দ্রশেখরনের যুক্তি- ভবিষ্যতের বাজার ধরতে গেলে এখন এই ক্যাশ বার্ন বা লোকসান মেনে নিয়েই বিনিয়োগ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এগুলোই টাটাদের ভবিষ্যৎ হবে। কিন্তু নোয়েল টাটা বছর বছর এই বিপুল ক্ষতির বহর দেখে রীতিমতো আতঙ্কিত। এই ক্ষতির পিছনে চন্দ্রশেখরানের নেতৃত্বে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে খামতির দিকে তিনি আঙুল তুলছেন। কেন এয়ার ইন্ডিয়া কেনার এতগুলো বছর পরেও ধারাবাহিকভাবে উন্নত মানের পরিষেবা দেওয়া যাচ্ছে না, কেন টাটা ডিজিটালের নেতৃত্বে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে এবং উদ্ভাবনী প্রোডাক্ট টাটা ডিজিটালের মতো সংস্থায় সেভাবে আসছে না তা নিয়ে তিনি গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর আশঙ্কা, ব্যবসার একটা বড় অংশের ধারাবাহিক লোকশানের মুখে টাটা সন্স যদি শেয়ার বাজারে চলে আসে, তবে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা এই বিপুল লোকসান মেনে নেবে না। তখন বাধ্য হয়ে টাটা সন্সকে তাদের ডিভিডেন্ড দেওয়া কমাতে হবে। আর ডিভিডেন্ড কমলে টাটা ট্রাস্টের সমাজসেবামূলক কাজগুলো অর্থের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়বে।
টাটা সন্সের দ্বিতীয় বৃহত্তম শেয়ার হোল্ডার হল শাপুরজি পালোনজি বা এসপি গ্রুপ। তাদের হাতে টাটা সন্সের
১৮.৩৭ শতাংশ শেয়ার রয়েছে। এদিকে নোয়েল টাটা নিজে বিয়ে করেছেন এই এসপি গ্রুপের প্রাণপুরুষ শাপুরজি মিস্ত্রির মেয়ে তথা প্রয়াত সাইরাস মিস্ত্রির বোন আলু মিস্ত্রিকে। অর্থাৎ শাপুরজি পালোনজিরা নোয়েল টাটার শ্বশুরবাড়ি। পারিবারিক দিক থেকে পরম আত্মীয় হলেও ব্যবসায়িক অবস্থান তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে বর্তমানে অবস্থান করছেন। অবশ্য এই প্রশ্নে দাদা রতন টাটার সঙ্গে নোয়েল টাটার পদক্ষেপের সম্পূর্ণ মিল আছে। কারণ টাটা সন্সের আইপিও আনার ঘোর বিরোধী ছিলেন রতন টাটা। এই নিয়ে তাঁর সঙ্গেও এসপি গ্রুপের দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিন ধরে চলছিল।
এদিকে এসপি গ্রুপ বর্তমানে চরম আর্থিক সঙ্কটে রয়েছে। নিজেদের স্বার্থেই তারা চাইছে টাটা সন্সের আইপিও আসুক। আইপিও এলে টাটা সন্সে তাদের থাকা শেয়ার বিক্রি করে বিপুল টাকা ঘরে তুলতে পারবে এবং তা দিয়ে ঋণমুক্ত হবে। কিন্তু ট্রাস্টের আদর্শ বাঁচাতে গিয়ে নোয়েল টাটা নিজের আত্মীয়দের সেই বিপুল আর্থিক লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন।
তবে শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত হওয়ার নীতিগত প্রশ্নে এন চন্দ্রশেখরানকে সরাসরি কাঠগড়ায় তোলার উপায় নেই। কারণ তিনি কার্যত বাধ্য হয়েই এই পথ অবলম্বন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এর পেছনে রয়েছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কড়া নির্দেশ। আরবিআই টাটা সন্সকে সেই ২০২৩ সালেই 'আপার-লেয়ার এনবিএফসি' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। নিয়ম অনুযায়ী এই তালিকায় থাকলে তিন বছরের মধ্যে শেয়ার বাজারে নথিভুক্ত হতেই হবে অর্থাৎ আইপিও আনতে হবে।
এই ফাঁদ থেকে বাঁচতে টাটা সন্স এক অভূতপূর্ব কৌশল নিয়েছিল। তারা বাজার থেকে নেওয়া তাদের প্রায় ২১,০০০ কোটি টাকার সমস্ত ঋণ এক ধাক্কায় মিটিয়ে দেয়। এই প্রশ্নে এন চন্দ্রশেখরায়ন এবং নোয়েলটা টাটা একই বিন্দুতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সবাই ভেবেছিল, বাজারে যেহেতু তাদের আর কোনও দেনা নেই, তাই আরবিআই তাদের এনবিএফসি তালিকা থেকে বাদ দিয়ে দেবে। কারণ তাদের দ্বারা ভারতীয় বাজার বা সাধারণ ঋণদাতা, কারোরই ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আর কোনও সম্ভাবনা থাকছে না। তাই এই ঋণ পরিশোধের পর টাটা সন্সের পক্ষ থেকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কাছে আবেদন জানিয়ে তাদের এনবিএফসি লাইসেন্স বাতিল করার কথা বলা হয়।
কিন্তু দীর্ঘ এক বছর সেই আবেদন ঝুলিয়ে রাখার পর গত ১১ সেপ্টেম্বর আরবিআই তা সরাসরি খারিজ করে দেয়। আরবিআই জানিয়ে দেয়, টাটা সন্সের নিজস্ব সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে ২ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি সম্পদশালী যে কোনও সংস্থাকে শেয়ারবাজারে নথিভুক্ত হতে হবে। সেই নিয়মের কারণে টাটা সন্সকেও শেয়ার বাজারে আসতেই হবে।
আরবিআই-এর এই ধাক্কার কারণেই ১৭ সেপ্টেম্বরের বোর্ড মিটিংয়ে চন্দ্রশেখরন এবং অন্য ডিরেক্টররা আইপিও-র পক্ষে ভোট দেন।
আইপিও ঠেকাতে নোয়েল টাটার ঘনিষ্ঠ মহল থেকে এখন এক মারাত্মক পরিকল্পনার কথা শোনা যাচ্ছে। তাঁরা চাইছেন, টাটা সন্সকে ভেঙে দুটি আলাদা কোম্পানিতে পরিণত করতে। যাতে একটি সংস্থায় সম্পদের পরিমাণ কমে যায় এবং আরবিআই-এর নিয়মের বাইরে বেরিয়ে আসা যায়।
যদি সত্যিই এমনটা হয়, তবে তা টাটা গোষ্ঠীর পাশাপাশি ভারতীয় শিল্পক্ষেত্রের জন্য একটি বিপর্যয় ডেকে আনবে। দীর্ঘ দেড়শো বছরের 'ওয়ান টাটা' কাঠামো চিরতরে ধ্বংস হয়ে যাবে। পাশাপাশি এই ধরনের পদক্ষেপ নিলে দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে টাটাদের স্বচ্ছ ভাবমূর্তি বড়সড় ধাক্কা খাবে। সবাই মনে করবে যে শুধুমাত্র নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতেই টাটারা এমন একটি হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেইসঙ্গে যে অতীত আদর্শের কথা বলে নোয়েল টাটা এই লড়াই লড়ছেন, সেই অতীত আদর্শের মূলেও কুঠারাঘাত করা হবে।
একই সঙ্গে টাটা সংস কে ভেঙে দিয়ে শেয়ারবাজার নথিভুক্ত হওয়া থেকে টাটারা যদি বেঁচে যায় সে ক্ষেত্রে তা ভারতীয় শিল্পক্ষেত্রের জন্য একটি নেতিবাচক নজির হয়ে থাকবে। ভবিষ্যতে অন্যরাও একই পথ অনুসরণ করতে পারে। তাছাড়া টাটা সন্সকে দুটো ভাগে ভাঙা মানে সাপুরজি পালোনজি গোষ্ঠীর সঙ্গে আরও একটি আইনি লড়াই শুরু হওয়া। কারণ কোন জটিল সমীকরণে তাদের শেয়ার বিভাজন হবে তা নিয়ে নিশ্চয়ই সাপুরজি পালোনজি গোষ্ঠী আদালতের দারস্ত হবে। পাশাপাশি টাকা গোষ্ঠীর মূল অপারেটিং কোম্পানিগুলোর মধ্যেও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে। তাদের শেয়ার দরে এর প্রভাবে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় পতন ঘটতে পারে।
এই জটিল আবর্ত থেকে বেরিয়ে আসার কি কোনও পথ নেই? অবশ্যই আছে। নোয়েল টাটাকে বুঝতে হবে যে তিনি যদি রতন টাটার জুতোয় পা গলাতে চান, তবে শুধু ট্রাস্টের ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকলেই চলবে না। রতন টাটার মতো এক অবিসংবাদিত ক্যারিশমা এবং সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে চলার ক্ষমতাও থাকতে হবে।
সমস্যা সমাধানের জন্য নোয়েল টাটা একটি মধ্যপন্থা নিতে পারেন-
প্রথমত, সংঘাত এড়িয়ে তিনি একটি 'নিয়ন্ত্রিত আইপিও' বা কন্ট্রোলড আইপিও-র পথে হাঁটতে পারেন। এর অর্থ হল- কোম্পানির খুব সামান্য অংশ (যেমন ৫ থেকে ১০ শতাংশ) শেয়ার বাজারে ছাড়া হবে। এতে আরবিআই খুশি হবে, আবার ট্রাস্টের হাতে সিংহভাগ মালিকানা থাকায় তাদের ক্ষমতাও অটুট থাকবে।
দ্বিতীয়ত, তিনি আইপিও আনার আগে একটি 'ডিভিডেন্ড প্রোটেকশন এগ্রিমেন্ট' বা লভ্যাংশ সুরক্ষা চুক্তি করে নিতে পারেন। সেখানে পরিষ্কার বলা থাকবে- কোম্পানির লাভের একটি নির্দিষ্ট অংশ ট্রাস্টকে প্রতিবছর দিতেই হবে। এতে ট্রাস্টের সমাজসেবার কাজে কোনও ব্যাঘাত ঘটবে না।
সবশেষে, চন্দ্রশেখরনকে সরিয়ে দেওয়ার মতো কোনও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত নেওয়া তাঁর মোটেও উচিত হবে না। বরং তাঁর সঙ্গে একটি কৌশলগত সন্ধি করা প্রয়োজন। চন্দ্রশেখরনকে লোকসানে চলা কোম্পানিগুলো লাভে ফেরানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া যেতে পারে। যেমন বলতে পারেন, আগামী ৩ বছরের মধ্যে এয়ার ইন্ডিয়া, টাটা ডিজিটাল সহ সবকটি লোকসানে চলা কোম্পানিকে লাভের পথে ফেরাতে হবে। তা যদি সম্ভব না হয় সে ক্ষেত্রে তিনি তাঁর ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে তিন বছর পর গোষ্ঠীর আগ্রাসি বিনিয়োগের পথ আটকে দেবেন।
নোয়েল টাটা যদি এই কর্পোরেট কূটনীতির পথে হাঁটেন, তবে তিনি শুধু নিজের ভাবমূর্তিই উজ্জ্বল করবেন না, বরং শাপুরজি পালোনজি গ্রুপের সঙ্গে দীর্ঘদিনের তিক্ততাও মেটাতে পারবেন। এমনিতেই শাপুরজিরা টাটা সন্স থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজেদের ব্যবসায় ফোকাস করতে চায়। অপরদিকে দ্বিতীয় বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার হিসেবে টাটা সন্সে শাপুরজিদের উপস্থিতি নোয়েল টাটার গলার কাঁটা স্বরূপ। যা তাঁর উত্থানের পথ কিছুটা হলেও আটকে দেয়। ফলে এক চালে সেই সমস্যাও তিনি মিটিয়ে ফেলতে পারবেন। সেটসেটা ভবিষ্যতে টাটা সন্সের চেয়ারম্যান হওয়ার পথে তাঁকে এগিয়ে দিতে পারে।
নোয়েল টাটা এবং এন চন্দ্রশেখরন, দু'জনকেই একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, টাটা গোষ্ঠীর ব্যবসায়িক স্বার্থের সঙ্গে ভারতীয় শিল্প জগতের সম্পর্ক আছে ঠিকই। কিন্তু দেশের এটাই একমাত্র বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যার সঙ্গে সাধারণ ভারতীয়দের আবেগ ও আস্থা জড়িয়ে আছে। তাই টাটা গোষ্ঠীতে সবকিছুই যদি ওলোটপালট হয়ে যায়, তবে আম ভারতীয়রা সেটা ভালোভাবে নেবে না।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
