১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
পান্থশালা থেকে আজকের রেস্তোরাঁ, বাংলার বিবর্তনের যাত্রাপথ

বাংলার খাবার ঠিকানার বিবর্তনের যাত্রাপথের প্রতীকী ছবি - AI

পান্থশালা থেকে আজকের রেস্তোরাঁ, বাংলার বিবর্তনের যাত্রাপথ

calender icon 2 ১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মূল বিষয়

সপ্তাহান্তে একাংশের বাঙালির পরিবার নিয়ে বা বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আনন্দের অন্যতম জায়গা হয়ে উঠেছে হয় কোন‌ও রেস্তোরাঁ, না হয় ক্যাফে। বাঙালি মানেই পেট পুজো। অথচ প্রাচীন যুগে অর্থের বিনিময়ে তৈরি খাবার বিক্রি করাকে এই বাংলাতেই অত্যন্ত নিচু নজরের কাজ বলে মনে করা হত। নিজের বাড়ির রান্না করা খাবার ছাড়া বাইরের কোনও খাবার মুখে তোলা তৎকালীন সমাজে প্রায় অকল্পনীয় ছিল।

এখানেই প্রশ্ন উঠতে পারে, তবে অখণ্ড বাংলার বুকে এই বাইরে খাওয়ার চল ঠিক কবে এবং কীভাবে শুরু হল? আসুন, আজ বাঙালির সেই যাত্রাপথের দিকে একটু নজর দেওয়া যাক।

চটি ও পান্থশালা

বাইরে তৈরি খাবার কিনে খাওয়ার ক্ষেত্রে বাঙালির প্রথম ইতিহাস বর্ণিত নিদর্শন মেলে প্রাচীন ও মধ্যযুগে। তখন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল নদীপথ এবং গুটিকয়েক দুর্গম সড়ক। ব্যবসা বাণিজ্য, তীর্থযাত্রা বা সামরিক প্রয়োজনে মানুষকে মাসের পর মাস পথেই কাটাতে হত। এই পথশ্রান্ত বণিক বা তীর্থযাত্রীদের আশ্রয়ের জন্যই প্রাচীন সপ্তগ্রাম থেকে গৌড় যাওয়ার নদীপথের ধারে কিংবা ষোড়শ শতকে সুলতান শের শাহ সুরির তৈরি গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের মোড়ে মোড়ে গড়ে উঠেছিল পান্থশালা বা চটি।

কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীমঙ্গল কাব্যে বণিক ধনপতির যাত্রাপথে এমন চটির উল্লেখ পাওয়া যায়। সেখানে চটিওয়ালারা সামান্য কড়ির বিনিময়ে যাত্রীদের চাল, ডাল, স্থানীয় সবজি এবং নদী থেকে ধরা মাছ রান্না করে দিতেন। তবে এগুলো শৌখিন জায়গা ছিল না। স্রেফ পথচলতি মানুষের পেট ভরানোর তাগিদেই এই চটিগুলোর জন্ম হয়েছিল।

মুঘল সরাইখানা ও ইউরোপীয় কুঠি

প্রাচীনকালের চটি থেকে আজকের আধুনিক রেস্তোরাঁর যাত্রাপথের মাঝে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হল ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যবর্তী সময়। ওই সময়ে বাংলার বুকে একদিকে মুঘল সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটছিল, অন্যদিকে পর্তুগিজ ও ওলন্দাজ বণিকরা বাণিজ্য কুঠি গড়ে তুলছিল।

মুর্শিদাবাদ, ঢাকা বা মালদহের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোতে মধ্য এশিয়া বা পারস্যের বণিকদের জন্য গড়ে ওঠে প্রাতিষ্ঠানিক সরাইখানা। এখানেই প্রথমবার বাংলার বাণিজ্যিক খাদ্যের আসরে প্রবেশ করে রুটি, মাংসের নানা পদ এবং কাবাব। অন্যদিকে হুগলির ব্যান্ডেল বা চুঁচুড়ায় ইউরোপীয় কুঠিগুলোর আশেপাশে বসা বাজারগুলোতে সম্পূর্ণ নতুন এক খাদ্য সংস্কৃতির জন্ম হয়। পর্তুগিজদের হাত ধরে বাংলায় আসে পাউরুটি এবং চিজ। কুঠির আশেপাশের স্থানীয় ময়রা ও কারিগররা পর্তুগিজদের থেকেই বেকিংয়ের কৌশল এবং দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরির পদ্ধতি শেখেন। অষ্টাদশ শতকে সুতানুটি হাটে এই ময়রাদের স্থায়ী দোকানগুলোই হয়ে ওঠে বাঙালিদের জন্য প্রথম সুসংগঠিত বাইরের খাবারের ঠিকানা।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, এর আগে বাঙালির মিষ্টিতে ছানার ব্যবহার ছিল না। কারণ দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরিকে অশুভ বলে মনে করা হত। পর্তুগিজদের হাত ধরেই প্রথম ছানার প্রচলন বাঙালির মধ্যে শুরু হয়। দ্রুত তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

সাহেবদের ট্যাভার্ন

আরও পড়ুন
ওল্ড মঙ্ক কি আদৌ রাম নয়?
অওধের দরবার থেকে পাড়ার মোড়ের লাল শালু- বিরিয়ানির বিবর্তন
পাল যুগ থেকে ঔপনিবেশিক বাংলায় বিয়ের ভোজের বিবর্তন

পলাশীর যুদ্ধের পর কলকাতায় ব্রিটিশ শাসন পাকাপোক্ত হলে ইউরোপীয়দের আনাগোনা বাংলার বুকে আর‌ও বেড়ে যায়। তীব্র মশলাযুক্ত এ দেশীয় খাবার তাদের হজম হত না। ফলে সাহেবদের নিজস্ব আড্ডা এবং বিনোদনের জন্যই ১৭৮০ এর দশকে লালবাজার ও ডালহৌসি চত্বরে গড়ে ওঠে ট্যাভার্ন।

হারমোনিক ট্যাভার্ন, লন্ডন ট্যাভার্ন এবং লে গালেস ট্যাভার্ন ছিল সেই সময়ের বিখ্যাত সব নাম। এগুলো ছিল মূলত ইউরোপীয়দের একচেটিয়া জায়গা। এখানে টিকিটের বিনিময়ে নাচগান, বলরুম ডান্স এবং বিলিতি খানা পিনার এলাহি ব্যবস্থা থাকত।

হোটেল ও বেকারির যুগ

উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বাংলায় অভিজাত ইউরোপীয়দের আনাগোনা বাড়তে থাকে। তাদের কাছে ট্যাভার্নের অপরিসর জায়গা মোটেও রুচিসম্মত ছিল না। আরও পরিষ্কার ও বিলাসবহুল ডাইনিংয়ের চাহিদা তৈরি হয়। এই চাহিদার উপর ভিত্তি করেই ১৮৩০ সালে কলকাতায় জন স্পেন্সার তৈরি করেন স্পেন্সারস হোটেল। এটিই ছিল বাংলার বুকে আধুনিক ধাঁচের প্রথম সুসংগঠিত হোটেল।

ঠিক দশ বছর পর ১৮৪০ সালে ডেভিড উইলসন বেন্টিঙ্ক স্ট্রিটে খোলেন অকল্যান্ড হোটেল। পরবর্তীকালে এটিই গ্রেট ইস্টার্ন হোটেল নামে জগদ্বিখ্যাত হয়। এর সঙ্গে যুক্ত বিশাল বেকারি থেকে বাণিজ্যিকভাবে পাঁউরুটি এবং পেস্ট্রি বিক্রি শুরু হয়। সাহেবদের পাশাপাশি কলকাতার নব্য ধনী বাবুরাও এখানে যাতায়াত শুরু করেন।

পাইস হোটেলের যুগ

বিংশ শতকের গোড়ার দিক থেকে গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষ, কেরানি এবং ছাত্ররা পালে পালে জীবিকা ও পড়াশোনার কারণে কলকাতায় আসতে শুরু করে। সাহেবদের দামী হোটেলে যাওয়ার সামর্থ্য তাদের ছিল না। তারা অনেকে একসঙ্গে মিলে মেসে বসবাস করত। এদের‌ই প্রতিদিনের দু'বেলা সস্তা ও পুষ্টিকর খাবারের চাহিদা থেকেই জন্ম নেয় পাইস হোটেল।

এক পয়সার বিনিময়ে কলাপাতায় ভাত, ডাল ও সবজি পরিবেশন করা হত। মাছ বা মাংসের জন্য আলাদা পয়সা লাগত। ১৯১৫ সালে শ্যামবাজারের তরুণ নিকেতন এবং ১৯২৭ সালে কলেজ স্ট্রিটের স্বাধীন ভারত হিন্দু হোটেল ওই সময়েরই ফসল। খাবারের বাণিজ্যিকীকরণে এটি ছিল বাঙালিদের নিজস্ব উদ্যোগ। এই হোটেলগুলোই প্রথমবার বাংলার সমাজ থেকে একসঙ্গে বসে খাওয়ার ক্ষেত্রে জাতপাতের ছুঁতমার্গ ভাঙতে বড় ভূমিকা নিয়েছিল।

কেবিন কালচার এবং আধুনিক রেস্তোরাঁ

বিশ শতকের গোড়ার দিকে স্বদেশি আন্দোলনের যুগে বাঙালি যুবকদের গোপন রাজনৈতিক আলোচনা এবং আড্ডার জন্য এমন জায়গার দরকার ছিল, যেখানে কিছুটা গোপনীয়তা বজায় থাকে। পর্দাঘেরা ছোট ছোট কক্ষ বা কেবিন এই সমস্যার সমাধান করে। অ্যালেন কিচেন, বসন্ত কেবিন বা দিলখুশা কেবিনের মতো জায়গাগুলো ওই সময়ে কলকাতার বুকে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠে। এখানেই ব্রিটিশদের চপ এবং কাটলেট দেশি মশলার ছোঁয়ায় বাঙালির নিজস্ব ফাস্ট ফুডে পরিণত হয়।

এরপর সময় যত গড়িয়েছে, কলকাতা তত বেশি কসমোপলিটান হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন প্রদেশ ও দেশ থেকে আসা মানুষের হাত ধরে নির্দিষ্ট কুইজিন ভিত্তিক রেস্তোরাঁ গড়ে উঠতে শুরু করে। চিনা অভিবাসীদের হাত ধরে ১৯২২ সালে ইয়াউ চিউ এবং ১৯২৪ সালে নানকিং শহরের বুকে প্রথম পূর্ণাঙ্গ চিনা রেস্তোরাঁ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অন্যদিকে আওয়াধি ঘরানার নবাবদের কারিগরদের হাত ধরে ১৯৪১ সালে পার্ক স্ট্রিটে প্রতিষ্ঠিত হয় সিরাজ গোল্ডেন রেস্তোরাঁ।

পথে বেরিয়ে পেট ভরানো এবং পাশাপাশি জিভের রসনা তৃপ্তির উদ্দেশ্যে এভাবেই ধাপে ধাপে বাংলার বুকে বাইরের খাবারের ঠিকানার ধরন বদলে বদলে গিয়েছে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য