দুধ ফুরোলেই কি ‘মা’ উপাধি বাতিল? ছবি - Google
২৮শে মে, ২০২৬
রাজনীতির অলিন্দে একটা কথা খুব চলে— ক্ষমতার সবচেয়ে বড় জোর হল সে যেকোনো রক্তমাংসের বাস্তবতাকে একটা বিমূর্ত প্রতীকে বদলে দিতে পারে। রাজস্থানের জয়সলমীরের সেই ডাম্পিং ইয়ার্ডের সামনে যখন হাকাম দান দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তাঁর চারপাশের হাওয়া বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল হাজারো গরুর পচা-গলা লাশের দুর্গন্ধে। যে অবলা পশুকে রাজনীতির মঞ্চে ‘মা’ বলে সিংহাসন দখলের লড়াই চলে, আস্তাকুড়ের প্লাস্টিক আর আবর্জনার স্তূপে তাদের এমন হাড়গোড় বেরোনো পরিণতি এক তীব্র তাত্ত্বিক বিরোধাভাসকে সামনে এনে দাঁড় করায়।
এই বাস্তব ঘটনাটি আসলে একটি গভীর রাজনৈতিক অর্থনীতির রূপক, যাকে নরওয়েজিয়ান সমাজবিজ্ঞানী কেনেথ বো নিয়েলসেন 'অথরিটেরিয়ান পপুলিজম অ্যান্ড বোভাইন পলিটিক্যাল ইকোনমি' বা কর্তৃত্ববাদী জনমোহিনী ও গো-রাজনীতির অর্থনীতি বলে ব্যাখ্যা করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, পপুলিস্ট বা জনমোহিনী রাজনীতিতে কোনো একটি প্রতীককে (এক্ষেত্রে গরু) পবিত্র এবং অলঙ্ঘনীয় হিসেবে খাড়া করা হয়, যাতে জনসাধারণের আবেগ বিভক্ত না হয়ে একজায়গায় জড়ো হয়। কিন্তু ট্র্যাজেডি এটাই যে, এই পবিত্রতার বয়ানটি কেবল তখনই সচল থাকে, যতক্ষণ তা ভোটের বাক্সে ডিভিডেন্ড দেয়। যেই মুহূর্তে সেই প্রতীকটি তার উপযোগিতা হারায়— যেমন দুধ দেওয়া বন্ধ করা বুড়ো গরু— অমনি সে তার গুরুত্ব হারায় এবং বাইরে ছিটকে পড়ে।
জয়সলমীরের ঘটনাটি দেখায় যে, কীভাবে এই রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এক ধরণের 'পদ্ধতিগত নিষ্ঠুরতা' লুকিয়ে থাকে। একদিকে গো-রক্ষার নামে স্বঘোষিত পাহারাদারদের দাপট বাড়ে, অন্যদিকে পরিকাঠামোর অভাবে, চরম গরমে জল-খাবারের অভাবে কাতরে মরে পরে থাকে 'গো-মাতা'। ঠিকাদারকে ব্ল্যাকলিস্ট করে বা পুরসভার ফাইল চাপা দিয়ে এই কাঠামোগত ব্যর্থতা ঢাকা যায় না।
তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এটি পুঁজি ও আবেগের এমন এক অদ্ভুত মেলবন্ধন, যেখানে পশুর জীবনের প্রকৃত কোনো মূল্য নেই, মূল্য কেবল তার প্রতীকী সত্তার। জয়সলমীরের ডাম্পিং ইয়ার্ডের সেই মাছি-ভনভন করা কংকালের স্তূপ আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক গাফিলতি নয়; এটি হল সেই রাজনৈতিক 'ফ্যান্টাসির' আসল কঙ্কালসার রূপ, যা মঞ্চের চটকদার বক্তৃতা আর বাস্তবে নির্মম সত্যের মধ্যকার আকাশপাতাল দূরত্বকে আমাদের চোখের সামনে উলঙ্গ করে দেয়। অবলা পশুদের এই নিয়তি মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতার অর্থনীতিতে আবেগ যখন সস্তা পণ্য, তখন তার শেষ পরিণতি এমনই এক ভাগাড়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
লেখকের বিস্তারিত তথ্য শীঘ্রই যোগ করা হবে।