২৯শে জুলাই, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

কন্ডোম: উচ্চারণে লজ্জাই থেকে যাবে?

কন্ডোম: উচ্চারণে লজ্জাই থেকে যাবে?

কন্ডোম উচ্চারণে আমাদের বাধা আছে এই যুগেও। নিজস্ব ছবি - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।

কন্ডোম: উচ্চারণে লজ্জাই থেকে যাবে?

কন্ডোমের বয়স হাজার বছরেরও বেশি। সভ্যতার ইতিহাস বদলেছে, রাজা-সম্রাট হারিয়ে গিয়েছেন, প্রযুক্তি পৌঁছে গিয়েছে মহাকাশে, মহাকাশ ছাড়িয়ে, স্পর্শ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে। কিন্তু আজও আমরা দোকানে গিয়ে কন্ডোম চাইতে অস্বস্তি বোধ করি। অনেকে ফিসফিস করে বলেন, কেউ আবার কাগজে লিখে দেন নাম। প্রশ্ন উঠতেই পারে—যে বস্তুটি অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণ ও যৌনরোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রগুলির একটি, তাকে ঘিরে এত লজ্জা কেন? এর শিকড় অনেক গভীরে।

ইতিহাস

ইতিহাস বলছে, কন্ডোম নতুন কিছু নয়। গবেষকদের মতে, প্রাচীন মিশর, রোম, চীন ও জাপানে বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষামূলক আবরণ ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। কখনও লিনেন কাপড়, কখনও পশুর অন্ত্র বা মূত্রথলি, আবার কোথাও পাতলা চামড়া দিয়ে তৈরি হত এই আবরণ। ষোড়শ শতকে ইতালীয় চিকিৎসক গ্যাব্রিয়েল ফ্যালোপিও প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে কন্ডোমের ব্যবহার বর্ণনা করেন। তখন মূল উদ্দেশ্য ছিল সিফিলিসের মতো যৌনরোগ থেকে সুরক্ষা। কন্ডোমের ইতিহাস যতটা বিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যের, ততটাই সামাজিক সংকোচের। দীর্ঘদিন ধরে যৌনতা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা সমাজে নিষিদ্ধ ছিল। ইউরোপে এক সময় কন্ডোমকে ‘অসচ্চরিত্র’ মানুষের জিনিস বলে দেখা হত। ধর্মীয় ও নৈতিকতার বিতর্কও এর গ্রহণযোগ্যতাকে বাধা দিয়েছে। 

প্রযুক্তির প্রবেশ

ঊনবিংশ শতকে আসে বড় পরিবর্তন। ১৮৪৪ সালে চার্লস গুডইয়ার রাবারের ‘ভালকানাইজেশন’ প্রযুক্তির পেটেন্ট নেন। এর ফলে তৈরি হয় তুলনামূলক সস্তা ও টেকসই রাবারের কন্ডোম। পরে ১৯২০-এর দশকে ল্যাটেক্স কন্ডোম বাজারে আসে, যা আজও বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত। 

ভারতের অবস্থান

ভারতেও চিত্রটা খুব আলাদা নয়। স্কুলে যৌনশিক্ষা এখনও অনেক জায়গায় অপ্রতুল। পরিবারে যৌনতা নিয়ে আলোচনা প্রায় নিষিদ্ধ বিষয়। ফলে যৌনস্বাস্থ্য, গর্ভনিরোধক বা যৌনরোগ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বদলে লজ্জা, গুজব ও ভুল ধারণাই বেশি ছড়ায়। অনেকের কাছে কন্ডোম কেনা মানেই যেন চরিত্রের সার্টিফিকেট দেওয়া।

যৌনতা অশ্লীল

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সমস্যার মূলেই রয়েছে যৌনতাকে ‘অশ্লীল’ বলে দেখার প্রবণতা। অথচ যৌনতা মানুষের স্বাভাবিক জৈবিক চাহিদা। যেমন জ্বর হলে ওষুধ লাগে, তেমনই নিরাপদ যৌনজীবনের জন্য কন্ডোম প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের সমাজে যৌনতা নিয়ে আলোচনা যতটা চাপা, ক্রিকেট বা রাজনীতি নিয়ে ততটাই সরব।

বিরোধাভাসটা আরও স্পষ্ট হয় যখন দেখা যায়, ইন্টারনেট যুগে পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা বেড়েছে, কিন্তু বৈজ্ঞানিক যৌনশিক্ষা এখনও পিছিয়ে। ফলে যৌনতা সম্পর্কে কৌতূহল রয়েছে, জ্ঞান নেই। কন্ডোম সম্পর্কে সচেতনতা রয়েছে, কিন্তু ব্যবহার নিয়ে খোলামেলা আলোচনা নেই।

ভারতের মত দেশে জনসংখ্যা একই সাথে সুবিধা ও সমস্যা। জন্ম নিয়ন্ত্রণ ও মারণ রোগের হাত থেকে বাঁচার যে উপায়, তা আমরা এখন অনেকটাই বুঝেছি, কিন্তু যৌনতার সাথে অশ্লীলতাকে এক করে দেখার যে অন্ধকারাচ্ছন্ন অভ্যাস, তার বীজ রয়ে গেছে আমাদের সংস্কৃতিতে, ব্যবহারে, প্রকাশে, উচ্চারণে।

হাজার বছরের পথচলার পরও তাই কন্ডোমের সবচেয়ে বড় বাধা প্রযুক্তিগত নয়, সামাজিক। দোকানে গিয়ে কন্ডোম চাইতে লজ্জা পাওয়া আসলে কন্ডোমের সমস্যা নয়; তা আমাদের মানসিকতার আয়না। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, যৌনতাকে ট্যাবু আর গোপনীয়তার খাঁচা থেকে বের করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার আলোচনায় না আনলে এই সংকোচ কাটবে না।

প্রশ্নটা তাই কন্ডোম নিয়ে নয়। প্রশ্নটা হলো, একবিংশ শতাব্দীতেও আমরা কি যৌনতা নিয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হতে পেরেছি?

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য