১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
বন্দুক ছেড়ে র‍্যাম্পে মাওনেত্রী

বন্দুক ছেড়ে র‍্যাম্পে

বন্দুক ছেড়ে র‍্যাম্পে মাওনেত্রী

মূল বিষয়

এক সময় রাত নামলেই তাঁদের গন্তব্য ছিল অন্ধকার জঙ্গল। কাঁধে ঝোলানো থাকত বন্দুক! চারপাশে নীরবতা, সামনে অজানা পথ, আর পিছনে থাকত সংঘর্ষের দীর্ঘ ছায়া। আলো থেকে দূরে, স্বাভাবিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন সেই দিনগুলি এখন অতীত। 

সেই একই মহিলারা এ বার দাঁড়ালেন ঝলমলে আলোয়! কাঁধে আর অস্ত্র নেই। গায়ে বস্তারের কোসা সিল্ক! পায়ের নীচে জঙ্গলের এবড়োখেবড়ো মাটি নয়, র‍্যাম্পের মসৃণ মঞ্চ। আর সামনে, হাততালি!

বন্দুক থেকে র‍্যাম্প! জঙ্গল থেকে শহর। আতঙ্ক থেকে আত্মবিশ্বাস! ছত্তীসগঢ়ের রায়পুরে কয়েক মিনিটের এই দৃশ্যই যেন লিখে দিল এক অসম্ভব বদলের গল্প।

দিন বদলের কথা

৭ অগস্ট জাতীয় তাঁত দিবস উপলক্ষে রায়পুরের পণ্ডিত দীনদয়াল উপাধ্যায় অডিটোরিয়ামে আয়োজন করা হয়েছিল একটি স্বদেশি ফ্যাশন শো। সেখানেই র‍্যাম্পে হাঁটলেন বস্তারের পুনর্বাসন কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত একদল প্রাক্তন মহিলা মাওবাদী। পরনে স্থানীয় কোসা সিল্ক ও হাতে বোনা পোশাক। যে মহিলাদের জীবনের একটা সময় কেটেছে সশস্ত্র আন্দোলনের সঙ্গে, তাঁরাই এ দিন হয়ে উঠলেন বস্তারের তাঁত ও সংস্কৃতির মুখ।

দর্শকদের চোখে তখন বিস্ময়। মঞ্চের আলোয় একের পর এক পা ফেলছেন তাঁরা। কিন্তু সেই প্রতিটি পায়ের পিছনে রয়েছে এক একটি দীর্ঘ অতীত।

কারও জীবনে জঙ্গলের রাত। কারও জীবনে পালিয়ে বেড়ানো। কারও জীবনে অস্ত্রের ভার। আর এখন? ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচয় নতুন করে তৈরি করার চেষ্টা!

নেপথ্যের কাহিনী

এই কয়েক মিনিটের র‍্যাম্প ওয়াকের জন্যও অবশ্য তাঁদের প্রস্তুতি নিতে হয়েছে। অনুষ্ঠানের আগে রায়পুরে সপ্তাহব্যাপী প্রশিক্ষণ ও গ্রুমিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। মুম্বই থেকে আসা পেশাদার প্রশিক্ষক তাঁদের শেখান কী ভাবে র‍্যাম্প হাঁটতে হয়, কী ভাবে শরীরী ভাষা নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, কী ভাবে শত শত চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্বাসী থাকতে হয়।

শুরুটা সহজ ছিল না। যাঁরা বছরের পর বছর লোকচক্ষুর আড়ালে থেকেছেন, তাঁদের কাছে এত মানুষের সামনে দাঁড়ানোই ছিল অস্বাভাবিক অভিজ্ঞতা। মাদভি মল্লে জানিয়েছেন, প্রথম দিকে র‌্যাম্পে হাঁটার কথা ভাবলেই তিনি নার্ভাস হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু বার বার অনুশীলনের পরে ধীরে ধীরে ভয় কাটে। আত্মবিশ্বাস বাড়ে।

পুনেম দেবের কাছেও অভিজ্ঞতাটি ছিল নতুন। বড় শহরের আলো, মঞ্চ, দর্শক—সবই যেন অন্য পৃথিবী। এমনকি তাঁদের কয়েক জনের কাছে রায়পুরে আসাটাই ছিল জীবনে প্রথম বড় শহরের অভিজ্ঞতা।

আরও পড়ুন
আধুনিক ভারতের ইতিহাসচর্চায় এক যুগের অবসান
মদ খান? রামমন্দিরে CEO-র ধর্মপরীক্ষা
দেশের কর্মক্ষেত্রে কমছে মহিলাদের অংশগ্রহণ!

আর সেই মানুষগুলিই কিছু দিনের প্রস্তুতির পর দাঁড়ালেন ফ্যাশন র‌্যাম্পে। এখানেই ঘটনাটির আসল নাটকীয়তা।

বস্তার এমন একটি নাম, যার সঙ্গে বহু বছর ধরে জুড়ে রয়েছে মাওবাদী সংঘাতের ইতিহাস। দুর্গম জঙ্গল, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান, বিস্ফোরণ, গুলির লড়াই—সংবাদে বার বার ফিরে এসেছে সেই ছবি। এই সংঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন নিরাপত্তারক্ষী, সাধারণ মানুষ এবং মাওবাদী সদস্যরাও।

সেই বস্তারেরই কয়েক জন প্রাক্তন মহিলা ক্যাডার আজ অস্ত্রের বদলে তুলে ধরছেন নিজেদের এলাকার তাঁত! যে হাতে এক দিন বন্দুক ছিল, সেই হাতেই এ বার ধরা পড়ল বস্তারের সংস্কৃতির পরিচয়। তবে আত্মসমর্পণ করলেই কি সব শেষ? মোটেই নয়। বরং সেখান থেকেই শুরু হয় আরও কঠিন লড়াই।

নতুন জীবনের গান

পুরনো পরিচয় ছেড়ে নতুন জীবন। কাজ শেখা। আয় করার রাস্তা তৈরি করা। সমাজে ফিরে আসা। পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন। আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের অতীতকে পেরিয়ে নতুন পরিচয় তৈরি করা।

সরকারি পুনর্বাসন ব্যবস্থায় আর্থিক সাহায্য, প্রশিক্ষণ ও জীবিকার সুযোগ তৈরির উপর জোর দেওয়া হলেও বাস্তবের পথ এখনও কঠিন। কারণ একটি বন্দুক নামিয়ে রাখা যতটা সহজ, তার পরের জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলা ততটাই কঠিন।

এই কারণেই রায়পুরের ফ্যাশন শোকে শুধুমাত্র বিনোদনের অনুষ্ঠান হিসেবে দেখছেন না অনেকে। এটি একটি বার্তা। একটি ছবি। একটি সম্ভাবনার গল্প।

যে বস্তারের ছবি এত দিন সংবাদপত্রের পাতায় দেখা গিয়েছে অস্ত্রের ছায়ায়, সেই বস্তারেরই অন্য মুখ এবার দেখা গেল র‌্যাম্পে। কোসা সিল্কে সেজে, মাথা উঁচু করে হাঁটছেন কয়েক জন মহিলা। তাঁদের পিছনে পড়ে রয়েছে জঙ্গলের অন্ধকার অতীত। সামনে ঝলমলে আলো।

সমাজমাধ্যমে তাই ছবিগুলি নিয়ে এত আলোচনা। কারও কাছে এটি পুনর্বাসনের প্রতীক। কারও কাছে আত্মনির্ভরতার। আবার কারও চোখে, এ যেন প্রমাণ, মানুষ চাইলে নিজের অতীতের গণ্ডি ভেঙে নতুন পরিচয় তৈরি করতে পারে।

অবশ্য একটি ফ্যাশন শো দিয়েই বস্তারের মাওবাদী সমস্যার সমাধান হয়ে গেল—এমন দাবি করার কোনও কারণ নেই। পুনর্বাসনের পথ দীর্ঘ। প্রত্যেক আত্মসমর্পণকারীর গল্প আলাদা। প্রত্যেকের সামনে আলাদা চ্যালেঞ্জ। তবু প্রতীক কখনও কখনও অনেক কথা বলে। আর সেই প্রতীকটি এ দিন ছিল র‍্যাম্প।

এক পাশে বস্তারের সেই পুরনো ছবি: অন্ধকার জঙ্গল, হাতে বন্দুক, সংঘর্ষের শব্দ। অন্য পাশে নতুন ছবি: কোসা সিল্ক, মঞ্চের আলো, ক্যামেরার ফ্ল্যাশ আর করতালি।

বন্দুক থেকে তাঁত। জঙ্গল থেকে র‍্যাম্প। অন্ধকার থেকে আলো।

কয়েক মিনিটের এই হাঁটা হয়তো তাঁদের অতীত বদলে দেয়নি। কিন্তু ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সাহসটুকু যে বদলে দিতে পারে, সেই গল্পই যেন বলে গেল রায়পুরের সেই মঞ্চ। কারণ শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা শুধু র‌্যাম্পে কে হাঁটলেন, তা নয়। প্রশ্নটা আরও গভীর, এক বার বন্দুক নামিয়ে রাখার পরে, সমাজ কি সেই মানুষটিকে নতুন করে বাঁচার সুযোগ দিতে পারে?

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য