international-workers-day
১লা মে, ২০২৬
বদলে যাচ্ছে সময়, পাল্টাচ্ছে কর্মসংস্কৃতি, শ্রমিকের সংজ্ঞা। ১৮৮৬ সালে শিকাগোয় ওঠা ঝড় সারা দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে পড়ল, তৈরি হল ইতিহাস - বদলে গেল নিয়ম। পয়লা মে। শুধু একটা তারিখ নয়। তার রক্তক্ষয়ী বেদনার ইতিহাস আমরা বয়ে চলেছি যুগ থেকে যুগান্তরে। চলমান সভ্যতা পালটে দেয় নিয়ম, পালটে দেয় সংজ্ঞা।
শিকাগো: যেখানে প্রতিবাদ হয়ে উঠল ঝড়
শিল্প বিপ্লবের ধোঁয়াটে আকাশের নীচে যখন কারখানার সাইরেনই ছিল জীবনের একমাত্র ছন্দ, তখন শ্রমিক মানেই ছিল ‘যন্ত্রের অংশ’। দিনে ১৪-১৬ ঘণ্টার কাজ, নগণ্য মজুরি, আর নিরাপত্তাহীন জীবন—এই অমানবিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে জন্ম নিল এক স্লোগান।
১৮৮৬ সালের ১ মে, আমেরিকার শিকাগো শহর দেখেছিল অভূতপূর্ব দৃশ্য। প্রায় তিন লক্ষ শ্রমিক কাজ বন্ধ রেখে রাস্তায় নেমে এলেন। শিল্পপতিদের চাপে থাকা প্রশাসন তখন বুঝতে শুরু করে—এ লড়াই থামানো সহজ নয়।
হেমার্কেট অ্যাফেয়ার (Haymarket Affair): ইতিহাসের মোড়বদল
৪ মে, ১৮৮৬। প্রায় তিন লক্ষ শ্রমিক আট ঘন্টা কাজের দাবিতে নেমে এসেছেন পথে। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের শেষে আচমকা বোমা বিস্ফোরণ, তারপর পুলিশের গুলি। মুহূর্তে লুটিয়ে পড়ে একের পর এক দেহ। সেই রাত শুধু শিকাগো নয়, কাঁপিয়ে দেয় গোটা বিশ্বকে। শ্রমিকদের দাবি আর উপেক্ষা করার মতো থাকেনি।
ফাঁসির মঞ্চে ভবিষ্যতের ভাষা
ঘটনার দায় চাপানো হল শ্রমিক নেতাদের উপর। বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও শাস্তি ছিল নির্মম। ১৮৮৭ সালে ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী ও একটি সংবাদপত্রের সম্পাদক, অগস্ট স্পাইস (August Spies)-সহ চারজনকে ফাঁসি দেওয়া হল। মৃত্যুর আগে স্পাইস বলেছিলেন, "আজ আমাদের নীরবতা, একদিন তোমাদের কণ্ঠস্বরের থেকেও জোরে কথা বলবে।" সেই ভবিষ্যদ্বাণী সফল হয়েছিল, বলাই বাহুল্য।
প্যারিস থেকে বিশ্ব, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
১৮৮৯ সালে ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৮৯০ সাল থেকে শুরু হয় বিশ্বজোড়া পালন। সীমান্ত ভেঙে শ্রমিকদের এই ঐক্যই মে দিবসকে পরিণত করে এক বৈশ্বিক চেতনায়।
ভারতীয় মাটিতে মে দিবসের পদচারণা
ভারতে ১৯২৩ সালে চেন্নাইয়ে প্রথম মে দিবস পালিত হয়। সেই থেকে এই দিনটি শুধু স্মরণ নয়, সংগ্রামেরও প্রতীক। স্বাধীনতার পর শিল্পাঞ্চল থেকে আইটি পার্ক—সব জায়গাতেই ১ মে নতুন করে প্রশ্ন তোলে: শ্রমিকের প্রাপ্য কি সত্যিই নিশ্চিত?
অর্জনের গল্প! আইনের ভাষায় অধিকার
মে দিবসের আন্দোলন কেবল আবেগ নয়, এনে দিয়েছে বাস্তব পরিবর্তন। ৮ ঘণ্টার কর্মদিবস, সাপ্তাহিক ছুটি, ন্যূনতম মজুরি, পেনশন—সবই এই সংগ্রামের ফল। International Labour Organization-এর স্বীকৃতিতে এই অধিকারগুলি পেয়েছে আন্তর্জাতিক মর্যাদা। শ্রমিকের জীবন আর আগের মতো নেই—কিন্তু লড়াই শেষও হয়নি।
নতুন যুগ
ডিজিটাল যুগে এসে প্রশ্ন বদলেছে। অটোমেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—কাজ কেড়ে নিচ্ছে, আবার নতুন কাজও তৈরি করছে। কিন্তু গিগ ইকোনমির শ্রমিকরা? অ্যাপ-ভিত্তিক কাজ, নেই স্থায়ী চুক্তি, নেই সামাজিক সুরক্ষা। ফলে ১ মে আজও জিজ্ঞাসা তোলে—প্রযুক্তির উন্নতি কি মানুষের উন্নতিও নিশ্চিত করছে?
সব শ্রমিক (Worker)-ই কর্মী (Employee) কিন্তু সব কর্মীই শ্রমিক নন
শ্রমিক আইন (labour law) এখন শ্রমিক কোড (Labour code)।
সেই কোড অনুযায়ী, শ্রমিক (Worker) হলেন এমন ব্যক্তি, যিনি মজুরি বা পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ করেন। হাতের কাজ (Manual), দক্ষ ও অদক্ষ (Skilled and unskilled) কাজ, যান্ত্রিক (Technical), কেরানির কাজ (Clerical) ইত্যাদির আওতায় আসেন শ্রমিক। যেমন,- ফ্যাক্টরি শ্রমিক, দোকানের সেলসম্যান, ডেলিভারি কর্মী, ক্লার্ক / ডেটা এন্ট্রি অপারেটর, টেকনিশিয়ান, গুদাম কর্মী, সাফাই কর্মী প্রভৃতি।
যাঁরা ম্যানেজার বা প্রশাসনিক পদে এবং উচ্চ বেতনের সুপারভাইজার পদে নিযুক্ত তাঁরা শ্রমিক নন।
আগামীর চ্যালেঞ্জ, সমতার নতুন সংজ্ঞা, নতুন প্রশ্ন
আজকের কর্মজগতে শারীরিক পরিশ্রমের সাথে যুক্ত হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়। টার্গেট, ডেডলাইন, ‘অলওয়েজ অন’ সংস্কৃতি—সব মিলিয়ে কর্মক্ষেত্র হয়ে উঠছে চাপের কেন্দ্র। তাই মে দিবস এখন শুধু মজুরি নয়, কাজ ও জীবনের সমতার (Work-life balance) প্রশ্নও তুলে ধরছে।
রিমোট ওয়ার্কে কাজের সময়ের সীমা কোথায়? জলবায়ু পরিবর্তনে শিল্প বদলালে শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ কী? নারী শ্রমিকদের সমান মজুরি কি বাস্তবে আসবে? এই প্রশ্নগুলিই আগামী দিনের মে দিবসের মূল সুর।
১ মে নেহাতই ছুটির দিন?
শতাব্দী পেরিয়েছে, সময় বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, শ্রমের মর্যাদা কি আজও সুরক্ষিত? প্রশ্ন থাকবে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।