

সৌরজগতের কাছাকাছি একটি সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহ খুঁজে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। ছবি - NASA.
৪ঠা জুলাই, ২০২৬
মহাবিশ্বে পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্ব রয়েছে কি না, সেই অনন্ত রহস্যের সমাধানে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। আমাদের সৌরজগতের একেবারে কাছাকাছি, পৃথিবী থেকে মাত্র ২৫ আলোকবর্ষ দূরে একটি সম্ভাব্য বাসযোগ্য বহির্গ্রহের (Exoplanet) সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। জ্যোতির্বিজ্ঞানের পরিভাষায় ২৫ আলোকবর্ষ শুনতে অনেক বেশি মনে হলেও, প্রায় ১ লক্ষ আলোকবর্ষ চওড়া মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির সাপেক্ষে এই গ্রহটি কার্যত আমাদের মহাজাগতিক প্রতিবেশী।
ক্যামেলোপার্ডালিস (Camelopardalis) নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত ‘জিজে ৩৩৭৮’ (GJ 3378) নামের একটি অনুজ্জ্বল লাল বামন (Red Dwarf) নক্ষত্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে এই নতুন গ্রহটি। বিজ্ঞানীদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী গ্রহটির নাম রাখা হয়েছে ‘জিজে ৩৩৭৮বি’ (GJ 3378b)। গ্রহটি তার নিজস্ব নক্ষত্রের ‘হ্যাবিটেবল জোন’ বা ‘গোল্ডিলকস জোনে’ (Goldilocks Zone) অবস্থান করছে। অর্থাৎ এটি নক্ষত্র থেকে ঠিক এমন এক আদর্শ দূরত্বে রয়েছে, যেখানে তাপমাত্রা খুব বেশি গরম বা খুব বেশি ঠান্ডা নয়, যার ফলে গ্রহটির পৃষ্ঠে তরল জলের অস্তিত্ব থাকা তাত্ত্বিকভাবে পুরোপুরি সম্ভব।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় (ইউসি আরভিন), টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয় এবং পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের একটি যৌথ দল এই যুগান্তকারী গবেষণাটি চালিয়েছেন। গ্রহটিকে প্রথমবার ২০২৪ সালে ফরাসি জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেছিলেন। তবে সে সময় এটিকে একটি গ্যাসীয় গ্রহ (Mini-Neptune) বলে মনে করা হয়েছিল।
সম্প্রতি অ্যারিজোনার কিট পিক ন্যাশনাল অবজারভেটরির ‘NEID স্পেক্ট্রোমিটার’ এবং টেক্সাসের ম্যাকডোনাল্ড অবজারভেটরির ‘হ্যাবিটেবল-জোন প্ল্যানেট ফাইন্ডার’ যন্ত্রের সাহায্যে গ্রহটির ওপর ফের নজরদারি চালানো হয়। এই উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে নক্ষত্রের আলোর ওপর গ্রহের মহাকর্ষীয় টানের ফলে সৃষ্ট অতি সূক্ষ্ম কম্পন বা ‘ওবল এফেক্ট’ (Wobble Effect) বিশ্লেষণ করে গ্রহটির প্রকৃত ভর এবং কক্ষপথের নতুন ও নিখুঁত পরিমাপ সামনে এনেছেন বিজ্ঞানীরা। এই নতুন গবেষণাপত্রটি বিখ্যাত ‘দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের নতুন হিসাব অনুযায়ী, ‘জিজে ৩৩৭৮বি’ গ্রহটির প্রকৃত ভর পূর্বে ভাবা ভরের অর্ধেকেরও কম, যা পৃথিবীর ভরের তুলনায় মাত্র ২.৩ গুণ। এর মানে হল, গ্রহটি কোনও গ্যাসীয় পিণ্ড নয়, বরং পৃথিবীর মতোই একটি কঠিন পাথুরে ‘সুপার-আর্থ’ (Super-Earth) হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।
এছাড়া সংশোধিত হিসাবে দেখা গেছে, গ্রহটি প্রতি ২১.৪৫ দিনে তার নক্ষত্রকে একবার প্রদক্ষিণ করে। এই কক্ষপথের কারণে গ্রহটি তার নক্ষত্র থেকে ঠিক ততটুকুই আলো ও বিকিরণ পায়, যতটুকু পৃথিবী সূর্য থেকে পেয়ে থাকে (পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৯০ শতাংশ)। ইউসি আরভিনের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ড. পল রবার্টসন বলেন, "এই সুপার-আর্থটি তার নক্ষত্রের বিকিরণের একেবারে 'সুইট স্পটে' (Sweet Spot) রয়েছে, যা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।"
গ্রহটি বাসযোগ্য জোনে থাকলেও সেখানে আদৌ কোনও বায়ুমণ্ডল টিকে রয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনও রহস্য রয়েছে। লাল বামন নক্ষত্রগুলি সাধারণত অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ক্ষতিকর স্টেলার উইন্ড বা সৌরঝড় নির্গত করে, যা অনায়াসেই সংলগ্ন গ্রহের বায়ুমণ্ডলকে মহাকাশে উড়িয়ে দিতে পারে। তবে গ্রহটির আকার বড় হওয়ায় এটি নিজের বায়ুমণ্ডল ধরে রাখতে পেরেছে কি না, তা জানার জন্য বিজ্ঞানীদের আরও অপেক্ষা করতে হবে।
যেহেতু গ্রহটি আমাদের সাপেক্ষে আড়াআড়িভাবে অতিক্রম (Transit) করে না, তাই বর্তমান প্রযুক্তির সাহায্যে এর বায়ুমণ্ডলের উপাদান পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। ২০৪০-এর দশকে নাসার পরিকল্পিত ‘হ্যাবিটেবল ওয়ার্ল্ডস অবজারভেটরি’ (Habitable Worlds Observatory) মহাকাশে উৎক্ষেপণের পর এই গ্রহের বায়ুমণ্ডল এবং সেখানে প্রাণের কোনও রাসায়নিক সংকেত বা বায়োসিগনেচার (Biosignature) আছে কি না, তা সরাসরি জানা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
