

উটায় ১০০ কোটি টন জলের ‘গোপন ভাণ্ডার'। ছবি - Google
৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
উপর থেকে দেখলে মনে হবে পাথর, নুড়ি আর ধ্বংসাবশেষের এক বিশাল স্তূপ। বরফের অস্তিত্বের কোনও চিহ্ন নেই। কিন্তু সেই পাথুরে আস্তরণের কয়েক দশক মিটার নীচে লুকিয়ে থাকতে পারে বিপুল পরিমাণ বরফ! যার জল হয়ে দাঁড়ায় প্রায় ১০০ কোটি টন! আমেরিকার উটা উপত্যকার পাহাড়ে গবেষণা চালিয়ে এমনই চমকপ্রদ ছবি পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বরফের এই ভাণ্ডার চোখে দেখা যায় না, কিন্তু রয়েছে পাহাড়ের পাথুরে শরীরের ভিতরে। আর জলবায়ু পরিবর্তনের সময় এই ‘গোপন জলভাণ্ডার’-এর গুরুত্বই এখন নতুন করে ভাবাচ্ছে গবেষকদের।
ঘটনাস্থল মাউন্ট টিম্পানোগোস। সল্ট লেক সিটি এবং প্রোভোর কাছাকাছি এই পাহাড়ের ঢালে রয়েছে বিশেষ ধরনের একটি হিমবাহ—‘রক গ্লেসিয়ার’। নাম হিমবাহ হলেও চেহারায় সাধারণ হিমবাহের সঙ্গে তার বিস্তর তফাত। বরফের সাদা চাদর এখানে চোখে পড়ে না। তার বদলে বরফের উপর রয়েছে মোটা পাথর, নুড়ি এবং পাহাড় থেকে নেমে আসা ধ্বংসাবশেষের স্তর। বাইরে থেকে তাই সেটিকে নিছক পাথরের স্তূপ বলেই মনে হয়। কিন্তু সেই পাথরের নীচেই জমে রয়েছে বরফ।
গবেষকদের হিসাব, টিম্পানোগোস রক গ্লেসিয়ারের আয়তনের প্রায় ৮৩ শতাংশই বরফ। বাকি ১৭ শতাংশ পাথর ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ। ওই একটি রক গ্লেসিয়ারেই রয়েছে প্রায় ১৫ লক্ষ ঘনমিটার বরফ! যে পরিমাণ বরফ গললে প্রায় ৬০০টি অলিম্পিক মাপের সুইমিং পুল ভরে যেতে পারে। বরফের স্তরও যথেষ্ট পুরু। গবেষণায় কোথাও প্রায় ১২০ ফুট গভীর পর্যন্ত বরফের সন্ধান মিলেছে। কিছু জায়গায় সেই গভীরতা প্রায় ১৫০ ফুট পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে বিজ্ঞানীদের তৈরি ত্রিমাত্রিক মানচিত্রে ধরা পড়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, এত পাথর আর ধ্বংসাবশেষের নিচে লুকিয়ে থাকা বরফের সন্ধান মিলল কীভাবে? উত্তর হল- মাধ্যাকর্ষণের সূক্ষ্মতম পরিবর্তনে।
বরফের ঘনত্ব পাথরের তুলনায় অনেক কম। ফলে পাহাড়ের নিচে কোনও এলাকায় যদি বিপুল পরিমাণ বরফ জমে থাকে, সেখানে মাধ্যাকর্ষণের টানও আশপাশের তুলনায় সামান্য কম হয়। সেই পরিবর্তন এতই সূক্ষ্ম যে সাধারণভাবে তা বোঝা সম্ভব নয়। তাই গবেষকেরা ব্যবহার করেছেন অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘গ্র্যাভিমিটার’।
২০২৪ সালে টিম্পানোগোস রক গ্লেসিয়ারের উপর ২৩২টি জায়গায় মাধ্যাকর্ষণ মাপা হয়। প্রতিটি পরিমাপের মধ্যে দূরত্ব ছিল প্রায় ২৫ মিটার। পরে সেই তথ্যের সঙ্গে কম্পিউটার মডেল এবং পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণ মিলিয়ে তৈরি করা হয় রক গ্লেসিয়ারের নিচে লুকিয়ে থাকা বরফের ত্রিমাত্রিক ছবি। সেই ছবিই খুলে দেয় পাহাড়ের ‘গোপন’ ভিতরটা।
শুধু একটি রক গ্লেসিয়ারেই এই বিপুল বরফ রয়েছে, এটাই অবশ্য সবচেয়ে বড় খবর নয়। উটা উপত্যকায় এমন রক গ্লেসিয়ারের সংখ্যা প্রায় ৮৩৬টি। টিম্পানোগোসে পাওয়া তথ্যকে ভিত্তি করে গবেষকদের অনুমান, উটার সমস্ত রক গ্লেসিয়ারে মিলিয়ে প্রায় ১০০ কোটি টন জল বরফ হয়ে জমে থাকতে পারে। অর্থাৎ, পাহাড়ের গায়ে যে পাথর দেখা যাচ্ছে, তার নিচে লুকিয়ে রয়েছে কার্যত এক বিশাল জলভাণ্ডার।
এই বরফের আর একটি বিশেষত্ব রয়েছে। পাথরের মোটা আস্তরণ অনেকটা প্রাকৃতিক ‘কম্বল’-এর মতো কাজ করে। সূর্যের তাপ সরাসরি বরফে পৌঁছতে পারে না। ফলে বাইরে তাপমাত্রা বাড়লেও ভিতরের বরফ তুলনামূলক ভাবে দীর্ঘ সময় সংরক্ষিত থাকতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে এই বৈশিষ্ট্যই রক গ্লেসিয়ারকে বিজ্ঞানীদের কাছে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
কারণ সাধারণ হিমবাহ দ্রুত গলতে শুরু করলে তার জলপ্রবাহ চোখে পড়ে। রক গ্লেসিয়ারের ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটা সরল নয়। বরফ কোথায় রয়েছে, কতটা পুরু, কত দ্রুত গলছে, সবটাই পাথরের আড়ালে। ফলে জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই লুকনো বরফের ভবিষ্যৎ কী, তা বোঝা জরুরি হয়ে উঠছে।
উটার হিসাব ছাপিয়ে আরও বড় ছবিও সামনে এসেছে। বিশ্বের প্রায় ৫০ হাজার রক গ্লেসিয়ারের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকদের অনুমান, সেগুলিতে মোট প্রায় ৪৮ গিগাটন জল বরফ হয়ে সঞ্চিত থাকতে পারে। অর্থাৎ পৃথিবীর বহু পাহাড়ি অঞ্চলে পাথরের আস্তরণের নীচে ছড়িয়ে রয়েছে বিপুল পরিমাণ জল, যার অস্তিত্ব সাধারণ চোখে বোঝার উপায় নেই।
তবে এই বরফকে এখনই মানুষের ব্যবহারযোগ্য ‘জলভাণ্ডার’ হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কোথায় কত বরফ রয়েছে, তার গলনের হার কত, গললে সেই জল কোথায় যাবে এবং স্থানীয় জলসম্পদের উপর তার প্রভাব কী হবে, এই প্রশ্নগুলির উত্তর এখনও গবেষণাধীন।
তবু উটার পাহাড় বিজ্ঞানীদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য স্পষ্ট করে দিয়েছে। বরফ মানেই যে চোখে দেখা সাদা হিমবাহ, তা নয়। কখনও কখনও বরফ লুকিয়ে থাকতে পারে পাথরের কয়েক দশক মিটার নীচে, বছরের পর বছর, শতাব্দীর পর শতাব্দী।
পাহাড়ের উপর দিয়ে হাঁটলে তাই যা দেখা যায়, সেটাই তার সম্পূর্ণ গল্প নয়। পাথরের সেই নীরব স্তূপের ভিতরেও হয়তো জমে রয়েছে ভবিষ্যতের জল, কখনও ৬০০টি সুইমিং পুলের সমান, কখনও তারও বহুগুণ। জলবায়ু বদলের পৃথিবীতে সেই অদৃশ্য বরফ কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, সেটাই এখন বিজ্ঞানীদের নতুন অনুসন্ধানের বিষয়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
