

ডিলিমিটেশন বিতর্ক। ছবি - Google
২৯শে আগস্ট, ২০২৬
ভারতের সংসদীয় রাজনীতিতে ‘ডিলিমিটেশন’ বা আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে আলোচনা শুরু হলেই তা চট করে একটি সরল সমীকরণে আটকে যায়—উত্তর বনাম দক্ষিণ ভারতের লড়াই। বহুল প্রচলিত যুক্তিটি হল: জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল দক্ষিণের রাজ্যগুলি সংসদে আসন হারিয়ে কোণঠাসা হবে, আর হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলি জনসংখ্যা বৃদ্ধির সুবাদে বিপুল সংখ্যক নতুন সাংসদ পাবে।
এই আশঙ্কা একেবারে অমূলক নয়। তবে বিতর্কটিকে শুধু মানচিত্রের দুটি দিকের সংঘাত হিসেবে দেখলে ভারতের বহুমাত্রিক বাস্তবতা ও জটিল সাংস্কৃতিক কাঠামোকে এড়িয়ে যাওয়া হয়। লোকসভার আসন পুনর্বণ্টন শুধুই ভূগোলের লড়াই নয়; এটি ভারতের বহুভাষিক চরিত্র, যুক্তরাষ্ট্রীয় ভারসাম্য এবং সাংবিধানিক সমঝোতার এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা। প্রায় পাঁচ দশক পর যখন আসন বিন্যাসের প্রশ্নটি সামনে আসছে, তখন আসল প্রশ্ন দাঁড়ায় এই নতুন সমীকরণে কে লাভবান হবে, আর কেই বা হারাতে বসবে নিজের কণ্ঠস্বর?
১৯৭৬ সালে লোকসভার আসন সংখ্যা ১৯৭১ সালের জনগণনার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল পরিবার পরিকল্পনা নীতি সফল করতে রাজ্যগুলিকে উৎসাহিত করা। কিন্তু গত কয়েক দশকে ভারতের জনমিতি এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে।
একদিকে বিহার ও উত্তরপ্রদেশের মতো হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যা বেড়েছে লাফিয়ে। বিহারের জনসংখ্যা ১৯৭১ সালের ৫.৬ কোটি থেকে বেড়ে ২০১১ সালে ১০.৪ কোটিতে ঠেকেছে; উত্তরপ্রদেশে তা ৮.৮ কোটি থেকে প্রায় ২০ কোটি ছুঁয়েছে। অন্যদিকে কেরালা ও তামিলনাড়ুর মতো রাজ্যগুলিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি ছিল অত্যন্ত ধীর। কেরালায় জনসংখ্যা ২.১ কোটি থেকে মাত্র ৩.৩ কোটিতে এবং তামিলনাড়ুতে ৪.১ কোটি থেকে ৭.২ কোটিতে পৌঁছেছে।
জনসংখ্যার ভিত্তিতে প্রতিনিধিত্ব: উত্তরের যুক্তি হল—গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি ‘এক ব্যক্তি, এক ভোট’। কোটি কোটি মানুষের জন্য যদি সংখ্যানুপাতিক সাংসদ না থাকেন, তবে তা ভোটারদের প্রতি অবিচার।
সাফল্যের শাস্তি না দেওয়ার যুক্তি: দক্ষিণের প্রশ্ন—শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনায় জাতীয় লক্ষ্য পূরণ করার ফলেই কি তবে আমাদের সংসদীয় গুরুত্ব কমিয়ে শাস্তি দেওয়া হবে?
১৯৫১ থেকে ১৯৭৭ সালের তথ্য ঘাঁটলে দেখা যায়, ১৯৭১ সাল পর্যন্ত অধিকাংশ রাজ্যের আসন সংখ্যা স্থিতিশীল ছিল। যা কিছু পরিবর্তন হয়েছে, তা মূলত নতুন রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল গঠনের কারণে—এক রাজ্যের আসন কেটে অন্য রাজ্যকে দেওয়ার জন্য নয়।
অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের ৪২টি আসন ভাগ হয়ে অন্ধ্র (২৫) ও তেলঙ্গানা (১৭) হয়েছে। একইভাবে বিহার, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরপ্রদেশ ভেঙে যখন ঝাড়খণ্ড, ছত্তিশগড় ও উত্তরাখণ্ড তৈরি হল, তখন মূল রাজ্যের নির্ধারিত আসনগুলোই ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। ১৯৭১ সালের আগে আসন বিন্যাসের ক্ষেত্রে হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলি তাদের প্রতিনিধিত্বের প্রায় ৩.১% হারিয়েছিল, যেখানে দক্ষিণের ক্ষয়ক্ষতি ছিল মাত্র ১.২%। অর্থাৎ, অতীতের পরিবর্তনগুলো কোনো আঞ্চলিক পক্ষপাতিত্ব নয়, বরং ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠন ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ছিল।
আসন পুনর্বিন্যাস কেবল সংখ্যার হিসাব নয়, এটি ভাষার প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও বটে। ২০১১ সালের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের প্রায় ৪৪% মানুষের মাতৃভাষা হিন্দি, যেখানে অন্য কোনো একক ভাষার অংশীদারিত্ব ৮ শতাংশের বেশি নয়।
উত্তরের রাজ্যগুলিতে ৯০ শতাংশেরও বেশি মানুষের ভাষা হিন্দি হলেও কর্ণাটকে তা মাত্র ২.৬%, আর তামিলনাড়ু, কেরালা কিংবা পশ্চিমবঙ্গে তা ১ শতাংশেরও কম। যদি লোকসভার আসন পুরোপুরি জনসংখ্যার অনুপাতে পুনর্বণ্টন করা হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই সংসদে হিন্দিভাষী এলাকার প্রভাব একচেটিয়াভাবে বৃদ্ধি পাবে। মিলান বৈষ্ণব ও জ্যামি হিন্টসনের মতো গবেষকদের বিশ্লেষণ বলছে কেবলমাত্র জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন হলে হিন্দি বলয়ের রাজ্যগুলি প্রায় ৩৬টি আসন বেশি পেতে পারে, যেখানে দক্ষিণের প্রধান চার রাজ্য হারাতে পারে প্রায় ২৬টি আসন। উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও রাজস্থান একাই প্রায় ২৬টি আসন বাড়িয়ে নিতে পারে, আর তামিলনাড়ু, কেরালা ও অন্ধ্রপ্রদেশ হারাতে পারে ২১টি আসন। শুধু দক্ষিণই নয়, পশ্চিমবঙ্গও এই সমীকরণে তাদের তুলনামূলক রাজনৈতিক গুরুত্ব হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
একটি বহুভাষিক প্রজাতন্ত্রে যখন ক্ষমতার ভরকেন্দ্র কোনো একটি নির্দিষ্ট ভাষাভাষী গোষ্ঠীর দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে পড়ে, তখন তা আঞ্চলিক অসন্তোষ ও বিচ্ছিন্নতাবোধকে উসকে দিতে বাধ্য।
ভারত কোনো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী কাঠামো নয়; এটি বহু বৈচিত্র্যের মিলনে গড়ে ওঠা একটি যুক্তরাষ্ট্রীয় ইউনিয়ন। ১৯৫৬ সালের রাজ্য পুনর্গঠন আইন ভাষাগত পরিচয়কে স্বীকৃতি দিয়েই ভারতের অখণ্ডতা রক্ষা করেছিল।
আজকের সংকট মেটাতে হলে শূন্য-সমষ্টির (Zero-sum) খেলা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। একদিকে যেমন জনসংখ্যার গণতান্ত্রিক গুরুত্বকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না, তেমনই জনস্বাস্থ্য ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সফল রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্ব কমিয়ে দেওয়া কোনো দূরদর্শী সিদ্ধান্ত হতে পারে না। কেন্দ্রকে এমন একটি প্রতিনিধিত্বের ফর্মুলা তৈরি করতে হবে, যা দুই দিকের উদ্বেগকে সমানভাবে মূল্যায়ন করবে।
জনসংখ্যা ভারতের বাস্তবতার একটি দিক মাত্র; অন্য দিকটি দাঁড়িয়ে রয়েছে অর্থনৈতিক অবদান, মানবিক উন্নয়ন এবং ঐতিহাসিক যুক্তরাষ্ট্রীয় আস্থার ওপর।তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—যে রাজ্যগুলি জাতীয় কোষাগার ও অর্থনীতিতে বেশি অবদান রাখছে এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছে, সংসদীয় গণতন্ত্রে তাদের অবস্থান কোথায় দাঁড়াবে?
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
