rupees and dollars
৩০শে এপ্রিল, ২০২৬
ভারত-ইরান সংঘাতের আঁচ এবার সরাসরি এসে পড়েছে সাধারণ মানুষের পকেটে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই এশিয়ার অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় ভারতীয় টাকার রেকর্ড পতন আমাদের অর্থনীতির এক কঙ্কালসার চেহারা সামনে এনে দিয়েছে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার দাম ৯১.০১ থেকে কমে ৯৪.৮৬ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। যদিও আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে যে এটি কেবল তেলের দাম বাড়ার ফল, কিন্তু এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক গভীরতর সংকট।
ভারত তার প্রয়োজনের সিংহভাগ তেল ও গ্যাস আমদানি করে পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালী দিয়ে। যুদ্ধের কারণে সেই পথ রুদ্ধ হওয়ায় জোগান কমেছে এবং আমদানির খরচ আকাশচুম্বী হয়েছে। তবে মুদ্রার এই পতনের পেছনে কেবল বাণিজ্যের ঘাটতি নয়, কাজ করছে বিশ্ববাজারের ফাটকাবাজদের ‘মানসিকতা’। অদ্ভুত বিষয় হল, আমেরিকার আগ্রাসনে যুদ্ধ শুরু হলেও বিনিয়োগকারীরা নিরাপত্তার খোঁজে সেই ডলারের দিকেই ছুটছেন। ফলে ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলো দুই দিক দিয়ে মার খাচ্ছে—একদিকে ডলারের নিরিখে তেলের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে ডলারের তুলনায় টাকার দাম কমায় সেই তেল কিনতে আরও বেশি টাকা খরচ করতে হচ্ছে। এই ‘ইনফ্লেশন মাল্টিপ্লায়ার’ বা মুদ্রাস্ফীতির গুণিতক প্রভাব সরাসরি আছড়ে পড়ছে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের ওপর, কারণ আমদানি করা পণ্যের বাড়তি দাম শেষমেশ ক্রেতাকেই মেটাতে হয়।
রিজার্ভ ব্যাঙ্ক প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার খরচ করেও টাকার এই পতন রুখতে পারছে না। আমাদের হাতে ৭০০ বিলিয়ন ডলারের বিশাল বিদেশি মুদ্রার ভাণ্ডার থাকলেও তা কার্যত ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হয়েছে। কারণ, যখন ফটকা কারবারিরা টাকা তুলে নিতে শুরু করে, তখন রিজার্ভ খরচ করলে তাদের মনে আরও ভয় দানা বাঁধে যে মুদ্রার মান আরও পড়বে। এর ওপর রয়েছে ‘চড়া সুদে ধার করে সস্তায় ঋণ দেওয়ার’ মতো নীতি। আমরা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ৭-৮ শতাংশ রিটার্ন দিচ্ছি, অথচ সেই টাকা রিজার্ভে রেখে আয় করছি মাত্র ১.৫ শতাংশ।
এই নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক কাঠামো ভারতকে আজ আন্তর্জাতিক পুঁজিপতিদের মর্জির ওপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আজ যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক নীতি বিশ্ববাণিজ্যকে ওলটপালট করে দিচ্ছে, তখন ভারতের উচিত ছিল ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজস্ব মুদ্রায় বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে বাণিজ্য করা। কিন্তু মোদী সরকার সেই পথে না হেঁটে একের পর এক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) করে চলেছে, যা কর্মসংস্থান না বাড়িয়ে উল্টো আমাদের অর্থনীতিকে বিদেশি লগ্নিকারীদের গোলামে পরিণত করছে। টাকার এই ঐতিহাসিক পতন আসলে একটি ভুল অর্থনৈতিক দর্শনেরই খতিয়ান।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।