

সিংভূমে ৩৫০ কোটি বছরের প্রাচীন এককোষী অনু জীবাশ্মের সন্ধান। ছবি - Google
২৯শে আগস্ট, ২০২৬
পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা ঠিক কবে এবং কীভাবে হয়েছিল, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের কৌতূহলের শেষ নেই। সেই অনন্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে এবার এক অবিশ্বাস্য সাফল্য অর্জন করলেন ভারতীয় গবেষকরা। ঝাড়খণ্ডের সিংভূম অঞ্চলের প্রাচীন পাথরের স্তর থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন এককোষী অণুজীবের জীবাশ্ম যার বয়স প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন বা ৩৫০ কোটি বছর। ভূতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ সংস্থার (GSI) বিজ্ঞানী ত্রিস্রোতা চৌধুরীর নেতৃত্বে ভারতীয় বিজ্ঞানীদের এই আবিষ্কার আন্তর্জাতিক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ঝাড়খণ্ডের জামশেদপুরের কাছে ভিতরদাঁড়ি এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে এই চমকপ্রদ তথ্য পেয়েছেন গবেষকরা। এই অঞ্চলটি ‘সিংভূম ক্রেটন’ (Singhbhum Craton)-এর অংশ, যা বিশ্বের প্রাচীনতম মহাদেশীয় ভূত্বকগুলির মধ্যে অন্যতম।
সেখানকার সাড়ে তিনশো কোটি বছরের পুরোনো পাথরের গায়ে সাদা-কালো ডোরাকাটা বিশেষ এক ধরণের প্যাটার্ন লক্ষ্য করেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণায় দেখা যায়, এগুলি আসলে প্রাচীন ‘মাইক্রোবিয়াল ম্যাট’ (Microbial Mats)—এককোষী আণুবীক্ষণিক জীবদের কলোনি বা সমষ্টিগত বসবাসের জীবাশ্মীভূত রূপ। কোটি কোটি বছরের প্রচণ্ড তাপ ও চাপের মধ্যেও সিলিকার আস্তরণের ভেতর অত্যন্ত সূক্ষ্ম কার্বন স্তর হিসেবে সংরক্ষিত রয়ে গেছে সেই আদ্যিকালের জীবাণুর চিহ্ন।
সাধারণত এত কোটি বছর আগের প্রাণের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু এই গবেষণায় একটি বিরল ঘটনা ঘটেছে। বিজ্ঞানী ত্রিস্রোতা চৌধুরী জানান, যে পাথরের মধ্যে প্রাচীন জৈব উপাদানগুলি সংরক্ষিত ছিল, ঠিক সেখানেই পাওয়া গেছে বয়স নির্ধারণের সহায়ক খনিজ ‘জিরকন’ (Zircon)। ফলে পাথরের বয়স এবং তার ভেতরের প্রাণের অস্তিত্বের বয়সকে সরাসরি যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিজ্ঞানীদের সঙ্গে যৌথভাবে করা এই গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল *‘প্রসিডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস’ (PNAS)*-এ প্রকাশিত হয়েছে।
পাথরে পাওয়া কার্বন কোনো প্রাচীন আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকে এসেছে, নাকি সত্যি কোনো জীবন্ত প্রাণীর অবশিষ্টাংশ তা নিশ্চিত করা ছিল বিজ্ঞানীদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ।
লেজারভিত্তিক ‘রামন স্পেকট্রোস্কোপি’ পরীক্ষার মাধ্যমে কার্বনের অভ্যন্তরীণ গঠন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এটি ৩২৪ থেকে ৩৬৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহ্য করেছে, যা পরবর্তী সময়ের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের তাপমাত্রার চেয়ে কম। এর ফলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে কার্বনের স্তরটি পাথরের মূল কাঠামোরই অংশ এবং তা নির্ভেজাল জৈব প্রক্রিয়ার ফসল।
তাছাড়া নমুনার আটটি জিরকন ক্রিস্টালের ইউরেনিয়াম-লেড অনুপাত পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হন, এগুলির বয়স সাড়ে তিনশো কোটি বছর।
এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে আজ থেকে সাড়ে তিনশো কোটি বছর আগেও জীবদেহে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে জৈব উপাদানে রূপান্তর করার অত্যন্ত জটিল রাসায়নিক প্রক্রিয়া কার্যকর ছিল।
বিজ্ঞানীদের কথায়, সেই আদিম পৃথিবী ছিল আজকের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা—চারিদিকে অনবরত আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত আর লোহা ও সিলিকায় ভরা বিষাক্ত ফুটন্ত মহাসমুদ্র। চরম প্রতিকূল সেই রাসায়নিক নরকের মধ্যেও যে জীবন নিজস্ব নিয়ম তৈরি করে টিকে ছিল এবং বিস্তার লাভ করেছিল, ঝাড়খণ্ডের এই প্রাচীন পাথর তারই জ্যান্ত দলিল হয়ে রইল।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
