

ফিলাডেলফিয়ার রাস্তায় প্রতিধ্বনিত হয়েছিল মহীশূরের গর্জন। ছবি - Wikipedia.
৪ঠা জুলাই, ২০২৬
"Come, all ye lads who know no fear... Embark in our Hyder-Ally!"
১৭৮০-র দশকে এই গানটি কিন্তু ভারতের মহীশূরের কোনও গলিতে বা শ্রীরঙ্গপত্তনমের প্রাসাদে গাওয়া হচ্ছিল না। এই সুর ভেসে আসছিল আমেরিকার ফিলাডেলফিয়ার রাস্তা থেকে। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা এক যুদ্ধজাহাজের নাম রাখা হয়েছিল ভারতের মহীশূরের শাসক হায়দার আলির নামে, আর তাকে নিয়েই গান বাঁধছিলেন মার্কিন বিপ্লবীরা। শুধু তাই নয়, আমেরিকার নিউ জার্সির ট্রেন্টন শহরে যখন সাধারণ মানুষ ব্রিটেনের বিরুদ্ধে জয় উদ্যাপন করতে গ্লাস উঁচিয়ে টোস্ট বা শুভেচ্ছা জানাতেন, তখন সেখানে জর্জ ওয়াশিংটনের পাশাপাশি জয়ধ্বনি উঠত হায়দার আলির নামেও। হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পড়ে গিয়েছিল আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং ভারতের অ্যাংলো-মহীশূর যুদ্ধ।
ইতিহাস আমাদের শেখায় যে আমেরিকার বিপ্লব কেবল আমেরিকার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। এর শিকড় ছড়িয়ে ছিল ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জ থেকে শুরু করে ইউরোপ ও ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত। একদিকে যখন জর্জ ওয়াশিংটন উত্তর আমেরিকায় ব্রিটিশ ফৌজের বিরুদ্ধে জীবনপণ লড়াই করছেন, ঠিক তখনই ভারতের দক্ষিণ প্রান্তে একই ঔপনিবেশিক শক্তির ভিত নাড়িয়ে দিচ্ছিলেন হায়দার আলি এবং পরবর্তীতে তাঁর যোগ্য পুত্র টিপু সুলতান। ওয়াশিংটন ও হায়দার আলির মধ্যে কখনও কোনও চিঠিপত্র আদান-প্রদান হয়নি, কিংবা মহীশূর থেকে কোনও সৈন্যও আমেরিকায় যায়নি। কিন্তু তাঁদের শত্রু ছিল এক—ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ। আর তাঁদের মিত্রও ছিল এক—ফ্রান্স।
১৭৫৬ থেকে ১৭৬৩ সালের ‘সপ্তবর্ষীয় যুদ্ধে’ ব্রিটেনের কাছে হারের প্রতিশোধ নিতে মরিয়া ছিল ফরাসিরা। তারা বুঝতে পেরেছিল, ব্রিটেনকে দুর্বল করতে হলে তাদের উপনিবেশগুলিতে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়ে দিতে হবে। তাই ফরাসিরা একই সাথে অর্থ ও নৌবহর দিয়ে সাহায্য করতে শুরু করে আমেরিকার বিপ্লবী এবং মহীশূরের হায়দার আলিকে। ১৭৭৯ সালে ফরাসিরা আমেরিকার উপনিবেশগুলির সাথে জোট বাঁধলে, ব্রিটিশরা ভারতের ফরাসি-নিয়ন্ত্রিত ‘মাহে’ বন্দরটি দখল করে নেয়। এই বন্দরটি হায়দার আলির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এর মাধ্যমেই তিনি ফরাসি সামরিক সরঞ্জাম পেতেন। এই ঘটনার জেরেই ১৭৮০ সালে শুরু হয় দ্বিতীয় অ্যাংলো-মহীশূর যুদ্ধ।
১৭৮০ সালে কাঞ্চীপুরমের কাছে ‘পোলিলুরের যুদ্ধে’ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে একবারে ধূলিসাৎ করে দেয় হায়দার আলির বাহিনী, যা ছিল ভারতের মাটিতে ব্রিটিশদের অন্যতম বড় বিপর্যয়। এর ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এক চরম সংকটে পড়ে। তাদের সেনা, যুদ্ধজাহাজ, অর্থ এবং রাজনৈতিক মনোযোগ দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়—একভাগ আটলান্টিকের ওপারে আমেরিকায়, অন্যভাগ ভারত মহাসাগরের তীরে ভারতে। রাজকীয় ব্রিটিশ নৌবাহিনীর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জাহাজ তখন ভারতের জলসীমায় ফরাসি অ্যাডমিরাল পিয়েরে আন্দ্রে দে সুফরেনের সাথে লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিল।
যার ফল হাতেনাতে পায় আমেরিকা। ব্রিটিশরা ভারতের যুদ্ধ সামলাতে ব্যস্ত থাকায় আমেরিকার দিকে পুরো শক্তি লাগাতে পারেনি। ১৭৮১ সালের ২৮শে অক্টোবর, আমেরিকার ইয়র্কটাউনে ব্রিটিশ সেনাপতি কর্নওয়ালিসের আত্মসমর্পণের খবর যখন নিউ জার্সির ট্রেন্টন শহরে পৌঁছায়, তখন উল্লাসে ফেটে পড়েন নাগরিকরা। সেদিন দেওয়া ১৩টি আনুষ্ঠানিক টোস্টের মধ্যে ১১ নম্বরটি উৎসর্গ করা হয়েছিল "মহান এবং বীর হায়দার আলি"-র উদ্দেশ্যে, যিনি প্রাচ্যে ব্রিটেনের ঔদ্ধত্যকে গুঁড়িয়ে দিচ্ছিলেন।
আমেরিকার স্বাধীনতার সাথে ভারতের এই যোগসূত্র কিন্তু যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই তৈরি হয়েছিল। ১৭৭৩ সালের বিখ্যাত ‘বোস্টন টি পার্টি’র কেন্দ্রবিন্দুতে যে চা ছিল, তা আসলে ছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির। এই সেই একই কর্পোরেশন যা বাংলায় নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করে ভারতের সম্পদ লুট করছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, আমেরিকার বহু মানুষ ভারতের বুকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নির্মম অত্যাচার ও সাম্রাজ্য বিস্তারের খবর পেয়েছিলেন এবং তাঁরা এই কোম্পানিকে ব্রিটিশ ঔদ্ধত্যের প্রতীক হিসেবে দেখতেন। ফলে, আমেরিকার বিপ্লব গোড়া থেকেই একটি আন্তর্জাতিক রূপ নিয়েছিল, যার একপ্রান্তে ছিল বোস্টন আর অন্যপ্রান্তে বেঙ্গল।
১৭৮২ সালে হায়দার আলির মৃত্যুর পর মহীশূরের সিংহাসন ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের দায়িত্ব নেন তাঁর পুত্র টিপু সুলতান। কিন্তু আমেরিকার মানুষের মনে মহীশূরের প্রতি আকর্ষণ কমেনি। নবজাত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের খবরের কাগজগুলিতে নিয়মিত টিপুর লড়াইয়ের খবর ছাপা হতো, স্কুলের পাঠ্যবইতেও জায়গা করে নিয়েছিল মহীশূরের ইতিহাস। এমনকি তৎকালীন আমেরিকার অভিজাত সমাজে হায়দার আলি ও টিপু সুলতানের নাম এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, নিজেদের সেরা রেসের ঘোড়াগুলির নামও তাঁরা রাখতেন ‘হায়দার আলি’। ১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপত্তনম রক্ষা করতে গিয়ে যখন টিপু সুলতান বীরের মতো শহিদ হন, তখন অনেক আমেরিকান শোকপ্রকাশ করেছিলেন। ১৮০০ সালের ৪ঠা জুলাই এক খ্রিষ্টীয় উপদেশে যাজক জন রাসেল বলেছিলেন, "টিপু নিজের ক্ষমতাকে এমন এক বীরত্বের সাথে রক্ষা করেছেন, যা প্রমাণ করে যে তিনি সত্যিই রাজা হওয়ার যোগ্য ছিলেন।"
তবে এই মুগ্ধতা বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। স্বাধীনতা পাওয়ার পর আমেরিকার ভূরাজনীতি এবং বাণিজ্যিক স্বার্থ বদলে যায়। মার্কিন বণিকরা ভারতের বাজারে ব্যবসা করতে চাইল, যা তখন নিয়ন্ত্রণ করত সেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। ফলে ওয়াশিংটন প্রশাসন স্বাধীন ভারতীয় রাজ্যগুলির সাথে সম্পর্ক না বাড়িয়ে ব্রিটিশ কোম্পানির নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলেই নিজেদের কনসুলেট বা দূতাবাস খোলে। সময়ের সাথে সাথে আমেরিকা নিজেই এক বিশাল প্রজাতন্ত্রে পরিণত হওয়ার দৌড়ে শামিল হয় এবং মাত্র এক প্রজন্মের ব্যবধানে আমেরিকার ইতিহাস থেকে মহীশূরের এই বীরত্বের অধ্যায় ধীরে ধীরে মুছে ফেলা হয়।
জর্জ ওয়াশিংটন একাকী আমেরিকার স্বাধীনতা এনে দেননি, আবার হায়দার আলি বা টিপু সুলতানও আমেরিকার জন্য রক্ত ঝরাননি। কিন্তু তাঁরা ব্রিটিশদের এমন এক সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে ফেলে দিয়েছিলেন, যার খরচ ও ধাক্কা সামলাতে গিয়েই জন্ম হয়েছিল পৃথিবীর দুই বৃহত্তম গণতন্ত্রের—আমেরিকা এবং ভারতের।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
