

যুদ্ধবিমান তেজস। ছবি - Google
২৪শে আগস্ট, ২০২৬
দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি তেজসকে ঘিরে ফের বড় প্রশ্ন। যুদ্ধবিমান তৈরিতে আত্মনির্ভরতার স্বপ্ন দেখছে ভারত। কিন্তু সেই যুদ্ধবিমান যখন বায়ুসেনার হাতে পৌঁছবে, তত দিনে তার প্রযুক্তি কি পিছিয়ে পড়বে? তেজসের আরও উন্নত সংস্করণ এমকে-২ নিয়ে এমনই বিস্ফোরক প্রশ্ন তুললেন সদ্য অবসর নেওয়া বায়ুসেনার প্রাক্তন উপপ্রধান এয়ার মার্শাল নাগেশ কপূর। তাঁর সরাসরি মন্তব্য, ২০৩০-এর মাঝামাঝি সময়ে তেজস এমকে-২ পরিষেবায় ঢুকলে সেটি ‘অপারেশনাল’ অর্থে সামনের সারির যুদ্ধবিমান থাকবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
কারণ, চিন যখন পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান থেকে ষষ্ঠ প্রজন্মের প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে, পাকিস্তানও পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান নিয়ে পরিকল্পনা করছে, তখন ভারত যদি ২০৩৫-এর আশপাশে মূলত চতুর্থ প্রজন্মের প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান হাতে পায়, তা হলে তার যুদ্ধ ক্ষমতা কতটা কার্যকর থাকবে? উত্তরে কোনও রাখঢাক রাখেননি কপূর। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, ‘‘অপারেশনালি, নিশ্চিত ভাবেই না।’’
তবে তেজস এমকে-২-কে পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়ার পক্ষেও নন প্রাক্তন বায়ুসেনা কর্তা। তাঁর যুক্তি, অত্যাধুনিক পঞ্চম বা ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান দিয়ে দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি বা সীমান্তে প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিমান মোতায়েন করা সম্ভব নয়। ফলে উন্নত প্রযুক্তির যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি তুলনামূলক ভাবে কম খরচের, কার্যকর এবং সংখ্যায় বেশি বিমানও প্রয়োজন। সেই জায়গায় তেজস এমকে-২-এর ভূমিকা থাকতে পারে।
সমস্যা মূলত সময়ের। তেজস প্রকল্পের প্রথম প্রোটোটাইপ আকাশে উড়েছিল ২০০১ সালে। এর পর বায়ুসেনা তেজস এমকে-১-এর ৪০টি বিমান কেনার সিদ্ধান্ত নেয়। আরও উন্নত এমকে-১এ সংস্করণের ৮৩টি বিমান কেনার জন্য ২০২১ সালে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার চুক্তি হয়। পরে আরও ৯৭টি এমকে-১এ কেনার জন্য ২০২৫ সালে প্রায় ৬২,৩৭০ কোটি টাকার চুক্তির কথাও ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু চুক্তি হলেই তো বিমান হাতে আসে না। সেখানেই সমস্যা। তেজস এমকে-১এ সরবরাহের গতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। মার্কিন সংস্থা জেনারেল ইলেকট্রিকের এফ-৪০৪ ইঞ্জিন সরবরাহে সমস্যা, পাশাপাশি রাডার, অ্যাভিয়নিক্স এবং অস্ত্র-ব্যবস্থার সংযুক্তিকরণে জটিলতা! সব মিলিয়ে উৎপাদন ও সরবরাহের সময়সীমা পিছিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই বিলম্বই তেজস এমকে-২ নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়াচ্ছে। কারণ যুদ্ধবিমানের ক্ষেত্রে শুধু বিমান তৈরি করাই শেষ কথা নয়। যখন সেটি বায়ুসেনায় ঢুকবে, তখন তার রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ব্যবস্থা, অস্ত্র বহনের ক্ষমতা, ইঞ্জিন এবং সেন্সর- সবই প্রতিপক্ষের প্রযুক্তির সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার মতো হতে হবে। কয়েক বছরের বিলম্ব সেখানে একটি গোটা প্রযুক্তিগত প্রজন্মের ব্যবধান তৈরি করে দিতে পারে।
আর সেই জায়গাতেই সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন কপূর। তাঁর অভিযোগ, বায়ুসেনার যে গতিতে যুদ্ধক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড বা HAL সেই গতির সঙ্গে তাল রাখতে পারছে না। আত্মনির্ভরতার প্রয়োজনীয়তা মেনে নিয়েও তাঁর প্রশ্ন, দেশীয় প্রযুক্তির নামে আর কত দিন অপেক্ষা করা সম্ভব?
তেজস এমকে-২-এর সময়সীমাও একাধিক বার বদলেছে। প্রথম দিকে ২০২২ সালে প্রোটোটাইপ সামনে আনার পরিকল্পনা ছিল। পরে সেই সময়সীমা পিছিয়েছে। HAL-এর সাম্প্রতিক আপডেট অনুযায়ী, এমকে-২-এর প্রথম উড়ান ২০২৭ সালের মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
কপূরের বক্তব্যে তাই শুধু তেজসের সমালোচনা নেই, রয়েছে ভারতের ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিমান নীতি নিয়েও সতর্কবার্তা। তাঁর মতে, শুধু চতুর্থ বা সাড়ে চার প্রজন্মের যুদ্ধবিমানে আটকে থাকলে চলবে না। ভবিষ্যতের প্রযুক্তির দিকে এখনই তাকাতে হবে। সেই কারণেই ইউরোপের FCAS কিংবা ব্রিটেন-ইতালি-জাপানের GCAP-এর মতো ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্পে ভারতের অংশগ্রহণের সম্ভাবনাও বিবেচনা করা উচিত বলে মত তাঁর।
অর্থাৎ, প্রশ্নটা তেজস থাকবে কি থাকবে না, এমন নয়। প্রশ্ন হল, তেজস যখন বায়ুসেনার হাতে আসবে, তখন আকাশের যুদ্ধের প্রযুক্তি কতটা বদলে যাবে?
দেশীয় যুদ্ধবিমান তৈরি ভারতের কৌশলগত প্রয়োজন। বিদেশি নির্ভরতা কমানোও জরুরি। কিন্তু প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির দৌড়ে সময়ই সবচেয়ে বড় সম্পদ। আজ যে প্রযুক্তি অত্যাধুনিক, পাঁচ-দশ বছর পরে সেটিই হয়তো সাধারণ মানের। ফলে তেজস এমকে-২-এর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু আকাশে ওড়া নয়, সময়মতো ওড়া।
চিন যখন পরবর্তী প্রজন্মের যুদ্ধবিমানের দিকে এগোচ্ছে, তখন ভারতের সামনে তাই দ্বৈত লড়াই, এক দিকে আত্মনির্ভরতার লক্ষ্য, অন্য দিকে প্রযুক্তির দৌড়ে পিছিয়ে না পড়ার তাগিদ। তেজস এমকে-২ সেই দৌড়ে এগিয়ে থাকবে, না কি আকাশে ওঠার আগেই সময়ের কাছে হেরে যাবে? প্রাক্তন বায়ুসেনা কর্তার মন্তব্যে সেই প্রশ্নই আরও জোরালো হল।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
