

অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও. পি. সিং-এর লেখা বই ‘ডিসিশন ভেলোসিটি' নিয়ে লিখেছেন শশী থারুর। ছবি - Google, গ্রাফিক্স- The Fourth Axis
৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কোনও দরকারে সরকারি অফিসে গিয়ে চক্কর কাটার তিক্ত অভিজ্ঞতা এদেশের সাধারণ মানুষের মজ্জাগত। ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীদের প্রকল্পের অনুমোদনের জন্য একই পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়। সাধারণভাবে মনে করা হয়, এই সব কিছুর মূলে আছে দুর্নীতি। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি কি আদৌ তাই বলছে?
বিষয়টা মোটেও এতটা সরল নয়। দেশের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা UPSC-তে উত্তীর্ণ হয়ে, মেধার সর্বোচ্চ স্তরে থাকা আইএএস বা আইপিএস অফিসাররা কেন চেয়ারে বসার পর এমন স্থবির হয়ে পড়েন, তা অনেককেই ভাবায়। সম্প্রতি অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস আধিকারিক ও. পি. সিং-এর লেখা নতুন বই ‘ডিসিশন ভেলোসিটি’ (Decision Velocity)-র সূত্র ধরে এই গভীর অসুখের জায়গাটিতেই আলো ফেলেছেন কংগ্রেস সাংসদ ও লেখক শশী থারুর।
থারুরের মতে, আমলারা অলস নন, তাঁরা আসলে ভীত। আর এই ভয়ের চোটে বর্তমান ভারতের আমলাতন্ত্রের অলিখিত মন্ত্রই হয়ে দাঁড়িয়েছে- কিছু না করাটাই সবচেয়ে নিরাপদ।
স্বাধীনতার পর সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ভারতীয় আমলাতন্ত্রকে দেশের ‘স্টিল ফ্রেম’ বা ইস্পাতের কাঠামো বলে উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল, এমন এক নির্ভীক প্রশাস ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে তৈরি করা, যারা রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্যেও মেরুদণ্ড সোজা রেখে দেশের কাজ করে যাবে। কিন্তু আজ সেই ফ্রেম একটা জং-ধরা খাঁচায় পরিণত হয়েছে।
এর মূল কারণ হল ‘অডিট’ আর ‘তদন্তের’ জুজু। বর্তমান ব্যবস্থায় একজন সৎ আমলা যদি ঝুঁকি নিয়ে, সম্পূর্ণ সদুদ্দেশ্যে দ্রুত কোনও সিদ্ধান্ত নেন, তবে হয়ত তাঁর কাজের প্রশংসা কেউ করবে না। কিন্তু পাঁচ বা দশ বছর পর যদি সেই সিদ্ধান্তে সামান্য কোনও পদ্ধতিগত ত্রুটি পাওয়া যায়, তবে সিবিআই (CBI), ক্যাগ (CAG) বা ভিজিল্যান্স কমিশনের খাঁড়ার ঘা নেমে আসবে। তাই অবসর নেওয়ার পরেও তদন্তের নামে হেনস্থার শিকার হওয়ার ভয় তাঁদের তাড়া করে বেড়ায়।
আর সেই কারণেই ফাইলে সই করাকে বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বলে মনে করতে শুরু করেছেন আমলাদের এক বিরাট অংশ। তাহলে উপায়? উপায় হল ফাইল ঝুলিয়ে রাখা।
প্রাক্তন আমলা ও. পি. সিং-এর বইটিতে এই মানসিকতার একটি চমৎকার নাম দেওয়া হয়েছে- ‘র্যাশনাল অ্যাবডিকেশন’ (Rational Abdication), অর্থাৎ যুক্তি দিয়ে সচেতনভাবে নিজের দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলা।
এই খেলায় আমলারা সিদ্ধহস্ত। তাঁরা সরাসরি "না" বলেন না। তাঁরা ফাইলে এমন কিছু প্রশ্ন তুলে দেন, যাতে ফাইলটি অন্য কোনও দফতরে মতামতের জন্য চলে যায়। অথবা একটা নতুন কমিটি গড়ে দেন। কিংবা স্রেফ নিজের বদলি হওয়া পর্যন্ত সময় কাটান। উদ্দেশ্য একটাই, "সিদ্ধান্তটায় অন্তত আমার যেন সই না থাকে।"
রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদলের সময় এই প্রবণতা আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে। নতুন সরকার এসে পুরনো সরকারের আমলের কাজের তদন্ত করতে পারে, এই আশঙ্কায় নির্বাচনের আগে প্রশাসন প্রায় পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
আমলাদের এই ব্যক্তিগত পিঠ বাঁচানোর লড়াইয়ের চরম মূল্য চোকাতে হয় দেশকে। শশী থারুর এই অদৃশ্য আর্থিক ক্ষতির নাম দিয়েছেন ‘ফিয়ার ট্যাক্স’।
ধরুন কোনও সেতু বা হাইওয়ে তৈরি হবে। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রিতার কারণে তার অনুমোদন পেতে পাঁচ বছর লেগে গেল। এই পাঁচ বছরে কাঁচামালের দাম বাড়ল, নির্মাণ খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেল। অন্যদিকে একটা কারখানা তৈরি আটকে থাকায় হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হল না। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা লাল ফিতের ফাঁস দেখে বিরক্ত হয়ে অন্য দেশে চলে গেল।
আমলাদের এই ‘নিষ্ক্রিয়তার’ কারণে সমাজ ও অর্থনীতি প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ সুযোগ হারাচ্ছে, তার হিসাব কোনও অডিট রিপোর্টে থাকে না। কিন্তু দেশ ঠিকই সেই মাসুল গুনে চলেছে।
সবচেয়ে আক্ষেপের বিষয় হল, বর্তমান ব্যবস্থায় দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাদের চেয়ে সৎ আমলারাই বেশি ভুক্তভোগী। যিনি অসৎ, তিনি রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে নিজের আখের গুছিয়ে নেন এবং নিজেকে সুরক্ষিত রাখার পথও বের করে ফেলেন। ফাঁদে পড়েন সেই সৎ অফিসাররা, যাঁরা হয়ত নিয়মকানুন একটু এদিক-ওদিক করে হলেও মানুষের জন্য দ্রুত কাজটা করতে চেয়েছিলেন। সিস্টেমের এই গলদ কাজের চেয়ে ‘প্রক্রিয়া’-কে বেশি গুরুত্ব দেয়। কাজটা আদৌ হল কি না, তার চেয়ে বেশি দেখা হয় ফাইলে সব নিয়ম ঠিকঠাক মানা হয়েছে কি না।
শশী থারুর এবং ও. পি. সিং এই ফাঁদ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য কিছু গঠনমূলক সমাধানের কথাও বলেছেন। তাঁদের মতে-
প্রথমত, আমলাদের কাজের মূল্যায়ন পদ্ধতি বদলাতে হবে। কোনও আধিকারিকের কাজ বিচার করতে হবে চূড়ান্ত ফলাফলের ভিত্তিতে, তিনি কতটা অন্ধভাবে নিয়ম মেনেছেন তার ভিত্তিতে নয়। দ্বিতীয়ত, ইচ্ছাকৃত দুর্নীতি আর কাজ করতে গিয়ে হওয়া অনিচ্ছাকৃত ভুলের মধ্যে স্পষ্ট আইনি পার্থক্য টানতে হবে। সদুদ্দেশ্যে নেওয়া কোনও সিদ্ধান্তের (Bona fide decisions) জন্য আমলাদের আইনি সুরক্ষা দেওয়াটা আজ সময়ের দাবি। তৃতীয়ত, যাঁরা ঝুঁকি নিয়ে দ্রুত জনস্বার্থে কাজ করার সাহস দেখান, প্রশাসনে তাঁদের পুরস্কৃত করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
