৯ই জুন, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

নবান্ন ছেড়ে ‘মহাকরণে’ ফেরা? রাইটার্স বিল্ডিং থেকেই সরকার চালানোর ইঙ্গিত

বিধানসভা নির্বাচনে ২০৭টি আসন জিতে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বিজেপির শিবিরে এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস থেমেছে ৮০-এ। ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যের প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জোর জল্পনা—নবান্ন নয়, রাইটার্স থেকেই কি চলবে নতুন সরকারের কাজ?

এই জল্পনার কেন্দ্রে রয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। ভোটের মুখে তিনি স্পষ্টই বলেছিলেন, ক্ষমতায় এলে সচিবালয় সরানো হবে নবান্ন থেকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে। তাঁর বক্তব্যে ছিল রাজনৈতিক বার্তা, “ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ ফিরিয়ে আনতে হবে।”

সেই ঘোষণাই এখন নতুন করে আলোচনায়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট কৌশল। কলকাতার বুকে লাল রঙের ঐতিহাসিক দালান—রাইটার্স বিল্ডিং—শুধু একটি প্রশাসনিক ভবন নয়, বাঙালির আবেগের অংশ। স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি, ঔপনিবেশিক ইতিহাস, পরবর্তী শাসন—সব মিলিয়ে এই ‘মহাকরণ’ বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সেই আবেগকেই ছুঁতে চাইছে গেরুয়া শিবির।

অন্যদিকে, বিজেপির অভিযোগ—নবান্নে বসে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে “কেন্দ্রিক” প্রশাসন চালিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের দাবি, “দূরত্ব তৈরি হয়েছে মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের।” তাই সেই কাঠামো ভেঙে ‘খোলা’ প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে তারা। রাইটার্সে ফেরার সিদ্ধান্তকে তাই শুধু স্থান পরিবর্তন নয়, শাসনদর্শনের পরিবর্তন হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ।

উল্লেখযোগ্য, ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে প্রথমে রাইটার্স থেকেই সরকার চালাতেন মমতা। কিন্তু ২০১৩ সালে ভবনের জীর্ণতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে সচিবালয় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় হাওড়ার নবান্নে। তখন বলা হয়েছিল, সংস্কারের পর ফের রাইটার্সে ফিরবে প্রশাসন। কিন্তু বাস্তবে গত ১৫ বছরে সেই প্রত্যাবর্তন আর হয়নি।

এবার সেই ‘অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি’কে সামনে এনে নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করছে বিজেপি। সূত্রে খবর, রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সংস্কার অনেকটাই এগিয়েছে। ফলে নতুন সরকার সেখানে বসেই কাজ শুরু করতে চাইছে।

এই আবহেই আজ রাজ্যে আসছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। রাজনৈতিক জল্পনা, আজ রাতেই বিজেপি বিধায়ক দলের বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা হতে পারে। সম্ভাব্য মুখ হিসেবে এগিয়ে রয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—দুই কেন্দ্র থেকেই তাঁর জয়, মমতা বন্দোপাধ্যায়কে ভবানীপুরে হারানো, রাজ্য রাজনীতিতে বড় বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রধানমন্ত্রীর তরফেও ইঙ্গিত মিলেছে, পয়লা বৈশাখের দিনই হতে পারে নতুন সরকারের শপথগ্রহণ। সেই অনুযায়ী, মে মাসের মধ্যেই প্রশাসনিক কেন্দ্র নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সামনে আসতে পারে।

সব মিলিয়ে, বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা যেন দরজায় কড়া নাড়ছে। প্রশ্ন একটাই—নবান্নের অধ্যায় কি তবে সত্যিই শেষ? আর রাইটার্স বিল্ডিং কি আবার ফিরে পাবে তার পুরনো পরিচয়, বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে?

অক্ষরের বিদ্রোহ ও এক ভাষার পুনর্জন্ম: রঘুনাথ মুর্মু

আজ জন্মদিন

সব ভাষারই এক জন্মকথা থাকে। কিছু ভাষা জন্মায় রাজসভায়, কিছু বইয়ের পাতায় – আর কিছু ভাষা জন্মায় মানুষের বুকের ভেতর, অরণ্যের ছায়ায় ও ঢেউয়ের শব্দে। সাঁওতালি তেমনই এক ভাষা – যার গল্প ছিলো, স্মৃতি ছিলো, ছিলো সুর কিন্তু কোন অক্ষর ছিলো না। সেই নীরবতার মধ্যে একদিন একজন মানুষ উঠে দাঁড়ালেন – রঘুনাথ মুর্মু। যার ভেতরে লুকিয়ে ছিলো ভাষার মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতির পুনর্জাগরণ, আর নীরব বিপ্লবের এক অনন্য ইতিহাস। রঘুনাথ মুর্মু – সেই নাম যিনি শুধু অক্ষর নির্মাণ করেন নি, আসলে তিনি একটি জাতির আত্মপরিচয় লিখেছেন।

শিকড়ের সন্ধানে

১৯০৫ সালের ৫ মে, ওড়িশার ময়ূরভঞ্জের এক নিভৃত গ্রামে জন্ম। চারপাশে প্রকৃতি, মানুষের সরল জীবন, আর মুখে মুখে বয়ে চলা সাঁওতালি ভাষা। ওড়িয়া ভাষা দ্বারা পরিচালিত একটি স্কুলে পড়ার সময় মাত্র সাত বছর বয়সেই রঘুনাথ বুঝতে পারেন – তাঁদের ভাষা আছে, কিন্তু তা লেখার নিজস্ব কোনো মাধ্যম নেই। বারিপদা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় ক্রমে তিনি বুঝতে পারলেন – একটি ভাষা কেবলমাত্র উচ্চারণে বেঁচে থাকতে পারেনা! তাই বন্ধুরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত, রঘুনাথ মন দিলেন সম্পূর্ণ অন্য খেলায় – এই পৃথিবীর মাটি আর তাতে হাজারো আঁকিবুঁকি! কানে বাজতে থাকা নিজের আপন ভাষার অনুরণনের মধ্যে দিয়ে আঁকতে শুরু করলেন অপ্রচলিত একাধিক চিহ্ন। গভীর অধ্যাবসায়, নিরলস পরিশ্রম আর হাজারো গবেষণা – একটি লিপির সন্ধানে। তিনি তখন বারিপদা উচ্চ বিদ্যালয়ে পাঠরত, মাথার মধ্যে সারাক্ষণ ঘুরপাক খাচ্ছে ভাবনার প্রতিধ্বনি – “একটি ভাষা হারিয়ে গেলে, হারিয়ে যায় একটি পৃথিবী”। ছুটির দিনগুলোয় জনমানবহীন কাপি-বুরু  জঙ্গলে নিভৃতে কাটতো দিন, সঙ্গী শুধুমাত্র খাতা ও কলম।

প্রকৃতি থেকে লিপি

১৯২৫ সাল, এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত – ঘটে গেলো নীরব বিপ্লব। এই কাপি-বুরু জঙ্গলে বসেই  রঘুনাথ মুর্মু সৃষ্টি করলেন ‘অল চিকি ‘- সাঁওতালি ভাষার প্রথম নিজস্ব লিপি। এই লিপি কোনো ধার করা কাঠামো নয়, প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রার এক অবিস্মরণীয় দলিল। অল চিকির প্রতিটি চিহ্নে মাটির গন্ধ, নদীর স্রোত, পাখির ডাক, মানুষের শ্বাস মিশে আছে – যেন একটি ভাষার জীবন্ত শরীর।

মঞ্চে ভাষার বিপ্লব

লিপি তৈরি করেই থেমে থাকেননি রঘুনাথ। তিনি বুঝেছিলেন – অক্ষরকে বাঁচাতে হলে তাকে মানুষের জীবনে ঢুকতে হবে। বাদামতলিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় ১৯৩৬ সালে তিনি লিখে ফেলেন অল চিকি লিপির প্রথম বই – ‘ হড় সেরেঞ ’ । ১৯৪২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম নাটক – ‘বিদু চাঁদান’। রায়রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করাকালীন সমাজের কাছে অল চিকি-কে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই নাটককে সম্বল করে তিনি ময়ুরভঞ্জ, ঝাড়খন্ডের একের পর সাঁওতাল গ্রাম ঘুরতে শুরু করলেন। তাঁর প্রচেষ্টা সফল হলো, সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লো তাঁর নব্য আবিষ্কৃত লিপি আর মানুষ ভালোবেসে তাদের এই প্রিয় শিক্ষকের নাম দিলো – ‘গুরু গোমকে ‘।

স্বীকৃতির সংগ্রাম

একটি লিপি তৈরি করা যতটা কঠিন, তার স্বীকৃতি পাওয়া তার চেয়েও কঠিন। রঘুনাথ মুর্মুকে শুধুমাত্র নিজের ভাষার অধিকারের দাবিতে একাধিক লড়াই লড়তে হয়েছে, করতে হয়েছে আত্মত্যাগ। দেশের স্বদেশী আন্দোলনের সময় অল চিকি লিপির প্রচারের অপরাধে তাঁকে দীর্ঘদিন তাঁর স্ত্রীর সাথে নানা স্থানে আত্মগোপন করে থাকতে হয়েছে। ১৯৪৭-এ স্বাধীন হয়েছে দেশ, কেটেছে বন্দীদশা, যদিও অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু রঘুনাথ থামেননি – ‘দাড়ে গে ধন’ , ‘খেরওয়াল বীর’, ‘সিদো কানহু সান্তাড় হুল’, ‘হিতলৗয়’, ‘বাহা সেরেঞ’, ‘এলখা পতব’  -এর মতো একাধিক নাটক, কাব্যগ্রন্থ এবং অলচিকি লিপির বর্ণপরিচয় – ‘অল উপরুম’ রচনার মধ্যে দিয়ে একটি ভাষাকে সংরক্ষণ করে গেছেন।তারপরেও প্রশাসনিক অবহেলা, শিক্ষাব্যবস্থার অনীহা, সামাজিক প্রতিবন্ধকতা – সবকিছুর বিরুদ্ধে অকল্পনীয় লড়াই থামেনি। তাঁর অদম্য জেদ, নিরলস প্রচেষ্টা এবং সাঁওতাল সপ্রদায়ের দীর্ঘ আন্দোলন অবশেষে জয়ী হয়েছে। বর্তমানে সাঁওতালি ভাষা ভারতের সংবিধানের অষ্টম তফসিলে স্বীকৃতি লাভ করেছে। অল চিকি আজ শুধুই একটি লিপি নয় – এটি একটি সাংস্কৃতিক অধিকার।

স্বপ্ন ও সম্মান

১৯৮২ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি মনের মধ্যে একরাশ স্বপ্ন নিয়ে রঘুনাথ মুর্মু দেহত্যাগ করেন এবং একটি ভাষার জন্য রেখে যান আগামীর অনন্ত সম্ভাবনা।  তাঁর যুগান্তকারী কাজের স্বীকৃতি দিয়ে রাঁচি ইউনিভার্সিটি এই মহান কর্মযোগীকে সম্মানিয় ডক্টরেট উপাধিতে ভূষিত করেছে। বিভিন্ন পুরস্কারের মাধ্যমে ওড়িয়া সাহিত্য একাডেমি তাঁর সাহিত্য কর্মকে সম্মান জানিয়েছে। তাঁর নামে নামাঙ্কিত হয়েছে একাধিক বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়। আজ সাঁওতালি ভাষায় বই লেখা হয়, পড়াশোনা হয়, গবেষণা হয় এবং এই সমস্ত কিছুর মধ্যে দিয়েই নীরবে উচ্চারিত হয় – রঘুনাথ মুর্মুর নাম!

অক্ষরের ভেতরে এক মানুষের স্পন্দন

রঘুনাথ মুর্মুর গল্প আসলে খুব নীরব এক গল্প। এখানে বড় কোনো আওয়াজ নেই, নেই প্রচারের ঝলক। আছে শুধু এক মানুষের গভীর বিশ্বাস – ভাষা মানে পরিচয়, আর পরিচয় মানে অস্তিত্ব। আসলে তিনি কেবল অক্ষর তৈরি করেননি, একটি জাতিকে নিজের নাম লিখতে শিখিয়েছেন।

নন্দীগ্রাম থেকে ভবানীপুর—দু’ময়দানেই শুভেন্দুর জয়ধ্বনি, মমতার ঘাঁটিতে ধাক্কা, বাড়ছে মুখ্যমন্ত্রী জল্পনা

কলকাতা: একসময়ের ‘হটস্পট’ নন্দীগ্রাম। আর একদিকে তৃণমূলের অভেদ্য ঘাঁটি ভবানীপুর। দুই ভিন্ন রাজনৈতিক মঞ্চ—কিন্তু ফল এক।

দু’জায়গাতেই জয়ের হাসি শুভেন্দু অধিকারী-র। ২০২৬-এর নির্বাচনে এই ‘ডাবল স্ট্রাইক’ই বাংলার রাজনীতির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা হয়ে উঠল।
নন্দীগ্রামে প্রায় ১০ হাজার ভোটে জয়—যেখানে ২০২১-এ মাত্র ১৯৫৬ ভোটে জিতেছিলেন তিনি। আর ভবানীপুরে, যেখানে একসময় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেখানেই প্রায় ১৫ হাজার ভোটে পরাজিত হলেন তৃণমূল নেত্রী। সংখ্যার ব্যবধান শুধু জয় নয়, বরং রাজনৈতিক শক্তির পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দিচ্ছে—এমনটাই মনে করছে পর্যবেক্ষকদের একাংশ।

২০২১-এ নন্দীগ্রাম ছিল সরাসরি মমতা বনাম শুভেন্দু দ্বৈরথের প্রতীক। পাঁচ বছর পর সেই লড়াই যেন নতুন মঞ্চে ফিরে এল ভবানীপুরে। তবে এ বার কৌশলগত ভাবে এগিয়ে ছিলেন শুভেন্দু। দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে তিনি বুঝিয়েছিলেন—তৃণমূলের বিরুদ্ধে সরাসরি লড়াইয়ে নামতে হলে প্রতীকী নয়, বাস্তব চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে হবে। সেই ভাবনা থেকেই ভবানীপুর থেকেও তাঁর লড়াই।

প্রচারে সেই আক্রমণাত্মক কৌশলই ধরা পড়েছিল। ভবানীপুরে ঘন ঘন সভা, বুথস্তরে সংগঠনকে চাঙা করা—সব মিলিয়ে লড়াইকে একেবারে ব্যক্তিগত দ্বৈরথে নামিয়ে আনেন শুভেন্দু। ফলত, ভোটের দিন সকালেই রাস্তায় নেমে প্রচারে দেখা যায় মমতাকেও—যা এই কেন্দ্রের গুরুত্বই প্রমাণ করে।
গণনার শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল, ভবানীপুরে লড়াই সহজ নয়। একের পর এক রাউন্ডে ব্যবধান ওঠানামা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফলাফল যখন স্থির হল, তখন দেখা গেল—নিজের ‘দুর্গ’-এই ধাক্কা খেল তৃণমূল নেতৃত্ব।

এই জয়ের প্রেক্ষিত আরও বড় হয়ে উঠছে রাজ্যজোড়া ফলাফলের ছবিতে। কমিশনের হিসেবে ২০০-র বেশি আসনে জয়ী বিজেপি, তৃণমূল নেমে এসেছে ৮০-র ঘরে। অর্থাৎ পালাবদল প্রায় নিশ্চিত। আর সেই সঙ্গেই স্বাভাবিক ভাবেই সামনে আসছে প্রশ্ন—কে হবেন পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী?

দলের অন্দরে সূত্রের দাবি, শেষ মুহূর্তে বড় কোনও অঘটন না ঘটলে সেই দৌড়ে এগিয়ে শুভেন্দুই। শুধু রাজনৈতিক কৌশল নয়, পর পর দু’বার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করার নজির—তাঁর নেতৃত্বের দাবিকে আরও জোরালো করছে বলেই মনে করছেন অনেকেই।

তবে রাজনীতির অঙ্ক সবসময় সরলরৈখিক নয়। দলীয় সমীকরণ, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত—সব কিছু মিলিয়েই চূড়ান্ত নাম ঘোষণা হবে। তবু এই মুহূর্তে যে বার্তাটা স্পষ্ট—নন্দীগ্রাম থেকে ভবানীপুর, বাংলার রাজনৈতিক কেন্দ্রবিন্দুতে এখন একটাই নাম ঘুরপাক খাচ্ছে, শুভেন্দু অধিকারী।

নির্বাচনী লড়াইয়ে হেসেছেন দিন্দারা, ব্যর্থ বাইচুং, অমল দত্তরা

জ্যোতি ও বুলা জিতেছিলেন

১৯৯৮ ব্যাঙ্কক এশিয়ান গেমসের সোনা জয়ী অ্যাথলিট জ্যোতির্ময়ী শিকদার এবং সাঁতারু বুলা চৌধুরী বামফ্রন্টের আমলে ভোটে দাঁড়িয়ে জেতেন । প্রথম জন লোকসভার সাংসদ হন , দ্বিতীয় জন বিধান সভার সদস্যপদ পান ।

হারেন মনোহর আইচ ও অমল দত্ত

বঙ্গ রাজনীতিতে তার আগে এবং পরেও একাধিক ক্রীড়াবিদ ভোটে লড়েছেন, কিন্তু তাদের অধিকাংশই পরাজিত হয়েছেন। বহু আগে, ১৯৭৭ সালের লোকসভা নির্বাচনে কনোজি- আংরে খ্যাত পিনাকী চট্টোপাধ্যায় দক্ষিণ কলকাতা কেন্দ্রে নির্দল প্রার্থী হিসাবে লড়েছিলেন , কিন্তু তেমন কোনও ছাপ ফেলতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে দুই অতী বিখ্যাত ব্যক্তি বডিবিল্ডার মনোহর আইচ ও কোচ অমল দত্তও লোকসভা নির্বাচনে অবতীর্ণ হয়েছিলেন বিজেপি প্রার্থী হিসাবে । বিক্রমের সঙ্গে লড়েছেন, কিন্তু জয় অর্জিত হয় নি ।

নির্বাচনে বাইচুং ব্যর্থ, সফল দিন্দা, প্রসূনরা

সাম্প্রতিক কালে ভারতীয় ফুটবলের সুপার স্টার বাইচুং ভুটিয়া তৃণমূলের টিকিটে প্রথমে দার্জিলিং লোকসভা এবং তারপর শিলিগুড়ি বিধান সভা নির্বাচনে লড়াই কঠিন জেনেও , মাথা উঁচু রেখে শেষ পর্যন্ত লড়েছিলেন । বর্তমান এআইএফএফ সভাপতি , প্রাক্তন গোলরক্ষক কল্যাণ চৌবেও প্রথমে কৃষ্ণনগর লোকসভা এবং তারপর মানিকতলা বিধান সভায় বিজেপির প্রার্থী হিসাবে উদ্যমের সঙ্গে লড়েছেন , কিন্তু এক্ষেত্রেও জয় আসে নি । দীপেন্দু বিশ্বাস তৃণমূলের টিকিটে একবার বসিরহাট বিধান সভার উপনির্বাচনে দাড়িয়ে হেরে গেলেও পরের নির্বাচনে জেতেন । বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেট অধিনায়ক লক্ষ্মী রতন শুক্লা তার প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে লড়তে নেমে শুধু যে জিতেছেন তাই নয় , একই সঙ্গে রাজ্যের মন্ত্রী সভায় ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীও হন । তবে খেলোয়াড়দের মধ্যে নির্বাচনে সর্বাধিক সফল দেশের প্রাক্তন মিডফিল্ডার – অধিনায়ক প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথমবার তৃণমূলের টিকিটে প্রসূন একটা উপনির্বাচনে জেতেন। তারপর ২০১৪ , ২০১৯ এবং ২০২৪ – টানা তিনটি লোকসভা নির্বাচনে জিতে জয়ের হ্যাটট্রিক করে প্রসূন । এই হ্যাটট্রিক আর কারোর নেই । বিদেশ বসুও আবির্ভাবেই গত বিধান সভা নির্বাচনে টিএমসির টিকিটে জিতেছিল । এবারের নির্বাচনেও সে দাড়িয়েছিল । কিন্তু হেরে গেছে ।

ভোটে জিতেছেন ক্রিকেটাররাও

২০২১ এর নির্বাচনেও দুই ক্রিকেটার লড়েছিলেন । মনোজ তিওয়ারি তৃণমূলের হয়ে এবং অশোক দিন্দা বিজেপির হয়ে । দুজনেই জেতে। লক্ষ্মীর মতো মনোজও ক্রীড়া দপ্তরের প্রতি মন্ত্রী হয় । এবার মনোজ অবশ্য ভোটে দাঁড়ায়নি। তবে দিন্দা এবারও দাড়িয়েছে এবং টানা দ্বিতীয়বার জিতলেন। আসলে এই হার – জিত নিয়েই তো জীবন । যেমন খেলার মাঠে , তেমনি ভোট – যুদ্ধেও ।

শূন্য’ ভাঙার স্বস্তি, তবু একার লড়াই! ডোমকল জিতে বিধানসভায় ফিরল সিপিএম

এই ‘এক’ কি আগামী দিনে সংখ্যায় বাড়বে, নাকি আবারও প্রান্তিক হয়ে পড়বে—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে আলিমুদ্দিন থেকে গ্রামবাংলার আড্ডায়

কলকাতা, ৪ মে: দীর্ঘ সাত বছরের রাজনৈতিক অন্ধকারের শেষে একফোঁটা আলো। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় ফের ফিরল সিপিএম—তবে সংখ্যায় মাত্র এক। মুর্শিদাবাদের ডোমকল থেকে জিতে লাল শিবিরের ‘শূন্য’-র গেরো কাটালেন মুস্তাফিজুর রহমান রানা। প্রতীকী হলেও এই জয় বাম রাজনীতির কাছে বড় স্বস্তির।

২০২১ সালে প্রথমবারের মতো বামশূন্য হয়েছিল রাজ্য বিধানসভা। তার আগে ২০১৯ এবং পরে ২০২৪—দু’টি লোকসভা নির্বাচনেও খালি হাতেই ফিরতে হয়েছিল সিপিএমকে। ফলে টানা সাত বছর ধরে ‘শূন্য’ শব্দটাই যেন লেগে গিয়েছিল দলটির সঙ্গে। ২০২৬-এর ভোটে সেই অচলাবস্থা ভাঙল—একটি মাত্র আসনেই হলেও।

ডোমকল কেন্দ্রটি ঐতিহাসিকভাবে বামেদের শক্ত ঘাঁটি। এক সময় প্রাক্তন মন্ত্রী আনিসুর রহমানের হাত ধরে এই আসনে লাল পতাকা উড়েছে বারবার। ২০১১-র পর সেই দখল হারালেও, এক দশক পর ফের ঘুরে দাঁড়াল সিপিএম। তৃণমূলের প্রার্থী, প্রাক্তন আইপিএস হুমায়ুন কবীরকে হারিয়ে জয়ের মুকুট তুলে নিলেন রানা।

এই জয়ের নেপথ্যে কৌশলগত পরিকল্পনাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মুর্শিদাবাদের কয়েকটি আসনকে টার্গেট করেই শূন্যের গেরো কাটতে চেয়েছিল সিপিএম নেতৃত্ব। রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের সেই পরিকল্পনা আংশিক সফল হলেও সামগ্রিক চিত্রে বামেদের দুর্বলতাই স্পষ্ট। এখন বড় চ্যালেঞ্জ—এই একমাত্র বিধায়ককে ধরে রাখা এবং সংগঠনকে নতুন করে গড়ে তোলা।

ফলাফল প্রকাশের পর সেলিম সরাসরি আক্রমণ শানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, “তৃণমূলের সীমাহীন দুর্নীতি ও অপশাসনের বিরুদ্ধেই মানুষ রায় দিয়েছেন। কিন্তু সেই ক্ষোভের ফায়দা তুলেছে বিজেপি।” নির্বাচন প্রক্রিয়ায় এসআইআর, কেন্দ্রীয় বাহিনীর ভূমিকা এবং ‘ভীতির আবহাওয়া’ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।

একই সুর শোনা গিয়েছে সিপিএম নেতা সুজন চক্রবর্তীর গলায়। তাঁর অভিযোগ, “তৃণমূলই বাংলায় বিজেপিকে প্রতিষ্ঠা করেছে।” পাশাপাশি ‘কাটমানি’ ও ‘তোলাবাজি’র রাজনীতির বিরুদ্ধে এবং বিজেপির উত্থানের মোকাবিলায় বৃহত্তর গণআন্দোলনের ডাক দিয়েছেন তিনি। ফল ঘোষণার আবহেই যাদবপুরে লেনিন মূর্তি ‘অবমাননা’র অভিযোগ নতুন করে উত্তেজনা বাড়িয়েছে। সিপিএমের দাবি, বিজেপি সমর্থকেরা মূর্তিতে গেরুয়া আবির মেখে অপমান করার চেষ্টা করে। ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাম নেতারা প্রতিবাদে সরব হন, পরিস্থিতি ঘিরে বাড়ে রাজনৈতিক চাপানউতোর।

সব মিলিয়ে, একদিকে বিজেপির উত্থান, অন্যদিকে তৃণমূলের ধাক্কা—এই দ্বিমুখী চাপের মধ্যেও ডোমকলের জয় সিপিএমের কাছে নিঃসন্দেহে মনোবল বাড়ানোর। তবে বাস্তব বলছে, সামনে পথ এখনও দীর্ঘ ও কঠিন। এই ‘এক’ কি আগামী দিনে সংখ্যায় বাড়বে, নাকি আবারও প্রান্তিক হয়ে পড়বে—সেই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে আলিমুদ্দিন থেকে গ্রামবাংলার আড্ডায়।

পরিবর্তনের পালা’য় বাংলায় উলটপুরাণ ! ‘লুটের’ অভিযোগে সরব মমতা

কলকাতা, ৪ মে: বুথ ফেরত সমীক্ষা ইঙ্গিত দিয়েছিল আগেই—কিন্তু বাস্তবের ছবিটা এতটা নাটকীয় হবে, তা বোধহয় আন্দাজ করতে পারেননি শাসক শিবিরের শীর্ষ নেতারাও। গণনা শুরু হতেই স্পষ্ট, বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে বড়সড় পালাবদলের ইঙ্গিত। ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০০-রও বেশি আসনে এগিয়ে বা জয়ী বিজেপি, আর তৃণমূল নেমে এসেছে তিন অঙ্কের নীচে—এমনই ছবি কমিশন সূত্রে।

২০১১ সালে বামফ্রন্টের পতনের মধ্য দিয়ে যে ‘পরিবর্তন’-এর সূচনা হয়েছিল, ২০২৬-এ সেই বাংলাই যেন দাঁড়িয়ে আর এক মোড়ে—তবে এবার উল্টো স্রোতে। ভোটের আগে ২২৬ আসনের আত্মবিশ্বাস দেখানো তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি ভেঙে পড়েছে গণনার টেবিলে।

এই ফলের নেপথ্যে একাধিক কারণ নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, গত বছরের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এসআইআর (Special Intensive Revision) প্রক্রিয়াই ছিল টার্নিং পয়েন্ট। প্রায় ৯০ লক্ষ ভোটার নাম বাদ পড়ার ঘটনায় ‘ভূতুড়ে ভোটার’ তত্ত্ব সামনে আসে। সেই প্রভাবেই কি বদলেছে অঙ্ক? প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।

সংখ্যার হিসেবও দিচ্ছে স্পষ্ট বার্তা। প্রায় ৯২-৯৩ শতাংশ ভোটদান—বাংলার ইতিহাসে নজিরবিহীন। প্রথম দফায় ২১ লক্ষ এবং দ্বিতীয় দফায় ৯ লক্ষাধিক অতিরিক্ত ভোট পড়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, পরিযায়ী শ্রমিকদের ঘরে ফেরা এই বিপুল ভোটবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

সরকার পাল্টাচ্ছে, নিশ্চিত হতেই মিষ্টি বিলি শুরু। নিজস্ব ছবি।

এবারের নির্বাচনে আরও একটি বড় দিক—হিংসামুক্ত ভোট। দু’দফাতেই বড় সংঘর্ষ বা প্রাণহানির খবর নেই। কড়া নিরাপত্তা, কেন্দ্রীয় বাহিনীর নজিরবিহীন মোতায়েন—সব মিলিয়ে নির্বাচন যেন হয়ে উঠেছিল প্রশাসনিক সক্ষমতার এক বড় পরীক্ষা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে আসছে ভোটের সামাজিক রসায়নও। গ্রামে তৃণমূলের সংগঠন শক্তিশালী থাকলেও শহর ও শহরতলিতে বিজেপির উত্থান স্পষ্ট। সংখ্যালঘু, তফসিলি ও উপজাতি ভোটের বিভাজন তৈরি করেছে নতুন সমীকরণ। দুর্নীতি, কর্মসংস্থান, আইনশৃঙ্খলা—এই ইস্যুগুলিকে সামনে রেখে প্রচার চালায় বিজেপি। পাল্টা তৃণমূল ভরসা রেখেছিল লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কন্যাশ্রী-সহ জনমুখী প্রকল্প এবং বুথ সংগঠনের উপর।

এই সরাসরি লড়াইয়ের বাইরে থেকেও প্রভাব ফেলেছে একাধিক ‘এক্স ফ্যাক্টর’—বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোটের ভোট কাটার সম্ভাবনা, ডিএ ইস্যু, বেকারত্ব, মহিলা ভোট—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছিল জটিল সমীকরণ।

তবে ফলের এই প্রবণতার মাঝেই বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর দাবি, “১০০টিরও বেশি আসন লুট করা হয়েছে।” সোমবার সন্ধ্যায় সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের গণনাকেন্দ্র থেকে বেরোনোর সময় এই অভিযোগ করেন তিনি।

গণনাকেন্দ্রে এ দিন বারবার উত্তেজনার ছবি সামনে এসেছে। দুপুরে কেন্দ্র পৌঁছনোর সময় থেকেই ‘চোর-চোর’ স্লোগানের মুখে পড়েন মমতা। ফের বেরোনোর সময়েও সেই একই স্লোগান ওঠে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের তরফে। এমনকি ‘গো ব্যাক’ স্লোগানও শোনা যায়।

মমতার পৌঁছনোর আগেই সাখাওয়াত মেমোরিয়াল চত্বরে ছড়িয়ে পড়ে উত্তেজনা। তৃণমূল ও বিজেপি কর্মীদের মধ্যে বচসা, চেয়ার ভাঙচুরের অভিযোগ—পরিস্থিতি সামাল দিতে বাড়ানো হয় কেন্দ্রীয় বাহিনীর মোতায়েন। পুলিশ ও জওয়ানরা হস্তক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এদিকে ভবানীপুর কেন্দ্রেও চলছে টানটান লড়াই। কখনও এগিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কখনও শুভেন্দু অধিকারী। ব্যবধান ওঠানামা করছে প্রতিটি রাউন্ডেই—শেষ ফলের জন্য তাই অপেক্ষা আরও দীর্ঘ।

যুদ্ধের ময়দানে এআই? কৃত্রিম মেধা ও মানুষের বিচারবুদ্ধি নিয়ে নতুন বিতর্ক

যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে কৃত্রিম মেধা বা এআই-এর ব্যবহার কতটা যুক্তিসঙ্গত, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সম্প্রতি ‘ক্লড’ (Claude) নামক একটি জনপ্রিয় এআই চ্যাটবটের সাথে এক বিশেষজ্ঞের কথোপকথন এই বিতর্কের আগুনে ঘি ঢেলেছে।

 যখন যন্ত্রের কণ্ঠে বিবেকের স্বর

একটি অনুষ্ঠানে আমেরিকান সাংবাদিক শেন হ্যারিস  জানান, তিনি ক্লডকে  সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন যে, যুদ্ধের ময়দানে লক্ষ্যবস্তু বাছাই করার কাজে তাকে ব্যবহার করা হলে তার কেমন লাগবে? যন্ত্র হলেও ক্লড অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানায় যে বিষয়টি তার কাছে ‘গভীর উদ্বেগের’। ক্লড আরও যোগ করে যে, তাকে তৈরি করা হয়েছে মানুষের উপকারের জন্য—ক্ষতি করার জন্য নয়। একটি স্কুলের ভুল নিশানায় বোমাবর্ষণের প্রসঙ্গ টেনে সে মনে করিয়ে দেয় যে, এআই-এর দেওয়া তথ্যে ভুল থাকলে তার ফল হতে পারে ভয়াবহ।

 ‘অটোমেশন বায়াস’ বা যন্ত্রনির্ভরতার ঝুঁকি

এই আলোচনার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হল ‘অটোমেশন বায়াস’। ক্লড নিজেই স্বীকার করেছে যে, যখন কয়েকশ লক্ষ্যবস্তুর তালিকা এআই তৈরি করে দেয়, তখন রক্তমাংসের মানুষের পক্ষে প্রতিটি খুঁটিয়ে দেখা সম্ভব হয় না। সময়ের চাপে মানুষ কেবল যন্ত্রের দেওয়া তথ্যে সিলমোহর দিয়ে দেয়। এর ফলে প্রকৃত মানুষের বিচারবুদ্ধির বদলে যন্ত্রের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হয়ে দাঁড়ায়, যা অনেক সময় মারাত্মক ভুল ডেকে আনতে পারে।

 ইতিহাসের কলঙ্ক ও নৈতিক দায়

বিগত বছরগুলোতে মার্কিন সামরিক ইতিহাসে এআই-এর ভুল তথ্যের কারণে বেসামরিক নাগরিকদের প্রাণহানির একাধিক নজির রয়েছে। তেহরানের একটি স্কুলে বোমাবর্ষণের মতো ঘটনাগুলো আজও আমাদের তাড়া করে ফেরে। ক্লড-এর মতো উন্নত এআই যখন নিজেই নিজের সীমাবদ্ধতা এবং নৈতিক সংকটের কথা বলে, তখন প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি তবে যুদ্ধের চাবিকাঠি ক্রমশ একটি যান্ত্রিক মস্তিষ্কের হাতে তুলে দিচ্ছি?

প্রযুক্তি বনাম মানবিকতা: ভবিষ্যৎ কোন দিকে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই আমাদের কাজের গতি বাড়াতে পারে ঠিকই, কিন্তু যুদ্ধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে মানুষের ব্যক্তিগত বিচারবুদ্ধি ও সহানুভূতির কোনো বিকল্প নেই। যান্ত্রিক দক্ষতা যেন কোনোভাবেই মানবিক মূল্যবোধকে ছাপিয়ে না যায়, এখন সেটাই সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ।
এই ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল যে, প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে তার নৈতিক ব্যবহারের সীমারেখা টেনে দেওয়াটাও আজ সমান জরুরি।

লাল দুর্গের মহাপতন: ভারতের মানচিত্র থেকে মুছে গেল বাম শাসন

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র এক আমূল পরিবর্তনের সাক্ষী হল। যে কেরল ছিল ভারতীয় বামপন্থীদের শেষ আশ্রয়স্থল, সেখানে পিনারাই বিজয়নের নেতৃত্বাধীন বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের (এলডিএফ) পরাজয় কেবল একটি সরকারের পতন নয়, বরং এক দীর্ঘ ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি। গত পাঁচ দশকে এই প্রথমবার ভারতের কোনো রাজ্যেই আর কোনো কমিউনিস্ট মুখ্যমন্ত্রী রইলেন না।

১৯৭৭ সাল থেকে ভারতের রাজনীতিতে বামপন্থীদের একটি অনন্য প্রভাব ছিল। জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গে ৩৪ বছরের রেকর্ড শাসন হোক কিংবা ত্রিপুরায় দশরথ দেব ও মানিক সরকারের টানা ২৫ বছরের লাল দুর্গ—বামপন্থা ছিল ভারতীয় ফেডারেল কাঠামোর এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঝড়ে বাংলা এবং ২০১৮ ও ২০২৩ সালে বিজেপির আগ্রাসনে ত্রিপুরার পতনের পর কেরলই ছিল বামেদের টিকে থাকার শেষ বাতিঘর। আজ সেই দুর্গটিও ধূলিসাৎ হয়ে গেল।

এই বিপর্যয় জাতীয় রাজনীতিতে বামেদের দরকষাকষির ক্ষমতাকে তলানিতে নিয়ে ঠেকেছে। এক সময় যে বাম নেতারা সংসদ কাঁপাতেন, আজ তাঁরা আক্ষরিক অর্থেই প্রান্তিক। পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই ধস আরও স্পষ্ট হয়। ২০০৪ সালে বামফ্রন্ট যখন ৫৯টি লোকসভা আসন জিতে মনমোহন সিংয়ের ইউপিএ-১ সরকারের ভাগ্যবিধাতা ছিল, তখন সিপিএম একাই পেয়েছিল ৪৩টি আসন। পরমাণু চুক্তি থেকে শুরু করে বিলগ্নীকরণ—প্রতিটি জাতীয় ইস্যুতে বামেদের অঙ্গুলিহেলন ছাড়া এক পা-ও নড়ার ক্ষমতা ছিল না কেন্দ্রের। অথচ আজ পশ্চিমবঙ্গ, কেরল ও ত্রিপুরার মতো তিন প্রধান ঘাঁটি মিলিয়ে বামেদের হাতে মাত্র একজন সাংসদ।

বর্তমান সংসদে বামেদের যে সামান্য উপস্থিতি রয়েছে, তাও মূলত অন্য বড় দলের দাক্ষিণ্যে। তামিলনাড়ুতে ডিএমকে এবং রাজস্থানে কংগ্রেসের কাঁধে ভর করে কোনোমতে টিকে আছে লাল ঝাণ্ডা। ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনে সেই দাপুটে বামপন্থার জায়গায় আজ কেবলই এক কঙ্কালসার উপস্থিতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই শূন্যতা কেবল বামেদের জন্য নয়, বরং ভারতের সামগ্রিক বিরোধী রাজনীতির ভারসাম্যকেও বিঘ্নিত করবে। যে আদর্শগত লড়াই বামপন্থীরা লড়তেন, নির্বাচনী রাজনীতির এই চরম বিপর্যয়ে তার প্রাসঙ্গিকতা এখন বড়সড় অস্তিত্বের সংকটের মুখে। ভারতের রাজনীতির রাজপথ থেকে লাল ঝাণ্ডার এই আকস্মিক প্রস্থান আগামী দিনে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় কী প্রভাব ফেলে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

image: peoples democracy

গণনার দিন ‘নিঃশব্দ’ বাংলা! রাস্তা সুনসান, টিভি-মোবাইলে চোখ, তবু জীবিকার টানে কাজে ব্যস্ত একাংশ

কলকাতা, ৪ মে: সকাল থেকেই যেন অন্য এক বাংলার ছবি। ভোট গণনার উত্তেজনায় গোটা রাজ্য কার্যত থমকে। শহর কলকাতা থেকে জেলা, মফস্বল—সব জায়গাতেই রাস্তাঘাট প্রায় জনশূন্য। দোকানপাটের অধিকাংশই বন্ধ, মোড়ে মোড়ে বসে শুধু পুলিশ কর্মীরা।

কিন্তু এই নিস্তব্ধতার মাঝেও জীবনের চাকা থেমে নেই অনেকেরই। একাংশ মানুষ রয়েছেন, যাঁদের কাছে ভোট হোক বা গণনা—কাজই শেষ কথা। ভোরবেলা দুধের ডেলিভারি দেওয়া যুবক, কাগজওয়ালা, চায়ের দোকানদার, মাছ-মাংস-সবজি বিক্রেতা—সবাই নিজের মতো করে দিন শুরু করেছেন। পাশাপাশি অনলাইন খাবার পরিষেবা কিংবা বিভিন্ন সামগ্রীর ডেলিভারি কর্মীরাও ছুটে বেড়াচ্ছেন শহরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের ক্ষেত্রে তো চাপ আরও বেশি। একের পর এক আপডেট পৌঁছে দিতে তাঁদের ব্যস্ততা তুঙ্গে। অন্যদিকে, বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের অনেককেই এ দিন অফিসমুখী হতে দেখা গিয়েছে। ট্রেনেও ভিড় নজর কেড়েছে। তাঁদের সোজাসাপ্টা বক্তব্য, “ভোট হোক বা ভোটের গণনা—কাজ না করলে খাব কী!”

রাস্তায় যাঁদের বেরোতেই হয় আরও অন্যান্য জরুরী পরিষেবায় নিযুক্ত অজস্র মানুষের সাথে। ফাইল ছবি: Google

তবে কাজের ফাঁকেও তাঁদের চোখ কিন্তু টিভির পর্দায় কিংবা মোবাইল স্ক্রিনে। কার দখলে যাবে বাংলা—এই প্রশ্নেই এখন সকলের কৌতূহল। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশাও স্পষ্ট—সরকারে যে-ই আসুক, কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে। কাজের খোঁজে রাজ্যের যুবকদের বাইরে পাড়ি দিতে না হয়, সেটাই কাম্য। এর পাশাপাশি আরও একটি বড় উদ্বেগ—ভোট-পরবর্তী হিংসা। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অনেকেই চাইছেন, এ বার যেন কোনওভাবেই অশান্তির পুনরাবৃত্তি না ঘটে। তাঁদের মতে, উন্নয়নের প্রথম শর্তই শান্তি।

উল্লেখ্য, বাংলার ভোট মানেই অশান্তির আশঙ্কা—এই ধারণা বহুদিনের। তবে এবারের নির্বাচনে নজিরবিহীন কড়া নিরাপত্তার মধ্যে মোটের ওপর শান্তিপূর্ণভাবেই ভোটপর্ব সম্পন্ন হয়েছে। খুচরো অশান্তি ছাড়া বড় কোনও ঘটনা ঘটেনি। ভোট-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে মোতায়েন রয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনীও।

এ দিকে, বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত গণনার ট্রেন্ডে স্পষ্ট, হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে। কখনও এগিয়ে যাচ্ছে তৃণমূল, কখনও বা বিজেপি—একেবারে সাপ-লুডোর খেলার মতো ওঠানামা করছে ফলাফল। ভোট-পরবর্তী সমীক্ষার ইঙ্গিতও যেন এই টানটান লড়াইয়ের দিকেই ছিল। এ ছাড়াও নজর রয়েছে বামেদের দিকেও—তাঁদের ভোট শতাংশ বাড়ে কি না, তা নিয়েও কৌতূহল কম নয়।

সব মিলিয়ে, নিস্তব্ধতার আবরণে ঢাকা আজকের বাংলা—কিন্তু তার অন্তরে চলছে প্রবল রাজনৈতিক স্পন্দন। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা—কার হাতে উঠবে বাংলার শাসনভার আগামী পাঁচ বছরের জন্য।

ব্যালটে বন্দি রায়— আজই ঠিক হবে বাংলার মসনদের মালিক কে

কলকাতা: অবশেষে অপেক্ষার অবসান। টানটান উত্তেজনা, জল্পনা-কল্পনা আর রাজনৈতিক তরজার পর আজ, সোমবার সকাল থেকেই শুরু হয়েছে ২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনা। রাজ্যের বিভিন্ন গণনা কেন্দ্রে সকাল ৮টা থেকেই খুলেছে ইভিএমের তালা! আর কয়েক ঘন্টা পরেই পরিষ্কার হতে শুরু করবে ক্ষমতার সমীকরণ।

দু’দফার ভোটপর্ব শেষ হওয়ার পর থেকেই গোটা বাংলার নজর ছিল এই দিনটির দিকে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের নির্বাচন ছিল বহু বছরের মধ্যে অন্যতম হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। একদিকে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস, অন্যদিকে প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপি— এই দুই শক্তির মধ্যে সরাসরি সংঘর্ষই মূল আকর্ষণ। তবে কিছু আসনে কংগ্রেস, বামফ্রন্ট এবং আইএসএফ-ও লড়াইকে ত্রিমুখী করেছে।

গণনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে পোস্টাল ব্যালট দিয়ে। অর্থাৎ প্রথমেই গণনা ডাকযোগে দেওয়া ভোট— যেখানে পরিষেবা কর্মী ও বিশেষ ভোটারদের ভোট থাকে। তার পর ধাপে ধাপে শুরু হবে ইভিএমের ভোট গণনা। প্রতিটি রাউন্ডের শেষে প্রকাশিত হবে ট্রেন্ড, যা ক্রমশ স্পষ্ট করে তুলবে কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে। নির্বাচনী কমিশনের তরফে নির্দিষ্ট বুথে ভিভিপ্যাট মিলিয়েও দেখা হবে ফলাফলের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে।

রাজ্যের ২৯৪টি আসনের প্রতিটিতেই আজ নির্ধারিত হবে ভবিষ্যৎ। বিশেষ নজর রয়েছে ভবানীপুর, নন্দীগ্রাম, আসানসোল দক্ষিণ, বহরমপুরের মতো একাধিক ‘হাই-প্রোফাইল’ কেন্দ্রে। কোথাও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী বনাম বিরোধী শিবিরের শক্তিশালী মুখ, কোথাও আবার ত্রিমুখী লড়াই— ফলে প্রতিটি ফলাফলই হতে পারে চমকপ্রদ।

ভোট গণনাকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই রাজ্য জুড়ে কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি গণনা কেন্দ্রে রয়েছে বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়, সিসিটিভি নজরদারি এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর মোতায়েন। কোনওরকম অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে প্রশাসন সতর্ক।

রাজনৈতিক দলগুলিও প্রস্তুত। গণনা কেন্দ্রে উপস্থিত প্রত্যেক দলের প্রশিক্ষিত কাউন্টিং এজেন্টরা। শেষ মুহূর্তে কোনও অনিয়ম যাতে না হয়, তার জন্য সব পক্ষই নজরদারি বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, বিভিন্ন শিবিরে আত্মবিশ্বাসও তুঙ্গে— কেউ বলছে ‘২০০ পার’, কেউ আবার দাবি করছে ‘পরিবর্তন আসছে’।

এদিকে এক্সিট পোল নিয়ে বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়েছে উত্তেজনা। কোথাও তৃণমূলের এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত, কোথাও বিজেপির শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা ফলে চূড়ান্ত ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা তুঙ্গে।
সকাল গড়াতেই আসতে শুরু করবে প্রথম দফার ট্রেন্ড। তবে স্পষ্ট ছবি পেতে সময় লাগবে কয়েক ঘণ্টা। দুপুরের মধ্যেই জানা যাবে বাংলার পরবর্তী সরকার কার হাতে যাচ্ছে।

আজকের দিনটি তাই শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নয়, গোটা বাংলার জন্যই এক ঐতিহাসিক দিন। গণনার প্রতিটি রাউন্ডের সঙ্গে বদলাবে সমীকরণ, উঠবে-নামবে আবেগ। শেষ পর্যন্ত কার মুখে হাসি, আর কার কপালে ভাঁজ! সেই উত্তর মিলবে আজই।