বিধানসভা নির্বাচনে ২০৭টি আসন জিতে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর বিজেপির শিবিরে এখন এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেস থেমেছে ৮০-এ। ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যের প্রশাসনিক ভবিষ্যৎ নিয়ে জোর জল্পনা—নবান্ন নয়, রাইটার্স থেকেই কি চলবে নতুন সরকারের কাজ?
এই জল্পনার কেন্দ্রে রয়েছেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। ভোটের মুখে তিনি স্পষ্টই বলেছিলেন, ক্ষমতায় এলে সচিবালয় সরানো হবে নবান্ন থেকে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে। তাঁর বক্তব্যে ছিল রাজনৈতিক বার্তা, “ঐতিহ্যের সঙ্গে সংযোগ ফিরিয়ে আনতে হবে।”
সেই ঘোষণাই এখন নতুন করে আলোচনায়।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট কৌশল। কলকাতার বুকে লাল রঙের ঐতিহাসিক দালান—রাইটার্স বিল্ডিং—শুধু একটি প্রশাসনিক ভবন নয়, বাঙালির আবেগের অংশ। স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতি, ঔপনিবেশিক ইতিহাস, পরবর্তী শাসন—সব মিলিয়ে এই ‘মহাকরণ’ বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে এক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। সেই আবেগকেই ছুঁতে চাইছে গেরুয়া শিবির।
অন্যদিকে, বিজেপির অভিযোগ—নবান্নে বসে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে “কেন্দ্রিক” প্রশাসন চালিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁদের দাবি, “দূরত্ব তৈরি হয়েছে মানুষের সঙ্গে প্রশাসনের।” তাই সেই কাঠামো ভেঙে ‘খোলা’ প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে তারা। রাইটার্সে ফেরার সিদ্ধান্তকে তাই শুধু স্থান পরিবর্তন নয়, শাসনদর্শনের পরিবর্তন হিসেবেই দেখছে রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ।
উল্লেখযোগ্য, ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে প্রথমে রাইটার্স থেকেই সরকার চালাতেন মমতা। কিন্তু ২০১৩ সালে ভবনের জীর্ণতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে সচিবালয় সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় হাওড়ার নবান্নে। তখন বলা হয়েছিল, সংস্কারের পর ফের রাইটার্সে ফিরবে প্রশাসন। কিন্তু বাস্তবে গত ১৫ বছরে সেই প্রত্যাবর্তন আর হয়নি।
এবার সেই ‘অসমাপ্ত প্রতিশ্রুতি’কে সামনে এনে নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করছে বিজেপি। সূত্রে খবর, রাইটার্স বিল্ডিংয়ের সংস্কার অনেকটাই এগিয়েছে। ফলে নতুন সরকার সেখানে বসেই কাজ শুরু করতে চাইছে।
এই আবহেই আজ রাজ্যে আসছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। রাজনৈতিক জল্পনা, আজ রাতেই বিজেপি বিধায়ক দলের বৈঠকের পর মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা হতে পারে। সম্ভাব্য মুখ হিসেবে এগিয়ে রয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী। নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুর—দুই কেন্দ্র থেকেই তাঁর জয়, মমতা বন্দোপাধ্যায়কে ভবানীপুরে হারানো, রাজ্য রাজনীতিতে বড় বার্তা দিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রধানমন্ত্রীর তরফেও ইঙ্গিত মিলেছে, পয়লা বৈশাখের দিনই হতে পারে নতুন সরকারের শপথগ্রহণ। সেই অনুযায়ী, মে মাসের মধ্যেই প্রশাসনিক কেন্দ্র নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সামনে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, বাংলার রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা যেন দরজায় কড়া নাড়ছে। প্রশ্ন একটাই—নবান্নের অধ্যায় কি তবে সত্যিই শেষ? আর রাইটার্স বিল্ডিং কি আবার ফিরে পাবে তার পুরনো পরিচয়, বাংলার ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে?

