বালির মধ্যে সোনার কণা পাওয়ার শতাব্দীপ্রাচীন রহস্য। ছবি - Google
৮ই জুন, ২০২৬
ঝাড়খণ্ড থেকে পশ্চিমবঙ্গ, তারপর ওড়িশা— প্রায় ৪৭০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে সুবর্ণরেখা। নামের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে সোনার ইঙ্গিত। কিন্তু সত্যিই কি এই নদীর বালিতে মেলে সোনা? নাকি সবটাই লোককথা? রহস্যের জট আজও পুরোপুরি কাটেনি।
রূপকথার গল্পে সোনার নদীর কথা শোনা যায়। কিন্তু ভারতের বুকে এমন একটি নদী রয়েছে, যার নামের অর্থই ‘সোনার রেখা’। সেই নদীর নাম সুবর্ণরেখা নদী। ঝাড়খণ্ডের রাঁচির কাছে উৎপত্তি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের ঝাড়গ্রাম ও পূর্ব মেদিনীপুর ছুঁয়ে ওড়িশার বালেশ্বর হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিশেছে এই নদী। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের দাবি— নদীর বালির মধ্যে পাওয়া যায় সোনার কণা। আর সেই দাবির পক্ষে রয়েছে কিছু বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণও।
‘সুবর্ণ’ অর্থ সোনা, আর ‘রেখা’ অর্থ দাগ বা রেখা। ইতিহাসবিদদের একাংশের মতে, রাঁচির কাছে পিস্কা অঞ্চলে প্রাচীনকালে সোনা আহরণের প্রমাণ মিলেছিল। সেই কারণেই নদীর এমন নামকরণ। স্থানীয় কিংবদন্তিও বলে, নদীর তলদেশে সোনার কণা দেখতে পেয়েছিলেন মানুষ, সেখান থেকেই ‘সুবর্ণরেখা'।

ঝাড়খণ্ডের কিছু এলাকায় এখনও বহু পরিবার নদীর বালি ধুয়ে ক্ষুদ্র সোনার কণা সংগ্রহ করেন। বর্ষা বাদ দিলে বছরের প্রায় সব সময়ই এই কাজ চলে। এক একটি কণা কখনও চালের দানার মতো, কখনও তারও ছোট। মাসভর পরিশ্রম করে কয়েক ডজন সোনার কণা পাওয়া যায় বলে স্থানীয়দের দাবি।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, এই সোনা আসে কোথা থেকে?
ভূতত্ত্ববিদদের মতে, সুবর্ণরেখার অববাহিকা খনিজে সমৃদ্ধ ছোটনাগপুর মালভূমির উপর দিয়ে প্রবাহিত। নদীর উপনদীগুলি সোনাবাহী শিলা ও খনিজস্তর ক্ষয় করে ক্ষুদ্র সোনার কণা নদীতে এনে ফেলতে পারে। দীর্ঘদিনের ক্ষয়প্রক্রিয়ায় সেই কণাগুলি নদীর বালিতে জমা হয়।
তবে সমস্যাও রয়েছে। নদীতে সোনার অস্তিত্বের ব্যাখ্যা মিললেও, এত দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত সোনার কণা পাওয়া যাচ্ছে কেন, তার নির্দিষ্ট উৎস এখনও চিহ্নিত করা যায়নি। কোনও বড় সোনার খনি বা বিশাল আকরিক ভাণ্ডারের সন্ধান এখনও মেলেনি। ফলে রহস্য রয়েই গিয়েছে।
আধুনিক ভূতাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, নদীর বালিতে যে সোনা পাওয়া যায়, তাকে বলা হয় ‘অ্যালুভিয়াল গোল্ড’ বা পলিবাহিত সোনা। পাহাড়ি অঞ্চলের সোনাযুক্ত শিলা ক্ষয়ে ক্ষয়ে ক্ষুদ্র কণা নদীতে এসে জমা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তেই এমন ঘটনা দেখা যায়। সুবর্ণরেখার ক্ষেত্রেও সম্ভবত সেই প্রক্রিয়াই কাজ করছে।
তবে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও গবেষণা সামনে আসেনি যা শতভাগ নিশ্চিতভাবে বলেছে, সোনার মূল উৎস কোথায় এবং কী পরিমাণ সোনা প্রতি বছর নদীতে জমা হচ্ছে।
এই নদী শুধু ভূতাত্ত্বিক কৌতূহলের বিষয় নয়, বাংলার সংস্কৃতিরও অংশ। পরিচালক ঋত্বিক ঘটক তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র সুবর্ণরেখা-র নাম রেখেছিলেন এই নদীর নামেই। সাহিত্যেও বারবার ফিরে এসেছে সুবর্ণরেখার উল্লেখ।
রহস্যের শেষ কোথায়?
নদীর জলে সোনা ভাসে না। কিন্তু নদীর বালিতে সোনার সূক্ষ্ম কণা যে সত্যিই পাওয়া যায়, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তেমন দ্বিমত নেই। তবু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন— সেই সোনা আসছে কোথা থেকে? তার উত্তর আজও অধরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্ভবত ছোটনাগপুরের পাহাড়, খনিজসমৃদ্ধ শিলা আর হাজার বছরের প্রাকৃতিক ক্ষয়প্রক্রিয়া মিলেই তৈরি করেছে এই বিস্ময়। কিন্তু সুবর্ণরেখার বুকের সেই ‘সোনার রেখা’ এখনও পুরোপুরি পড়ে ফেলতে পারেননি বিজ্ঞানীরাও। তাই ভারতের অন্যতম রহস্যময় নদী হিসেবে সুবর্ণরেখার আকর্ষণ আজও অমলিন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।