আইএমএফের সাম্প্রতিক রিপোর্টে জানা গেছে, চলতি ২০২৬ সালে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের মাথাপিছু মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন (জিডিপি) কিছুটা বেশি হতে পারে। বর্তমান মার্কিন ডলারের মূল্যে এই বছর বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় দাঁড়াতে পারে ২,৯১১ ডলারে, যেখানে ভারতের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি হবে ২,৮১২ ডলার। অর্থনৈতিক এই লড়াইয়ে ভারতের মতো বিশাল বাজারকে একটি ছোট প্রতিবেশী দেশ টেক্কা দেওয়ায় আন্তর্জাতিক স্তরে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।
ডলারের হিসাবে বারবার বদলাচ্ছে সমীকরণ
চলতি ডলারের হিসাবে ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি বেশি হওয়ার ঘটনা কিন্তু এবারই প্রথম নয়, এর আগে ২০১৮ সাল থেকে টানা সাত বছর এই সূচকে বাংলাদেশ ভারতের চেয়ে এগিয়ে ছিল। তবে গত ২০২৫ সালে এসে বাংলাদেশি টাকার মান ডলারের বিপরীতে আচমকা অনেকটাই কমে যাওয়ায় ভারত আবার সাময়িকভাবে শীর্ষস্থান ফিরে পেয়েছিল। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু ভারতের এই পিছিয়ে পড়াকে ‘স্তম্ভিত করার মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ওঠানামার পেছনে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের চেয়ে দুই দেশের মুদ্রার বিনিময় হারের (Exchange Rate) তারতম্যই প্রধান কারণ。
আসল চিত্র ফুটে উঠছে ক্রয়ক্ষমতায়
চলতি ডলারের হিসাব আমাদের সাময়িক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির একটি চিত্র দিলেও, কোন দেশের সাধারণ মানুষ বাস্তবে কেমন আছেন তা পুরোপুরি স্পষ্ট করে না। এর জন্য দেখতে হবে ‘ক্রয়ক্ষমতার সমতা’ বা পার্চেজিং পাওয়ার প্যারিটি (PPP) ভিত্তিক মাথাপিছু জিডিপি। এই সূচকে মুদ্রার ওঠানামাকে বাদ দিয়ে দেখা হয় যে, স্থানীয় মুদ্রা দিয়ে নিজ দেশে একজন মানুষ বাস্তবে কতটা পণ্য বা সেবা কিনতে পারছেন। আর এই পিপিপি (PPP) সূচকে আধুনিক যুগে সবসময়ই ভারত বাংলাদেশের চেয়ে বেশ বড় ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে।
দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাসে এগিয়ে কোন দেশ?
২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পিপিপি ডলারে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হল ১১,৭৮৯ ডলার, যা বাংলাদেশের (১০,২৭১ ডলার) চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ বেশি। আইএমএফের দীর্ঘমেয়াদী প্রক্ষেপণ বলছে, ২০২৬ সালের এই সাময়িক ধাক্কা কাটিয়ে ২০২৭ সালেই ভারত আবার চলতি ডলারের হিসাবেও নিজের শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধার করবে। শুধু তাই নয়, ২০৩১ সালের মধ্যে এই দুই প্রতিবেশীর পিপিপি ব্যবধান আরও বেড়ে প্রায় ২৪ শতাংশে পৌঁছাবে, যেখানে ভারতের মাথাপিছু আয় হবে ১৮, ৪৮৫ ডলারে এবং বাংলাদেশের হবে ১৪,৮৫৭ ডলার। ফলে সাময়িক বৈচিত্র্য থাকলেও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক দৌড়ে ভারত নিজের আধিপত্য বজায় রাখছে।
চোখ হলুদ, প্রস্রাবের রং গাঢ়, শরীর দুর্বল— অনেকেই ভাবেন এটাই বুঝি জন্ডিস রোগ। কিন্তু জন্ডিস নিজে কোনও রোগ নয়, বরং শরীরের ভিতরে লুকিয়ে থাকা একাধিক সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে ত্বক, চোখের সাদা অংশ এবং কখনও শরীরের অন্যান্য অংশ হলুদ হয়ে যায়। আর তখনই ধরা পড়ে জন্ডিসের উপসর্গ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মূলত তিন ধরনের জন্ডিস দেখা যায়— প্রি-হেপাটিক, হেপাটিক ও পোস্ট-হেপাটিক।
১) প্রি-হেপাটিক জন্ডিস
এই ধরনের জন্ডিসে অতিরিক্ত হারে লোহিত রক্তকণিকা ভেঙে যাওয়ার ফলে বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে যায়। লিভার সেই অতিরিক্ত বিলিরুবিন সামলাতে পারে না।
কোন কোন কারণে হতে পারে?
ম্যালেরিয়া
সিকল সেল ডিজিজ
জেনেটিক সমস্যা
কীভাবে বোঝা যায়?
রক্তে Unconjugated bilirubin বেশি থাকে
প্রস্রাবে Bilirubin থাকে না
প্রস্রাবের রং স্বাভাবিক থাকে
মলের রং গাঢ় খয়েরি হয়
Liver enzyme সাধারণত স্বাভাবিক থাকে
২) হেপাটিক জন্ডিস
লিভারের কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা বিলিরুবিন প্রক্রিয়াকরণে সমস্যা হলে এই জন্ডিস হয়।
কোন কোন কারণে হতে পারে?
হেপাটাইটিস
লিভার সিরোসিস
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কীভাবে বোঝা যায়?
রক্তে Conjugated ও Unconjugated— দুই ধরনের বিলিরুবিনই বাড়ে
প্রস্রাব গাঢ় হলুদ হয়
প্রস্রাবে Conjugated bilirubin পাওয়া যায়
Liver enzyme-এর মাত্রা বৃদ্ধি পায়
৩) পোস্ট-হেপাটিক জন্ডিস
পিত্তনালীতে বাধা তৈরি হলে বিলিরুবিন শরীর থেকে বেরোতে পারে না। তখন এই ধরনের জন্ডিস হয়।
কোন কোন কারণে হতে পারে?
গলস্টোন
প্যানক্রিয়াটাইটিস
টিউমার
কীভাবে বোঝা যায়?
রক্তে Conjugated bilirubin অত্যন্ত বেশি থাকে
প্রস্রাবে Urobilinogen অনুপস্থিত থাকে
প্রস্রাবের রং গাঢ় হয়
মল ফ্যাকাশে বা মাটির মতো সাদা হয়ে যায়
Liver enzyme অত্যন্ত বেশি থাকে
জন্ডিসের সাধারণ লক্ষণ
চোখ ও ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া
প্রস্রাবের রং গাঢ় হলুদ বা খয়েরি হওয়া
ফ্যাকাশে মল
শরীরে চুলকানি
দুর্বলতা ও খিদে কমে যাওয়া
বমিভাব বা জ্বর
জন্ডিসে রক্তপরীক্ষা। প্রতীকী ছবি – Google, গ্রাফিক্স – দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
কী চিকিৎসা প্রয়োজন?
জন্ডিসের চিকিৎসা নির্ভর করে আসল কারণের উপর। তাই শুধুমাত্র ঘরোয়া টোটকা নয়, দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
চিকিৎসকেরা সাধারণত যে পরামর্শ দেন—
পর্যাপ্ত জল পান করতে হবে
তৈলাক্ত ও মশলাদার খাবার এড়াতে হবে
বিশ্রাম নিতে হবে
লিভারের ক্ষতি করতে পারে এমন ওষুধ এড়াতে হবে
প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা, আল্ট্রাসোনোগ্রাফি বা লিভার ফাংশন টেস্ট করাতে হবে
তাই জন্ডিসকে হালকাভাবে নিলে বিপদ বাড়তে পারে। কারণ এর পিছনে লিভারের মারাত্মক অসুখ, সংক্রমণ বা পিত্তনালীর জটিল সমস্যা লুকিয়ে থাকতে পারে। তাই চোখ বা ত্বকে হলুদ ভাব দেখলেই দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
‘ঘাটের কাছে গল্প বলে নদীর জল’: কলকাতার নদী-বন্দর হেরিটেজ, বর্তমান দুর্দশা ও ভবিষ্যতের সন্ধিক্ষণ
কলকাতার জন্ম কোনও রাজপ্রাসাদকে ঘিরে নয়, জন্ম এক নদীকে ঘিরে। ভাগীরথী-হুগলি নদীর তীরেই গড়ে উঠেছিল বাণিজ্যের সেই উপনিবেশিক নগর, যার নাম পরে হয়ে ওঠে কলকাতা। এই শহরের ইতিহাসে নদী শুধু জলরেখা নয়, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং নগর-সভ্যতার প্রধান অক্ষ। আজও হাওড়া ব্রিজ (Howrah Bridge), প্রিন্সেপ ঘাট (Prinsep Ghat) কিংবা বাবুঘাটের দিকে তাকালে সেই নদীকেন্দ্রিক শহরের স্মৃতি ভেসে ওঠে। কিন্তু প্রশ্ন হল— যে নদী কলকাতাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল, আজ সেই নদী ও বন্দরকে কি কলকাতা বাঁচিয়ে রাখতে পারছে?
ঔপনিবেশিক আমলে কলকাতা ছিল ব্রিটিশ ভারতের প্রধান নদীবন্দর। Syama Prasad Mookerjee Port-এর পূর্বসূরি কলকাতা পোর্টই ছিল উপমহাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার। গবেষকদের মতে, ভারতের একমাত্র বড় riverine port বা নদীবন্দর হিসেবে কলকাতার আলাদা ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই গৌরবের শরীরে জমেছে পলি, অব্যবস্থা ও রাজনৈতিক উদাসীনতা।
নদী ও শহরের সম্পর্ক: শুধু বাণিজ্য নয়, এক সাংস্কৃতিক ভূগোল
কলকাতা বন্দর – প্রতীকী চিত্র। গ্রাফিক্স – দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস
কলকাতার ঘাট-সংস্কৃতি একসময় ছিল শহুরে জীবনের কেন্দ্র। ভোরের স্নান, সন্ধ্যার আরতি, নৌকা-বাণিজ্য, বিসর্জন, সাহিত্যিক আড্ডা— সবই নদীকে ঘিরে। গবেষকরা হুগলি নদীতীরকে cultural landscape বা সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্য হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে স্থাপত্য ও প্রকৃতি একে অপরের পরিপূরক
খিদিরপুর ডক, গার্ডেনরিচ, আর্মেনিয়ান ঘাট, বাবুঘাট— প্রতিটি জায়গা বহন করে বহুস্তরীয় ইতিহাস। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জাহাজ যেমন এখানে নোঙর ফেলেছে, তেমনই স্বাধীনতা আন্দোলনের গোপন যোগাযোগও চলেছে এই নদীপথে। কলকাতার বহু বনেদি পরিবারের উত্থানও এই নদী-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত।
কিন্তু স্বাধীনতার পর ধীরে ধীরে নদীর সঙ্গে শহরের সম্পর্ক বদলাতে শুরু করে। নদী হয়ে ওঠে শহরের পেছনের উঠোন ! যেখানে ফেলা যায় বর্জ্য, নোংরা ও পরিকল্পনাহীন নির্মাণ।
পলির নিচে চাপা পড়ছে বন্দর
পলি পড়ে যাচ্ছে নদীর ঘাটে। ছবি – Google, গ্রাফিক্স – দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস
কলকাতা বন্দরের সবচেয়ে বড় সংকট তার ভৌগোলিক অবস্থান। সমুদ্র থেকে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার ভিতরে অবস্থিত এই নদীবন্দরে বড় জাহাজ আনতে হলে নিয়মিত ড্রেজিং বা পলি অপসারণ জরুরি। কিন্তু বছর বছর বিপুল অর্থ খরচ করেও নদীর নাব্যতা কমছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় যেখানে ৯ মিটার ড্রাফট ছিল, এখন তা অনেক ক্ষেত্রে ৭ মিটারের আশেপাশে নেমে এসেছে।
এর ফলে বড় আন্তর্জাতিক কার্গো জাহাজ কলকাতায় ঢুকতে চায় না। অনেক জাহাজকে হলদিয়ায় মাল নামিয়ে ছোট জাহাজে কলকাতায় পাঠাতে হয়। এতে সময় ও খরচ দুই-ই বাড়ছে। একসময়ের বাণিজ্যিক রাজধানী আজ লজিস্টিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
বন্দরের সঙ্গে যুক্ত বহু পুরনো শিল্পাঞ্চলও আজ মৃতপ্রায়। খিদিরপুর ও গার্ডেনরিচের শ্রমজীবী সংস্কৃতি বদলে গেছে। ডকের আশেপাশে একসময় যে অর্থনৈতিক চাঞ্চল্য ছিল, তা এখন অনেকটাই স্মৃতিনির্ভর।
নদীর পরিবেশগত সংকট
শহরের পানীয় জল, নিকাশি ও জলবায়ুর ভারসাম্যের সঙ্গে জড়িয়ে হুগলি নদী। কিন্তু দূষণ ও নগরায়নের চাপে নদী ও জলাভূমি বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে পূর্ব কলকাতা জলাভূমি, যাকে অনেকেই শহরের কিডনি বলেন, যা ক্রমশ দখল ও দূষণের শিকার। একইসঙ্গে বোটানিক্যাল গার্ডেন ও নদীতীরবর্তী জলাশয়গুলির পরিবেশগত অবনতি নিয়েও আদালত পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে।
বর্ষায় নদীর জল ঘোলা হয়ে গেলে কলকাতার জল সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে পলির পরিমাণ ও দূষণ বাড়ায় জল পরিশোধন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। ফলে নদীকে কেন্দ্র করে শহরের যে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ছিল, তা ভেঙে যাচ্ছে দ্রুত।
হেরিটেজ বনাম রিয়েল এস্টেট
কলকাতার নদীতীর এখন নতুন সংঘর্ষের জায়গা— ঐতিহ্য বনাম বাণিজ্য। একদিকে নদীর ধারে রিভারফ্রন্ট ডেভেলপমেন্ট এর স্বপ্ন, অন্যদিকে ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন। মিলেনিয়াম পার্ক থেকে প্রিন্সেপ ঘাট পর্যন্ত নদীতীরকে সাজানোর একাধিক প্রকল্প হয়েছে। আবার নতুন করে রিভার ক্রুজ টার্মিনাল তৈরির পরিকল্পনাও চলছে।
কিন্তু প্রশ্ন হল— উন্নয়ন কি শুধুই কংক্রিটের? নদীর ধারে কাচের ক্যাফে, আলোকসজ্জা ও পর্যটন প্রকল্প তৈরি করলেই কি নদী বাঁচে? নাকি প্রয়োজন নদীর নিজস্ব প্রবাহ, ঘাটের ঐতিহ্য, জলাভূমির পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় অর্থনীতির পুনর্জাগরণ?
ভবিষ্যৎ: কলকাতা কি আবার নদীমুখী হবে?
বিশ্বের বহু শহর— লন্ডন, হামবুর্গ, সিঙ্গাপুর— তাদের পুরনো বন্দর এলাকাকে নতুন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতাও পারে, যদি পরিকল্পনা হয় দীর্ঘমেয়াদি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথমত, কলকাতা বন্দরের ভবিষ্যৎকে শুধুই কার্গো পরিবহণে সীমাবদ্ধ না রেখে হেরিটেজ পোর্ট ইকনমি হিসেবে ভাবতে হবে। পুরনো ডক, ওয়্যারহাউস ও নদীতীরবর্তী স্থাপত্যকে পর্যটন, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, হুগলি নদীকে পরিবেশগত সম্পদ হিসেবে দেখতে হবে। নদী ও খালের প্রাকৃতিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা ছাড়া জলাবদ্ধতা, দূষণ বা জলসংকটের সমাধান হবে না।
তৃতীয়ত, শহরের মানুষকে নদীর কাছে ফিরিয়ে আনতে হবে। কলকাতার নাগরিক জীবনে নদী এখন প্রায় অদৃশ্য। অথচ এই শহরের আত্মা এখনও নদীতেই লুকিয়ে।
কলকাতার ইতিহাস বলছে, এই শহর নদীকে কেন্দ্র করে জন্মেছিল। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ভবিষ্যৎও হয়তো নির্ভর করছে সেই নদীকেই নতুন করে আবিষ্কারের উপর। নইলে একদিন হয়তো হুগলির ধারে দাঁড়িয়ে শুধু ইতিহাসই দেখা যাবে, নদী নয়।
রাজনীতির অলিন্দে একটা কথা খুব চলে— ক্ষমতার সবচেয়ে বড় জোর হল সে যেকোনো রক্তমাংসের বাস্তবতাকে একটা বিমূর্ত প্রতীকে বদলে দিতে পারে। রাজস্থানের জয়সলমীরের সেই ডাম্পিং ইয়ার্ডের সামনে যখন হাকাম দান দাঁড়িয়েছিলেন, তখন তাঁর চারপাশের হাওয়া বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল হাজারো গরুর পচা-গলা লাশের দুর্গন্ধে। যে অবলা পশুকে রাজনীতির মঞ্চে ‘মা’ বলে সিংহাসন দখলের লড়াই চলে, আস্তাকুড়ের প্লাস্টিক আর আবর্জনার স্তূপে তাদের এমন হাড়গোড় বেরোনো পরিণতি এক তীব্র তাত্ত্বিক বিরোধাভাসকে সামনে এনে দাঁড় করায়।
এই বাস্তব ঘটনাটি আসলে একটি গভীর রাজনৈতিক অর্থনীতির রূপক, যাকে নরওয়েজিয়ান সমাজবিজ্ঞানী কেনেথ বো নিয়েলসেন ‘অথরিটেরিয়ান পপুলিজম অ্যান্ড বোভাইন পলিটিক্যাল ইকোনমি’ বা কর্তৃত্ববাদী জনমোহিনী ও গো-রাজনীতির অর্থনীতি বলে ব্যাখ্যা করেন। এই তত্ত্ব অনুযায়ী, পপুলিস্ট বা জনমোহিনী রাজনীতিতে কোনো একটি প্রতীককে (এক্ষেত্রে গরু) পবিত্র এবং অলঙ্ঘনীয় হিসেবে খাড়া করা হয়, যাতে জনসাধারণের আবেগ বিভক্ত না হয়ে একজায়গায় জড়ো হয়। কিন্তু ট্র্যাজেডি এটাই যে, এই পবিত্রতার বয়ানটি কেবল তখনই সচল থাকে, যতক্ষণ তা ভোটের বাক্সে ডিভিডেন্ড দেয়। যেই মুহূর্তে সেই প্রতীকটি তার উপযোগিতা হারায়— যেমন দুধ দেওয়া বন্ধ করা বুড়ো গরু— অমনি সে তার গুরুত্ব হারায় এবং বাইরে ছিটকে পড়ে।
জয়সলমীরের ঘটনাটি দেখায় যে, কীভাবে এই রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এক ধরণের ‘পদ্ধতিগত নিষ্ঠুরতা’ লুকিয়ে থাকে। একদিকে গো-রক্ষার নামে স্বঘোষিত পাহারাদারদের দাপট বাড়ে, অন্যদিকে পরিকাঠামোর অভাবে, চরম গরমে জল-খাবারের অভাবে কাতরে মরে পরে থাকে ‘গো-মাতা’। ঠিকাদারকে ব্ল্যাকলিস্ট করে বা পুরসভার ফাইল চাপা দিয়ে এই কাঠামোগত ব্যর্থতা ঢাকা যায় না।
তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, এটি পুঁজি ও আবেগের এমন এক অদ্ভুত মেলবন্ধন, যেখানে পশুর জীবনের প্রকৃত কোনো মূল্য নেই, মূল্য কেবল তার প্রতীকী সত্তার। জয়সলমীরের ডাম্পিং ইয়ার্ডের সেই মাছি-ভনভন করা কংকালের স্তূপ আসলে কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক গাফিলতি নয়; এটি হল সেই রাজনৈতিক ‘ফ্যান্টাসির’ আসল কঙ্কালসার রূপ, যা মঞ্চের চটকদার বক্তৃতা আর বাস্তবে নির্মম সত্যের মধ্যকার আকাশপাতাল দূরত্বকে আমাদের চোখের সামনে উলঙ্গ করে দেয়। অবলা পশুদের এই নিয়তি মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতার অর্থনীতিতে আবেগ যখন সস্তা পণ্য, তখন তার শেষ পরিণতি এমনই এক ভাগাড়।
বিজ্ঞানের নিত্যনতুন অগ্রগতির যুগেও প্রকৃতির এমন কিছু আদিম ও অকৃত্রিম উপাদান রয়েছে, যা ছাড়া পৃথিবীর অস্তিত্ব কল্পনা করা অসম্ভব। সম্প্রতি এক পরিবেশবিষয়ক গবেষণায় আবারও উঠে এসেছে মৌমাছির অপরিহার্য ভূমিকার কথা। আপাতদৃষ্টিতে ক্ষুদ্র এই পতঙ্গটি কেবল মধু আহরণেই ব্যস্ত থাকে না, বরং গোটা বিশ্বের বাস্তুতন্ত্র ও মানুষের খাদ্য শৃঙ্খলকে টিকিয়ে রাখার মূল কারিগর হিসেবে কাজ করে।
পরাগায়ন ও বনের জীববৈচিত্র্য
প্রকৃতির এক অদ্ভুত নিয়মে উদ্ভিদের বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়াটি অনেকাংশেই মৌমাছির ওপর নির্ভরশীল। ফুল থেকে যখন তারা নেক্টার বা মিষ্টি রস সংগ্রহ করতে যায়, তখন তাদের অজান্তেই পায়ের লোমে ও ডানায় লেগে যায় ফুলের পরাগরেণু। এক ফুল থেকে অন্য ফুলে উড়ে বেড়ানোর এই সাধারণ অভ্যাসটুকুর মাধ্যমেই সম্পন্ন হয় পরাগায়ন বা পলিনেশন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর প্রায় আশি থেকে নব্বই শতাংশ বুনো ফুল ও উদ্ভিদের প্রজনন সরাসরি এই প্রাণীদের ওপর নির্ভর করে। আর এই পরাগায়নের ফলেই তৈরি হয় ফল, বীজ ও নতুন চারা গাছ, যা বনের পশুপাখির খাদ্য ও আশ্রয়ের জোগান দেয়।
কৃষি অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তা
শুধু বনের জীববৈচিত্র্যই নয়, মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়েও মৌমাছির অবদান সীমাহীন। আমাদের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় থাকা পুষ্টিকর ফলমূল, শাকসবজি এবং বাদামজাতীয় ফসলের এক বড় অংশের ফলন বাড়ে মৌমাছির সক্রিয় উপস্থিতির কারণে। ফলে কৃষি অর্থনীতি এবং বিশ্ব খাদ্য সুরক্ষায় এদের ভূমিকা অনন্য।
মানুষের আগ্রাসন ও অস্তিত্বের সংকট
অথচ মানুষের তৈরি নানা সংকটে আজ এই পরম বন্ধুরা চরম বিপন্ন। মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, নগরায়ণের ফলে প্রাকৃতিক বাসস্থান ধ্বংস হওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফুলের ফোটার সময়ে যে ওলটপালট হচ্ছে, তা মৌমাছির জীবনকে সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
আগামী দিনের বার্তা
পরিবেশবিদদের মতে, মৌমাছির বিলুপ্তি ঘটলে তা কেবল একটি পতঙ্গের হারিয়ে যাওয়া নয়, বরং তা মানব সভ্যতার জন্য এক বিরাট খাদ্য সংকটের পূর্বাভাস। প্রকৃতির এই নীরব কর্মীদের টিকিয়ে রাখতে বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার কমানো এবং বেশি করে ফুল ও ফলের গাছ লাগানো এখন সময়ের দাবি। বিজ্ঞান আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, কৃত্রিম প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক না কেন, প্রকৃতির এই জটিল ও সুন্দর ভারসাম্যকে অবহেলা করে মানুষের টিকে থাকা অসম্ভব।
‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ফর্ম হাতে নিয়েই অনেকের প্রথম প্রতিক্রিয়া— এটা কি সামাজিক প্রকল্পের আবেদনপত্র, না কি গোটা পরিবারের জীবনপঞ্জি? ১১ পাতার দীর্ঘ ফর্মে শুধু নাম-ঠিকানা নয়, আবেদনকারীর পরিবারের আর্থিক অবস্থা, সম্পত্তি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, এমনকি শিশুর টিকাকরণের তথ্য পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। আর তা নিয়েই শুরু হয়েছে জোর বিতর্ক। বুধবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আনুষ্ঠানিক ভাবে ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র সূচনা করেন। সরকার জানিয়েছে, আগামী ১ জুন থেকে শুরু হবে আবেদন প্রক্রিয়া। অনলাইন এবং অফলাইন— দু’ভাবেই ফর্ম জমা দেওয়া যাবে। তবে প্রকল্প ঘোষণার চেয়ে বেশি চর্চায় এখন সেই আবেদনপত্রই। ফর্মের প্রথম কয়েক পাতাতেই আবেদনকারীর আধার নম্বর, ডিজিটাল রেশন কার্ড, ভোটার পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের তথ্য চাওয়া হয়েছে। শুধু আবেদনকারী নন, পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের তথ্যও বাধ্যতামূলক। কে কতটা শিক্ষিত, কী পেশা, বার্ষিক আয় কত, কার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আধারের সঙ্গে সংযুক্ত— সবটাই বিস্তারিত জানাতে হবে। এতেই শেষ নয়। আবেদনকারীর পরিবার কত জমির মালিক, পাকা বাড়ি আছে কি না, গাড়ি রয়েছে কি না, কেউ আয়কর দেন কি না, জিএসটি নম্বর আছে কি না— সেই তথ্যও চাওয়া হয়েছে। এমনকি পরিবারের কেউ সরকারি চাকরি করেন কি না বা পেনশন পান কি না, তাও উল্লেখ করতে হবে। সবচেয়ে বেশি বিস্ময় তৈরি করেছে শিশুদের সম্পর্কিত তথ্যের অংশ। কোন স্কুলে পড়ে, কোন শ্রেণিতে পড়ে, টিকাকরণ সম্পূর্ণ হয়েছে কি না— সেই তথ্যও দিতে হবে আবেদনকারীদের। পাশাপাশি জানতে চাওয়া হয়েছে, পরিবারের কেউ অন্য সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নিচ্ছেন কি না বা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA)-এর আওতায় আবেদন করেছেন কি না। সরকারের বক্তব্য, প্রকৃত উপভোক্তাদের চিহ্নিত করতেই এই বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রশাসনের একাংশের দাবি, অতীতে বিভিন্ন প্রকল্পে ভুয়ো উপভোক্তার অভিযোগ উঠেছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার কঠোর যাচাইয়ের পথে হাঁটছে সরকার। একই সঙ্গে একটি ‘সমন্বিত পারিবারিক ডেটাবেস’ তৈরির ভাবনাও রয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে অন্য জায়গায়। একটি খাদ্য বা আর্থিক সহায়তা প্রকল্পের জন্য এত বিস্তৃত ব্যক্তিগত তথ্য আদৌ প্রয়োজন কি? সমাজমাধ্যমে ইতিমধ্যেই বহু মানুষ গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনেকের মতে, এই ফর্ম কার্যত সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, আর্থিক অবস্থা এবং সামাজিক পরিচয়ের পূর্ণাঙ্গ নথি সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার সমান। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশও মনে করিয়ে দিচ্ছেন, তথ্য সুরক্ষা আইন কার্যকর হলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও সচেতনতার অভাব রয়েছে। ফলে কোন তথ্য কেন নেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে তা কী ভাবে ব্যবহার হবে, সেই স্বচ্ছতা অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এই প্রকল্প শুধু জনমুখী কর্মসূচি নয়, ভবিষ্যতের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ডেটা ব্যবস্থাপনারও বড় পরীক্ষা। কারণ, বর্তমানে তথ্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। আর সেই তথ্য সংগ্রহের দরজা খুলে দিল কি ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র ১১ পাতার ফর্ম? এখন দেখার, সাধারণ মানুষ এই দীর্ঘ আবেদন প্রক্রিয়াকে কতটা স্বাভাবিক ভাবে নেন। কারণ, প্রকল্পের আর্থিক সুবিধার অঙ্কের থেকেও বড় হয়ে উঠেছে আর এক প্রশ্ন— নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের সীমারেখা ঠিক কোথায়?
সকাল সাড়ে আটটা। নদীয়ার শক্তিনগর জেলা হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে তখনই লম্বা লাইন। কেউ তেহট্ট থেকে এসেছেন, কেউ করিমপুর থেকে। টিকিট কেটে অপেক্ষা শুরু। কিন্তু অভিযোগ, বহুদিন ধরেই নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও চিকিৎসকের দেখা মিলত না। অনেক সময় রোগীকে বলা হত, “এখানে হবে না, বাইরে দেখান।”
এই ‘বাইরে দেখান’ সংস্কৃতিই দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় অভিযোগগুলির একটি। আর সেই অভিযোগের বিরুদ্ধেই এবার প্রকাশ্যে কড়া সুর শোনা যাচ্ছে প্রশাসনের তরফে । বনগাঁয় মন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়ার সরাসরি হুঁশিয়ারি, “হাসপাতালেই অপারেশন করুন, ব্যবসা করতে হলে চাকরি ছাড়ুন।” অন্যদিকে শক্তিনগরে চিকিৎসকদের সময়মতো হাজিরা নিশ্চিত করতে কড়া নির্দেশিকা।
রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রশাসনের এই সক্রিয়তা নতুন প্রশ্ন তুলছে, সরকারি হাসপাতালের পরিষেবার হাল কি সত্যিই বদলাতে চলেছে? নাকি এটি শুধুই সাময়িক কড়াকড়ি?
বাংলার সরকারি হাসপাতাল: পরিকাঠামো বেড়েছে, আস্থা কমেছে
পশ্চিমবঙ্গের হাসপাতাল। ছবি – Google
গত এক দশকে পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর বিস্তার হয়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবে। জেলা ও মহকুমা স্তরে নতুন ভবন, সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল, আধুনিক যন্ত্রপাতি, স্বাস্থ্যসাথীর মতো প্রকল্প— সব মিলিয়ে কাগজে-কলমে স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্র অনেক ক্ষেত্রেই আলাদা
রাজ্যের বহু সরকারি হাসপাতালে এখনও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি প্রকট। গ্রামীণ ও সীমান্তবর্তী জেলার হাসপাতালগুলিতে সার্জারি, কার্ডিয়োলজি, নিউরোলজি বা ক্রিটিক্যাল কেয়ারের মতো বিভাগ কার্যত নামমাত্র। বহু ক্ষেত্রে যন্ত্রপাতি থাকলেও তা চালানোর প্রশিক্ষিত কর্মী নেই।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল সমস্যা ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার বনাম সার্ভিস ডেলিভারি’র ফাঁক। অর্থাৎ ভবন তৈরি হয়েছে, কিন্তু পরিষেবা সেই হারে উন্নত হয়নি।
বনগাঁ: ‘সুপার স্পেশালিটি’ নামেই?
বনগাঁ হাসপাতালকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ দীর্ঘদিনের। হাসপাতালটি সুপার স্পেশালিটি হিসেবে ঘোষিত হলেও বাসিন্দাদের অভিযোগ— সামান্য জটিলতা হলেই রোগীকে কলকাতায় রেফার করা হয়।
এক্স-রে, আল্ট্রাসোনোগ্রাফি, অপারেশন— সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘ অপেক্ষা। অভিযোগ, বহু চিকিৎসক সরকারি হাসপাতালের চেয়ে ব্যক্তিগত চেম্বার ও নার্সিংহোমে বেশি সময় দেন। ফলে সাধারণ রোগীদের একপ্রকার বাধ্য হয়েই বেসরকারি পরিষেবার দিকে ঝুঁকতে হয়।
এই আবহেই খাদ্য সরবরাহ ও সমবায় দপ্তরের মন্ত্রী অশোক কীর্তনিয়ার মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি সরাসরি বলেন, “সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকরা বাইরে অপারেশন করবেন না। ব্যবসা করতে হলে চাকরি ছাড়ুন।”
এই বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে। কারণ বহুদিন ধরেই অভিযোগ, সরকারি হাসপাতালের ভিতরে এক ধরনের ‘রেফার অর্থনীতি’ গড়ে উঠেছে। সরকারি হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা বা বিলম্বকে ব্যবহার করে রোগীকে নার্সিংহোমমুখী করা হয়। বিশেষত জেলা শহরগুলিতে গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে নার্সিংহোম ব্যবসা। বনগাঁ, বহরমপুর, কৃষ্ণনগর, মালদা, বর্ধমান থেকে মেদিনীপুর প্রায় সর্বত্র একই অভিযোগ শোনা যায়।
শক্তিনগর: বহির্বিভাগে ‘রিমাইন্ডার রাজ’
নদীয়ার শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে এবার সেই অনিয়ম রুখতে সরাসরি প্রশাসনিক কড়াকড়ি শুরু হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে— সকাল ৯টার মধ্যে বহির্বিভাগ শুরু করতে হবে এবং দুপুর ২টো অথবা শেষ রোগী দেখা না পর্যন্ত চিকিৎসকদের থাকতে হবে। নিয়ম ভাঙলে নজরদারি হবে। হাসপাতাল সুপার জয়ন্ত সরকারের বক্তব্য, বহির্বিভাগ চলাকালীন বাইরে প্র্যাক্টিস করা যাবে না।
স্বাস্থ্য দপ্তরের একাংশের মতে, এই পদক্ষেপ শুধুমাত্র শক্তিনগরের জন্য নয়। ভবিষ্যতে রাজ্যের অন্যান্য সরকারি হাসপাতালেও উপস্থিতি, পরিষেবা এবং রোগী ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও কঠোর মনিটরিং চালু হতে পারে।
চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ কতটা সত্যি?
সরকারি হাসপাতাল নিয়ে সাধারণ মানুষের অভিযোগ নতুন নয়—
চিকিৎসক অনুপস্থিত
রোগী রেফার
বাইরে থেকে ওষুধ কিনতে বাধ্য করা
পরীক্ষার দীর্ঘ অপেক্ষা
নার্স ও কর্মীর অভাব
দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য
তবে চিকিৎসকদের একাংশও পাল্টা যুক্তি দিচ্ছেন। তাঁদের বক্তব্য, শুধু চিকিৎসকদের দায়ী করলে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ—
রোগীর তুলনায় চিকিৎসক সংখ্যা কম
বহু হাসপাতালে পর্যাপ্ত নার্স নেই
একাধিক বিভাগে এক জন চিকিৎসককে কাজ করতে হয়
পরিকাঠামো থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণ দুর্বল
মেডিকো-লিগ্যাল চাপ বাড়ছে
এবং সরকারি হাসপাতালে নিরাপত্তাহীনতাও বড় সমস্যা
স্বাস্থ্য মহলের একাংশের মতে, সমস্যাটি মূলত ‘সিস্টেমিক’। অর্থাৎ গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক দুর্বলতা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবসার বিস্তারের ফল।
বেসরকারি স্বাস্থ্য ব্যবসার বিস্তার গত দুই দশকে পশ্চিমবঙ্গে বেসরকারি স্বাস্থ্য খাত দ্রুত বেড়েছে। কলকাতা থেকে জেলা শহর— সর্বত্র নার্সিংহোম ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিস্তার ঘটেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা কমার সুযোগেই এই বাজার বেড়েছে।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সরকারি হাসপাতালে যে পরীক্ষা এক মাস পরে হবে, সেটি পাশের বেসরকারি কেন্দ্রে একই দিনে হচ্ছে, যদিও খরচ বহুগুণ বেশি। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলি চরম আর্থিক চাপে পড়ছে। ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভের বিভিন্ন তথ্য বলছে, ভারতে চিকিৎসা খরচ এখনও বহু পরিবারের আর্থিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ। পশ্চিমবঙ্গও তার ব্যতিক্রম নয়।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও স্বাস্থ্য প্রশাসন সরকারি হাসপাতালগুলিতে অনিয়ম নিয়ে অতীতে বহুবার রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতাল সূত্রে দাবি, প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় অনেক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেত না। তাই নতুন প্রশাসনের কড়া নজরদারিকে অনেকেই ‘বার্তা রাজনীতি’ হিসেবেও দেখছেন। অর্থাৎ সরকার সাধারণ মানুষের কাছে এই বার্তা দিতে চাইছে যে স্বাস্থ্য পরিষেবার প্রশ্নে আর আপস করা হবে না।
তবে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে— নজরদারি কি যথেষ্ট? সমাধান কোথায়? স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র চিকিৎসকদের হুঁশিয়ারি দিয়ে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংকট মেটানো সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার। যেমন— জেলা হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নিয়োগ আধুনিক যন্ত্রপাতির কার্যকর ব্যবহার চিকিৎসকদের ডিজিটাল উপস্থিতি মনিটরিং সরকারি হাসপাতালের রেফার নীতির স্বচ্ছতা বেসরকারি নার্সিংহোমের উপর কড়া নিয়ন্ত্রণ গ্রামীণ স্বাস্থ্য পরিকাঠামো শক্তিশালী করা এবং রোগীকেন্দ্রিক প্রশাসনিক সংস্কৃতি তৈরি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, সরকারি হাসপাতালের উপর সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা।
আস্থার সংকটই সবচেয়ে বড় রোগ পশ্চিমবঙ্গের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো চিকিৎসক বা পরিকাঠামোর অভাব নয়, বরং আস্থার অভাব। কারণ সাধারণ মানুষ এখনও সরকারি হাসপাতালেই ভিড় করেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁদের মনে একটা ভয় কাজ করে— “শেষ পর্যন্ত কি বাইরে যেতে হবে?” বনগাঁ ও শক্তিনগরের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলি তাই শুধুই প্রশাসনিক কড়াকড়ির খবর নয়। এগুলি আসলে বাংলার স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গভীর অসুখের লক্ষণ।
এখন দেখার, সরকার বদলের পর এই কড়া নজরদারি সাময়িক বার্তা হয়েই থেকে যায়, নাকি সত্যিই সরকারি হাসপাতাল আবার সাধারণ মানুষের ভরসার জায়গা হয়ে উঠতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের মাছের বাজার কি এখন সংস্কৃতির চেয়ে বেশি কর্পোরেট ও রাজনৈতিক?
বাঙালির পরিচয়ের সঙ্গে যদি কোনও খাদ্যের নাম সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে, তবে তা নিঃসন্দেহে মাছ। রবীন্দ্রনাথের লেখনী থেকে সত্যজিৎ রায়ের সিনেমা— সর্বত্র মাছ কেবল খাদ্য নয়, এক সাংস্কৃতিক প্রতীক। কিন্তু সেই মাছের বাজারই এখন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। গড়িয়াহাট, মানিকতলা, কলেজ স্ট্রিট বা শিলিগুড়ির হাকিমপাড়ার ভোরের বাজারে এখনও দর কষাকষির আওয়াজ শোনা যায় বটে, কিন্তু সেই বাজারের ভিতরে ঢুকে পড়েছে কর্পোরেট সরবরাহ ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক কূটনীতির জটিল বাস্তবতা।
আজ পশ্চিমবঙ্গের মাছের বাজার আর শুধুই স্থানীয় অর্থনীতির বিষয় নয়। এটি এখন কৃষি-অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, খাদ্য নিরাপত্তা এবং ভোট রাজনীতিরও অংশ।
ইলিশ: খাদ্য নয়, এক ‘অর্থনৈতিক আবেগ’
কলকাতার বাজারে ইলিশ মাছ। ছবি – Google
বাংলার মাছের বাজারে ইলিশের গুরুত্ব আলাদা। বর্ষা নামার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার বাজারে যে উন্মাদনা তৈরি হয়, তা অনেকাংশে পুজোর কেনাকাটার আবেগের সঙ্গে তুলনীয়। মাছ ব্যবসায়ীদের মতে, “ইলিশের বাজার ভালো থাকলে গোটা মাছের বাজার চাঙ্গা থাকে।”
কিন্তু গত এক দশকে ইলিশের অর্থনীতি বদলে গিয়েছে নাটকীয়ভাবে। আগে কলকাতার বাজার মূলত নির্ভর করত বাংলাদেশের পদ্মার ইলিশের উপর। এখন সেই জায়গায় ধীরে ধীরে ঢুকে পড়েছে গুজরাত উপকূল, মায়ানমার ও আরব সাগরঘেঁষা অঞ্চলের ইলিশ। অনেক ক্ষেত্রেই ‘বাংলাদেশি ইলিশ’ নামে বিক্রি হলেও বাস্তবে মাছের উৎস অন্যত্র, এমন অভিযোগও বাজারে রয়েছে।
এর পিছনে রয়েছে দুই প্রধান কারণ— সীমিত সরবরাহ এবং কূটনৈতিক অনিশ্চয়তা। দুর্গাপুজোর আগে বাংলাদেশ সরকার ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দিলেও বাস্তবে বহু বছর ঘোষিত কোটার তুলনায় কম মাছ পশ্চিমবঙ্গে এসেছে। ফলে বাজারে দাম পৌঁছেছে কেজি প্রতি ২০০০ থেকে ৩০০০ টাকায়।
ফলে ইলিশ এখন মধ্যবিত্তের প্রতিদিনের খাবার নয়, বরং উৎসব-নির্ভর “প্রিমিয়াম আবেগ”। অনেক পরিবারে এখন আর কেজি ধরে ইলিশ কেনা হয় না; বরং টুকরো বা ভাগে কিনে ‘রেওয়াজ’ বজায় রাখা হয়।
নদীর মাছ হারাচ্ছে, চাষের মাছ বাড়ছে
মাছের বাজার। ছবি – Google
একসময় পশ্চিমবঙ্গের মাছের বাজারের প্রাণ ছিল নদী ও জলাভূমি। গঙ্গা, রূপনারায়ণ, তিস্তা, মহানন্দা কিংবা সুন্দরবনের খাঁড়ি অঞ্চল থেকে আসত দেশি মাছ। এখন সেই চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীদূষণ, অতিরিক্ত মাছ ধরা, জলাভূমি ভরাট, নাব্যতা কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে প্রাকৃতিক মাছের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। বিশেষত দেশি ছোট মাছ— পাবদা, পারশে, ট্যাংরা, খলসে, মৌরলা— আগের তুলনায় অনেক কম দেখা যাচ্ছে বাজারে।
তার বদলে বাজার দখল করছে অ্যাকুয়াকালচার বা মাছচাষ। পশ্চিমবঙ্গ বর্তমানে দেশের অন্যতম বৃহৎ মৎস্য উৎপাদক রাজ্য হলেও উৎপাদনের বড় অংশই এখন পুকুর-ভিত্তিক চাষের উপর নির্ভরশীল। রুই, কাতলা, মৃগেল থেকে পাঙ্গাস, তেলাপিয়া— অধিকাংশ মাছই এখন “ফার্ম ফিশ”।
এই পরিবর্তনের অর্থনৈতিক দিক স্পষ্ট। চাষের মাছ দ্রুত উৎপাদন করা যায়, দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় এবং শহুরে চাহিদা মেটানো সহজ হয়। কিন্তু স্বাদের প্রশ্নে আপত্তি তুলছেন বহু ক্রেতা। “আগের নদীর রুইয়ের গন্ধ আর নেই”— এই অভিযোগ এখন প্রায় প্রতিটি বাজারে শোনা যায়।
কারণ দ্রুত উৎপাদনের চাপে মাছচাষেও এখন উচ্চ-প্রোটিন ফিড, রাসায়নিক নির্ভর খাদ্য এবং নিবিড় বাণিজ্যিক পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে। ফলে মাছের স্বাদ, গঠন এবং পুষ্টিগুণ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
মাছের বাজারে কর্পোরেট ঢেউ
মাছ কেনার অ্যাপ। গ্রাফিক্স – দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস
দীর্ঘদিন পশ্চিমবঙ্গের মাছের ব্যবসা ছিল অসংগঠিত। আড়তদার, স্থানীয় পাইকার, মৎস্যজীবী ও খুচরো বিক্রেতাদের সম্পর্কের উপর দাঁড়িয়ে ছিল এই অর্থনীতি। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেখানে ঢুকে পড়েছে অ্যাপ-ভিত্তিক ডেলিভারি, ব্র্যান্ডেড মাছ এবং কোল্ড-চেইন সরবরাহ ব্যবস্থা।
কলকাতা ও শহরতলিতে এখন ‘কাট-টু-অর্ডার’, ‘হাইজিনিক ফিশ’, ‘ভ্যাকুয়াম প্যাকড সি-ফুড’— এই বাজার দ্রুত বাড়ছে। শহুরে উচ্চ ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা সময় বাঁচাতে অনলাইন মাছ কেনার দিকে ঝুঁকছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোভিড পরবর্তী সময়ে স্বাস্থ্যবিধি ও পরিচ্ছন্নতা নিয়ে সচেতনতা বাড়ার ফলে এই পরিবর্তন আরও দ্রুত হয়েছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে এখন মাছের উৎস, ওজন, কাটিং স্টাইল— সবই নির্দিষ্ট করে দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু এই কর্পোরেট প্রবেশে সবচেয়ে বড় চাপে পড়ছেন ছোট মাছ বিক্রেতারা। কারণ ঐতিহ্যগত বাজারের মূল শক্তি ছিল ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও বিশ্বাস। সেই জায়গা ধীরে ধীরে নিচ্ছে প্রযুক্তি ও লজিস্টিকস।
ভেটকি, চিংড়ি ও রপ্তানির অর্থনীতি
পশ্চিমবঙ্গের মাছের বাজারে আরেকটি বড় পরিবর্তন এসেছে রপ্তানিমুখী ব্যবসায়। বিশেষত ভেটকি ও বাগদা চিংড়ির বড় অংশ এখন আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য উৎপাদিত হয়। ফলে স্থানীয় বাজারে ভালো মানের সামুদ্রিক মাছের দামও বেড়েছে। অনেক সময় রপ্তানিযোগ্য মাছ স্থানীয় বাজারে কম পৌঁছনোয় সাধারণ ক্রেতাকে বেশি দাম দিতে হচ্ছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা ও পূর্ব মেদিনীপুরের বহু অঞ্চলে এখন চিংড়ি চাষই প্রধান অর্থনৈতিক কার্যকলাপ। কিন্তু সেই সঙ্গে বাড়ছে নোনা জলের বিস্তার ও কৃষিজমির ক্ষতির অভিযোগও। অর্থাৎ মাছের অর্থনীতি এখন পরিবেশ ও কৃষির সঙ্গেও সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে।
মাছ এখন রাজনৈতিকও
একসময় আলু-পেঁয়াজের দাম বাড়লে রাজনৈতিক চাপ তৈরি হত। এখন মাছের ক্ষেত্রেও একই ছবি দেখা যাচ্ছে। ইলিশের দাম বাড়লেই প্রশাসনিক নজরদারি, বাজার অভিযান এবং মজুতদারি বিরোধী পদক্ষেপ শুরু হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ আমদানি এখন কার্যত ‘কূটনৈতিক বার্তা’র অংশ। দুর্গাপুজোর আগে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দুই বাংলার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের প্রতীক হিসেবেও তুলে ধরা হয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলার ভোট রাজনীতিতেও মাছ এখন এক ধরনের “সফট কালচারাল ইস্যু”। কারণ মাছের সঙ্গে আবেগ জড়িত, আর আবেগের সঙ্গে রাজনীতির দূরত্ব খুব কম।
ভবিষ্যতের বাজার: থাকবে কি সেই পুরনো গন্ধ?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল— আগামী দশকে পশ্চিমবঙ্গের মাছের বাজারের চরিত্র কী হবে? একদিকে ঐতিহ্যবাহী বাজার, অন্যদিকে অ্যাপ-নির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থা। একদিকে নদীর মাছের স্মৃতি, অন্যদিকে চাষের মাছের বাস্তবতা। তবু এখনও গড়িয়াহাট বা শ্যামবাজারের মাছের বাজারে দাঁড়ালে বোঝা যায়, বাঙালির কাছে মাছ কেনা শুধুই কেনাকাটা নয়। সেটা দর কষাকষি, মাছের চোখ দেখে তাজা বোঝা, বিক্রেতার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা, আর বাড়ি ফিরে “আজ দারুণ মাছ পেয়েছি”— এই সামাজিক অভিজ্ঞতার অংশ।
হয়তো সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গের মাছের বাজার এখনও কেবল অর্থনীতির পরিসংখ্যান নয়। এটি আসলে বাঙালির সংস্কৃতি, স্মৃতি এবং পরিবর্তিত সমাজবাস্তবতার সবচেয়ে জীবন্ত আয়না।
ক্যালেন্ডার বলছে বর্ষা দরজায় কড়া নাড়ছে। কেরলে নির্ধারিত সময়ের আগেই মৌসুমি বায়ুর প্রবেশের ইঙ্গিত দিয়েছে আবহাওয়া দফতর। কিন্তু বাংলার মানুষ এখনও অপেক্ষায়— কবে নামবে সেই কাঙ্ক্ষিত স্বস্তির বৃষ্টি? আপাতত সেই উত্তর স্পষ্ট নয়। বরং দক্ষিণবঙ্গ জুড়ে জারি রয়েছে গরম ও অস্বস্তিকর আবহাওয়ার সতর্কতা। অন্যদিকে উত্তরবঙ্গে শুরু হয়ে গিয়েছে প্রাক-বর্ষার বৃষ্টির দাপট।
আলিপুর আবহাওয়া দফতর সূত্রে খবর, সাধারণত জুনের দ্বিতীয় সপ্তাহ নাগাদ দক্ষিণবঙ্গে বর্ষা প্রবেশ করে। উত্তরবঙ্গে বর্ষা আসে তারও আগে, জুনের প্রথম সপ্তাহে। এ বছর কেরলে ২৬ মে-র মধ্যেই বর্ষা ঢোকার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিল ভারতীয় আবহাওয়া দফতর (IMD)। ফলে বাংলায়ও বর্ষা কিছুটা আগেভাগে আসতে পারে বলে জল্পনা তৈরি হলেও এখনও পর্যন্ত সরকারি ভাবে নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা হয়নি।
এরই মধ্যে সোমবারের পর মঙ্গলবারেও রাজ্যের একাধিক জেলায় কালবৈশাখীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সোমবার দুপুরের পর থেকেই বিভিন্ন জেলায় বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি শুরু হয়েছিল। মঙ্গলবারও একই পরিস্থিতির পূর্বাভাস দিয়েছে হাওয়া অফিস। তবে প্রশ্ন একটাই, কলকাতার ভাগ্যে কি আদৌ বৃষ্টি আছে?
আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস বলছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় কলকাতা ও সংলগ্ন এলাকায় আকাশ আংশিক মেঘলা থাকতে পারে। শহরের কিছু অংশে বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। ফলে বিচ্ছিন্ন ভাবে হালকা বৃষ্টি হলেও হতে পারে। তবে তা যে গরম থেকে বড় কোনও স্বস্তি দেবে, এমন আশা আপাতত দেখাচ্ছেন না আবহবিদেরা।
মঙ্গলবার শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি থাকতে পারে। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ঘোরাফেরা করবে ৩০ ডিগ্রির আশপাশে। অর্থাৎ রাতেও মিলবে না স্বস্তি। সোমবার কলকাতার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৫.২ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা স্বাভাবিকের থেকে সামান্য কম হলেও সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ ডিগ্রিরও বেশি। ফলে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বাড়ায় অস্বস্তি আরও বেড়েছে। ২৪ মে রাত থেকে ২৫ মে রাত পর্যন্ত কলকাতায় একফোঁটা বৃষ্টিও রেকর্ড হয়নি। কার্যত বৃষ্টির আশায় প্রহর গুনছেন শহরবাসী।
অন্যদিকে দক্ষিণবঙ্গের একাধিক জেলায় মঙ্গলবার বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। পূর্ব ও পশ্চিম বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং বাঁকুড়ার কয়েকটি এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি হতে পারে। ঘণ্টায় ৪০ থেকে ৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা হাওয়া বইতে পারে বলেও সতর্ক করেছে আবহাওয়া দফতর।
তবে বৃষ্টির মাঝেও গরমের দাপট কমছে না পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে। বিশেষ করে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম ও পশ্চিম বর্ধমানের কিছু এলাকায় তাপপ্রবাহের মতো পরিস্থিতি বজায় থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উত্তরবঙ্গে অবশ্য ছবিটা খানিক আলাদা। দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারে ইতিমধ্যেই প্রাক-বর্ষার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ডুয়ার্স ও পাহাড়ের একাধিক এলাকায় ভারী বৃষ্টির সতর্কতা জারি হয়েছে। বিশেষ করে জলপাইগুড়ি, কোচবিহার ও আলিপুরদুয়ারের কিছু এলাকায় ৭ থেকে ১১ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে জানিয়েছে হাওয়া অফিস।
সব মিলিয়ে, বাংলায় বর্ষার আনুষ্ঠানিক প্রবেশ এখনও সময়সাপেক্ষ হলেও আবহাওয়ার চরিত্রে বদলের ইঙ্গিত মিলতে শুরু করেছে। তবে কলকাতা ও দক্ষিণবঙ্গের মানুষকে স্বস্তির বৃষ্টির জন্য আরও কিছুটা অপেক্ষা করতেই হতে পারে।
আগ্রা ফোর্ট-এর গাঢ় লাল প্রাচীরে তখন সন্ধ্যা নামছে। যমুনার জলে সূর্যাস্তের শেষ রঙ, যেন কারও চোখে লেগে থাকা সোনালি বিষাদ। সেই আলো-আঁধারির ভিতর, রাজদরবারের অসংখ্য কণ্ঠস্বর আর ক্ষমতার পদধ্বনি ছাপিয়ে, নিঃশব্দে হেঁটে চলেছেন এক নারী। তাঁর পদচিহ্নে নেই কোনো উচ্চাকাঙ্ক্ষার দম্ভ, চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, রাজপ্রাসাদের সৌখিন অন্তরমহল থেকেও যিনি খুঁজে ফিরছেন এক অন্য আকাশ – জাহানারা বেগম!
ক্ষমতার অলিন্দে এক নারীর পদধ্বনি
মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে আমরা বারবার শুনি রাজদণ্ডের শব্দ, ষড়যন্ত্রের ফিসফাস আর রক্তাক্ত উত্তরাধিকারের লড়াই, আর এসবেরই মাঝে জাহানারা যেন এক নীরব কবিতা। খুব অল্প বয়সেই জীবনের নিরমম শোক তাঁকে স্পর্শ করে। মা মুমতাজ মহল-এর মৃত্যুর পর মাত্র সতেরো বছর বয়সে তাঁর কাঁধে এসে পড়ে সাম্রাজ্যের অন্তঃপুরের গুরুদায়িত্ব। সম্রাট শাহজাহান তাঁকে ‘পাদশাহ বেগম’-এর মর্যাদা দেওয়ার পর তাঁর চিন্তা অন্তঃপুর থেকে সরাসরি প্রবেশ করলো রাজনীতির কেন্দ্রে। তাঁর মতামত বদলে দিতে শুরু করলো দরবারের সিদ্ধান্ত। পুরুষশাসিত সাম্রাজ্যের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে তিনি প্রমাণ করলেন – ক্ষমতা কোনো লিঙ্গের সম্পত্তি নয়; তা প্রজ্ঞার অধিকার। ক্রমে তিনি হয়ে ওঠেন সেই অদৃশ্য শক্তি – যেখানে ক্ষমতা কোনো অলংকার নয় বরং দায়িত্বের শপথ।
সুফি দরবারে এক রাজকন্যার আত্মসমর্পণ
যে নারী রাজনীতির কেন্দ্রে, তাঁর হৃদয়ের গভীরে ছিলো এক অন্য অনুসন্ধান। জাহানারা খুঁজেছিলেন আত্মার মুক্তি! রাজদরবারের রেশমি পর্দা সরিয়ে তিনি পৌঁছন চিশতিয়া তরিকা-র নিভৃত দরবারে। সুফি সাধক মঈনুদ্দিন চিশতি-র জীবনদর্শনের স্পর্শে তিনি উপলব্ধি করেন – সাম্রাজ্যের ক্ষমতা কিংবা আড়ম্বরে নয়; প্রকৃত শান্তি লুকিয়ে থাকে – করুণা, ভালোবাসা আর আত্মসমর্পণে! এই আত্মিক বোধের মধ্যে দিয়ে তিনি লিখে ফেললেন ‘মুনিস-উল-আরওয়াহ’ – এক রাজকন্যার কলমে আত্মার বিনয়ী গান! যেখানে পরতে পরতে উন্মোচিত হয় জীবনের গভীর উপলব্ধি ও আধ্যাত্বিক চেতনার অবিস্মরণীয় যাত্রাপথ।
নারী মানেই নির্মাতা
জাহানারা শুধু আত্মার সাধিকা নন, তিনি স্বপ্নের স্থপতি। দিল্লির ঐতিহাসিক চাঁদনি চক -এর পরিকল্পনা তাঁর মস্তিস্ক প্রসূত। তিনি জানতেন একটি নগরকে কীভাবে গড়ে তুলতে হয়, যেখানে বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও জনজীবন একসঙ্গে শ্বাস নেয়। আজও তাই চাঁদনি চক-এর ব্যস্ত আলোয় তাঁর চিন্তার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। বাজারের কোলাহল, মানুষের চলাচল আর দোকানের ঝলমলে আলো – সর্বত্র যেন লুকিয়ে আছে তাঁর নির্মাণশক্তির স্পর্শ। প্রায় চারশো বছর আগে এই ভারতীয় উপমহাদেশের বুকে পিতৃতান্ত্রিক ক্ষমতার অলিন্দে দাঁড়িয়ে জাহানারার দৃপ্ত ঘোষণা – নারী কেবল সংসার গড়ে না, সভ্যতাও নির্মাণ করে!
ইতিহাসের নীরব প্রদীপ
জীবনের শেষ অধ্যায়ে, যখন ভাইদের ক্ষমতার লড়াইয়ে সাম্রাজ্য ক্ষতবিক্ষত, তখন জাহানারা বন্দি পিতার পাশে থেকে বেছে নিলেন ভালোবাসার কঠিন পথ। সেই সিদ্ধান্তেই তাঁর নারীত্ব যেন পূর্ণতা পায় -দুর্বলতায় নয়, বিশ্বস্ততায়। সাম্রাজ্য ভেঙেছে, সিংহাসন হারিয়েছে জৌলুস, রাজদরবারের প্রতিধ্বনি মিলিয়ে গেছে কালের অতলে। অথচ জাহানারা যেন এক অবিচল আলোর শিখা। মৃত্যুর পর তাঁর সমাধিও যেন বারবার এই একই কথা উচ্চারণ করে। নিজামুদ্দিন দরগাহ-র খোলা আকাশের নিচে সম্পূর্ণ আড়ম্বরহীন তাঁর সমাধি। যেখানে তিনি কোনো শাহজাদী নন, যেন এক গভীর অথচ সহজ জীবনের মূর্ত প্রতীক। হ্যাঁ, এটাই ছিলো তাঁর এই জীবনের শেষ ইচ্ছা। আজ যখন নারী ক্ষমতায়নের কথা উচ্চারিত হয় তখন তাঁর জীবন আমাদের পাঠ দেয় – নারীর প্রকৃত শক্তি উচ্চারণে নয়, তার অন্তর্লীন দীপ্তিতে। রাজনৈতিক ক্ষমতার দম্ভে দেশ ও সমাজ যখন শোষণের যন্ত্র হয়ে ওঠে, তাঁর কাছে আমরা নতজানু হয়ে শিখি – সত্যিকারের ক্ষমতা আত্মার স্বাধীনতায়। তাই ইতিহাস যখন রক্ত ও হিংসার গল্প বলে, জাহানারা সেখানে জাফরানের গন্ধ হয়ে ভেসে আসেন – নরম, গভীর এবং অবিনশ্বর!